• বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সাক্ষাৎকার

বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি : মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল হামিদ

  রফিকুল ইসলাম জসিম

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৩০
ছবি
ছবি : মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল হামিদ

এদেশ যদি পরাধীন থাকে তবে সে জমি বা সম্পদের মূল্য কী থাকে? সবার আগে দেশকে মুক্ত করতে হবে। বাঁচাতে হবে মাতৃভূমিকে। এমন চিন্তা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।

দৈনিক অধিকার-এর পক্ষ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক (কমলগঞ্জ) রফিকুল ইসলাম জসিমকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে উপরোক্ত কথাগুলো বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে মণিপুরি মুসলিম (পাঙাল) সম্প্রদায়ের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল হামিদ।

বর্তমানে তিনি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে আদমপুর (তেতই গাঁও) বসবাস করছেন। তার পৈতৃক নিবাস- ৯নং ইসলামপুর, কমলগঞ্জ। তিনি ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সহধর্মীনি সালমা খানমকে নিয়ে বেশ সুখে আছেন। তিনি ৪নং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে দৈনিক অধিকার সাথে দীর্ঘ আলাপ হয়। তার নির্বাচিত অংশ পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো। 

রফিকুল ইসলাম জসিম: কেমন আছেন?

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ: হ্যাঁ, অনেকটা ভালো আছি।

র. ই. জসিম: আপনার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কীভাবে?   

মু.আ. হামিদ: ছোটবেলায় পছন্দের খেলা ছিল ফুটবল ও হাডুডু। এ গ্রাম ও গ্রাম ছুটে বেড়াতেন বন্ধুদের সঙ্গে। যার কথা না বললে নয় বাল্যবন্ধু কামাল ও হাবিবুরে কথা। দলবেঁধে খেলা আর মাছ ধরা ছিল আমাদের আনন্দ।

র. ই. জসিম: মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্বে কেমন ছিল? 

মু.আ. হামিদ: পড়াশুনার খরচ চালানোর মতো আমার পারিবারিক অবস্থা ছিল না। তাই কাজের সন্ধানে চলে যাই চট্টগ্রামে। যোগ দেন চন্দ্রঘোনা রেয়ন মিলে। রক্তে ছাত্র রাজনীতি ছিলো, তাই কিছুদিনের শ্রমিক সংগঠনের ভিড়েন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম নারাংগিরি পাইলট হাইস্কুলে লেখাপড়া করে চালিয়ে যায়। দেশে যখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তখন আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছাত্র ও শ্রমিকদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাক-হানাদারদের বিরুদ্ধে। 

র. ই. জসিম: মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন কেন?     

মু.আ. হামিদ : এদেশ যদি পরাধীন থাকে তবে সে জমি বা সম্পদের মূল্য কি থাকে? তাই সবার আগে দেশকে মুক্ত করতে হবে। বাঁচাতে হবে মাতৃভূমিটাকে। এমন চিন্তা থেকেই এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি৷

র. ই. জসিম: আপনি কত নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন?

মু.আ. হামিদ: ৪নং সেক্টর। ৪নং সেক্টরের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খেয়াই শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট- ডাউকি সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সিলেটের কানাইঘাটে সংঘটিত একাত্তরের যুদ্ধ। 

র. ই. জসিম: কিভাবে জানলেন যে মুক্তিযুদ্ধে যাবার সময় এসেছে?

মু.আ. হামিদ: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চেও ভাষণ শুনে আমরা কয়েকজন অনুধাবন করি বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সময় এসে গেছে। এর আগে দেশজুড়ে চলা পাকিস্তানীদের সহিংসতা, প্রতিদিন নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালানো আমাদের মর্মাহত করেছিল। পাকিস্তানীদের বাঙালি বিদ্বেষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তার প্রকাশও ঘটছিল বন্দুকের ভাষায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে গিয়েছিল, সমঝোতার কোনো পথ খোলা ছিল না। তখন আমরা বুঝলাম মুক্তিযুদ্ধে যাবার সময় হয়ে গেছে।

র. ই. জসিম: যুদ্ধে যাবার প্রেক্ষাপট কি এবং কোন কোন স্থানে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন? 

মু.আ. হামিদ: ৭মার্চ আমাদের জীবনের একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন থেকে আমরা পরিষ্কার দিক-নির্দেশনা পাই। তার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে কয়েকজন সহপাঠীর ও শ্রমিক ছাত্র মিলে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে যোগ দেন। বেশ কয়েকটি প্রতিরোধ যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। মাইংকাচর, সিলেটের খাসিয়া পাহাড়, রংপুরের রৌমারী ও কিশোরগঞ্জের নিকলীতে কমলগঞ্জে ভানুগাছ অন্যতম।    

র. ই. জসিম: ৭মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার ডাক দিলেন তখন আপনার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

মু.আ. হামিদ: এ কথা আগেই বলেছি। বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধ করেন। এ ডাকের জন্যই আমরা অপেক্ষা করছিল। আমাদের মনের কথাই বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। আমরা স্বস্তি পেয়েছিলাম। এটাই আমরা চেয়েছিলাম।


র. ই. জসিম: ১৯৭১ এ ভানুগাছ প্রতিরোধে আপনি সরাসরি যুক্ত ছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত…

মু.আ. হামিদ: মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে বৃহত্তর সিলেট জেলা মুক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা তিন দিক থেকে অভিযান শুরু করেন। এক দল (অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, এক ব্যাটালিয়ন শক্তি) অগ্রসর হয় ভারতের কৈলাশশহর থেকে আমাদের দলে সার্বিক নেতৃত্বে (অধিনায়ক) ছিলেন মেজর এ জে এম আমিনুল হক (বীর উত্তম, পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। ভানুগাছে অনেক আগে থেকেই ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষা। স্থানটি ছিল ভৌগোলিক ও সামরিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সিলেট দখলের জন্য ভানুগাছ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে উচ্ছেদ করা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ডিসেম্বরে প্রথম দিকে সকালে মুক্তিযোদ্ধারা ভানুগাছে আক্রমণ করেন। সারা দিন ধরে এখানে যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এতে বিচলিত হননি। আমাদের দলটিতে এলএমজি পরিচালক নায়েক মোজ্জামেল হক, মেশিন ম্যান ল্যাসনায়েক গোলাম মোস্তফা, মেশিনম্যান শাহ আলম, মেশিনম্যান আবদুল হামিদ’সহ মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে তারা যুদ্ধ করেন। তাদের বীরত্বে বিপর্যস্ত পাকিস্তানিরা পরদিন পালিয়ে যায়।

র. ই. জসিম : যুদ্ধের সময়ের বেদনাদায়ক কোনো স্মৃতি জানা থাকলে বলুন? 

মু.আ. হামিদ : সিলেট এমসি কলেজের যখন বিশ্রাম নিই তখন একজন কর্মচারী, কলেজের পিয়ন ছিলেন, সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করল।  এমন শক্ত করে ধরেছে। কিছুতেই ছাড়ে না।  তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে জানতে চাইলাম, বলো কি হয়েছে। সে কাঁদতে কাঁদতেই বলল, আমার এক বোন এমসি কলেজে পড়ে। পাকসেনারা ওকে ধরে আমার সামনে ধর্ষণ করে করতে উদ্যত হলে আমি ওকে বাঁচাতে না পেরে পাকসেনাদের অনুরোধ করেছিলাম, তোমরা যা করছ তা আমার সামনে করো না। ওরা তখন আমার দিকে রাইফেল তাক করলে আমি দৌড়ে পালাই। এই স্কুলের এক কোণে পালিয়েছিলাম৷ পাশেই একটা বাঁশঝাড়ের নিচে অসংখ্য মানুষের মাথা পড়েছিল।

র. ই. জসিম: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আপনার কোনো বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন?   

মু.আ. হামিদ: সিলেটে  আসার পর কাঁঠালতলী নামক একটা জায়গায় আমরা একটা রাজাকার সন্ধান পেলাম৷  আমরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেছিলাম। সেই রাজাকার ধরে নিল, আমরা পাকবাহিনী। সে নিজেই এলো আমাদের সঙ্গে দেখা করতে৷ খুব গর্বের সাথে সঙ্গে ওদের কাজকর্মের ফিরিস্তি দিচ্ছেন। তখন ওকে ধরে বেঁধে ফেললাম। একই ভুল করেছিল সাতজন মিলিশিয়ারা। ওরাও ভেবেছিল আমরা পাকসেনা। আসলে পাকসেনা ও আমাদের পোশাক ছিল প্রায় একইরকম।  তাই ওরা বিভ্রান্ত হচ্ছিল। আমাদের অস্ত্র গুলোও ছিল পাকিস্তান আমলে৷ মিলিশিয়ারা আমাদের কাছে এসে আলিঙ্গন করছিল। আমরাও জড়িয়ে ধরার ভান করে ওদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিচ্ছিলাম। একে একে সবার কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ওদের বেঁধে ফেলি।  তারপর আমরা ভারতের দিকে এগোতে থাকি।

র. ই. জসিম: ৪৮ বছর পর এসে কি মনে হয় আপনার যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন তা কতটা সফল, কতটা ব্যর্থ?

মু.আ. হামিদ: এটা ভাবি না। তখনকার প্রেক্ষিতে যা করণীয় ও সঠিক তাই করেছি। দেশকে মাতৃভূমিকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করেছি। আমার সন্তানরা একটি স্বাধীন দেশে বেড়ে উঠছে। তাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছি। এক জীবনে এর চেয়ে বেশি আর চাওয়া পাওয়া কি থাকতে পারে।

র. ই. জসিম: এবার বলুন যুদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ কি ছিল? কোথায়  ট্রেনিং নিয়েছিল তার সম্পর্কে কিছু বলুন? 

মু.আ. হামিদ: এর প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আমরা মিল বন্ধ করে দিই৷  সবাই সংগঠিত হয়ে একটা দলের সঙ্গে খাগড়াছড়ি হয়ে ট্রেনিং নিতে চলে যায় ভারতে৷ ওখানকার ত্রিপুরা জেলার অম্পিনগরে মেগাভাট সেন্টারে আমাদের ট্রেনিং শুরু হয়৷ রাইফেল থেকে শুরু করে এমজি, মর্টার ইত্যাদি অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং নিয়েছি। একশজনের একটা দল ট্রেনিং নিয়েছিলাম৷  এক পর্যায়ে সবাইকে পাঁচটা করে গুলি দিয়ে নিদিষ্ট একটা লক্ষ্য স্থির করে দেওয়া হয়৷  সবচেয়ে বেশি গুলি লাগাতে পারা ১৫ জনকে বেছে নেওয়া হয়। এর মধ্যেই আমিও একজন৷ এখন সবার নাম তো মনে নেই। যেটুকু মনে পড়ছে না ডা. শাহ আলম, আরও একজনের নাম ছিল শাহ আলম। তার পর রণ বিক্রম ত্রিপুরা, আবুল কাশেম চিশতি- এই পাঁচজন এইট বেঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়৷ বাকিকে একেক জনকে একেক দলের যুক্ত করা হয়৷ কাউকে নেভির সঙ্গে, কাউকে অন্য কোন দলের সঙ্গে। আমরা চালাতাম এমজি। এটি চালাতে পাঁচজন লাগে৷ গোলম মোস্তফা, চিশতি আট আমি ছিলাম মেশিনম্যান। ওস্তাদ ছিলেন মোজাম্মেল হক ও মোহাম্মদ সোলায়মান। ট্রেনিং শেষ করে আমাদের দলটি বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ করি।     

র. ই. জসিম: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আপনার কিছু মতামত জানতে চাচ্ছিলাম।

মু.আ. হামিদ: অনেক উঁচু মাপের একজন নেতা। দেশের সেই ক্রান্তিকালে তাঁর মতোই একজন নেতার প্রয়োজন ছিল। তার সম্পর্কে অনেকেই অনেক কথা বলে; কিন্তু আমি বলব, তিনিই এ দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন। তিনি না থাকলে এ দেশ আজ স্বাধীন হতো না।

র. ই. জসিম: পরবর্তী প্রজন্মের  প্রতি আপনার কোনো বক্তব্য?

মু.আ. হামিদ: আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বাবারা তোমরা তা রক্ষা করো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখে তাহলে এদেশ পরবর্তী প্রজন্ম দেশটাকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যাবে।  এ দেশ আমাদের সবার অহংকার। আমাদের দেশ আমরাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং মুজিব আদর্শে গড়ে উঠুক সোনার বাংলা।  

র. ই. জসিম: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মু.আ. হামিদ: তোমাকেও ধন্যবাদ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড