• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক মুসলিম নারী গোয়েন্দার আত্মত্যাগ

  মোঃ সাইফুল ইসলাম

২৭ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫০
নূর এনায়েত খান
নূর এনায়েত খান; (ছবি- সংগৃহীত)

গুপ্তচরবৃত্তি বা গোয়েন্দাদের নাম শুনলে প্রথমেই আমাদের চোখে ভাসে জেমস বন্ড, মাসুদ রানার কথা। আর নারী গোয়েন্দার কথা শুনলেই মনে পড়ে মাতাহারির কথা। এছাড়াও মনে পড়ে জোসেফিন বেকারের কথা। ঘুরে ফিরে এই কজনের মাঝেই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এদের বাইরেও আরও অনেক গুপ্তচর ছিলেন। তাদেরই একজন হচ্ছেন নূর এনায়েত খান।

নূর এনায়েত খানের আসল নাম হচ্ছে নূর-উন-নিসা এনায়েত খান। কিন্তু তিনি নূর এনায়েত খান নামেই পরিচিত হন। ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি মস্কোতে জন্মগ্রহণ করেন এই নারী। নতুন বছরের সূচনায় জন্মগ্রহণ করা নূর এনায়েত খানের বাবা ছিলেন একজন ভারতীয় আর মা ছিলেন আমেরিকান। 

বাবার নাম ছিল এনায়েত খান আর মাতার নাম ছিল আমেনা বেগম। বাবা এনায়েত খান ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ও সূফীবাদের শিক্ষক। নূর সপরিবারে সান ফ্রান্সিসকোতে বাস করতেন। সেখানে তার বাবা সূফীবাদের ওপর শিক্ষা দিতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা লন্ডনে চলে যান। ১৯২০ সালে ফ্রান্সের সারেন্সে চলে যান ও সেখানে ফজল মঞ্জিলে বসবাস করেন।

নূরের শিশুকালটা ভালোই কাটছিল। কিন্তু কৈশোরে পা রাখতেই ১৯২৭ সালে তার জীবনে দুঃখজনক ঘটনার সূচনা হয়। তার বাবা এনায়েত খান ভারতে একটি তীর্যযাত্রায় মারা যান। এনায়েত খানের মৃত্যু স্ত্রী আমেনা বেগমকে খুবই মর্মাহত করে। এই নারী তীব্র শোকে চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। তাই মাত্র ১৩ বছর বয়সে ছোট ভাইবোন ও সংসারের হাল ধরেন নূর।

ছোট ছোট গল্প, কবিতা লেখা নূরের খুবই শখের ছিল। তিনি সঙ্গীত চর্চাও করেছিলেন। বীণা বাজাতে পারতেন। প্যারিসের শিশুতোষ পত্রিকা ও রেডিওতে নিয়মিত ছোট গল্প লিখতেন। নূরের বয়স যখন ২৫ বছর তখন লন্ডনে তার প্রথম শিশুতোষ ছোট গল্পের বই ‘টুয়েন্টি জাতক টেলস’ প্রকাশিত হয়। এভাবেই হয়তো কিছুটা হলেও সুখে-শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল নূর ও তার পরিবার।

কিন্তু ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নূরের শান্তিময় জীবনে আবারও মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। জার্মানি কর্তৃক ফ্রান্স আক্রমণ করা হয়। তখন নূর ঘরবাড়ি হারায় ও পুনরায় লন্ডনে চলে যায়। 

মহীশুরের শাসক টিপু সুলতানের বংশধর ছিলেন নূর। তাই হয়তো টিপু সুলতানদের মতো সাহসিকতা ছিল তার মাঝে। তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে চেয়েছিলেন। তাই ১৯৪০ সালে মিত্রবাহিনীর হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। উইমেন অক্সিলারি এয়ার ফোর্সে (WAAF) যোগ দেন তিনি। সেখানে ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে কাজ পান। নূর ছিলেন প্রথম কোনো ভারতীয় বংশোদ্ভূত ওয়্যারলেস অপারেটর নারী, যাকে নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সে স্পেশাল অপারেশন এক্সিকিউটিভ (SOE) হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।

১৯৪৩ সালে তিনি ফ্রান্স চলে যান ও সেখানে মেডেলিন সাংকেতিক নামে ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে গোপনে কাজ করেন। নূর হয়তো ঠিকমতো গুপ্তচরবৃত্তি করতে পারবেন না, প্রশিক্ষণ চলাকালীন ঊর্ধ্বতনরা এমনটি মনে করতেন। কিন্তু নূর কাজের মাধ্যমেই তার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

তৎকালে নাৎসিদের বিরুদ্ধে তথ্য পাচার করা খুবই কঠিন ছিল। অনেকেই এ কাজে নাৎসিদের কাছে ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু নূর দক্ষতার সাথে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে নাৎসিদের তথ্য সংগ্রহ ও পাচার করতেন। তিনি নিয়মিতই তার অবস্থান পরিবর্তন করতেন। এছাড়াও চুলের রং পরিবর্তন করতেন। বিভিন্ন পার্টি, সমাবেশে নূর খুবই সাবলীল ছিলেন। তাই জার্মানরা ভাবতেও পারেনি তাদের সাথে নূর গুপ্তচরবৃত্তিতে লিপ্ত আছেন।

দীর্ঘদিন সফলতার সাথে গোয়েন্দাগিরি করলেও তিনিও ধরা পড়ে যান হিটলারের গোপন পুলিশবাহিনী গেস্টাপোর কাছে। তবে ধরা পড়ার কারণ খুব একটা জানা যায়নি। তথাপিও অনেকেই মনে করেন এক নারীর বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েছিলেন নূর। ধরা পড়ার পর তার জীবনে খুবই করুণ পরিণতি নেমে আসে।

তাকে নির্দয় শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। ঠিকমতো খেতে দেওয়া হতো না। হাত পায়ে বেড়ি পরিয়ে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। তিনি দুইবার পালাতে গিয়ে ব্যর্থও হন। এত অত্যাচারের পরেও তিনি কোনো তথ্য ফাঁস করেননি। তবে জার্মানরা তার নোটবুকে কিছু ম্যাসেজের প্রতিলিপি পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে পাঠানোর জন্য কিংবা কী কী ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন তা মনে রাখার জন্য তিনি সেগুলো টুকে রাখতেন। সেসব ম্যাসেজ দেখে জার্মানরা জোরপূর্বক একটি বার্তা পাঠান ও মিত্রশক্তির তিন সদস্যকে ধরতে সক্ষম হন।

পার্থিব জীবনে নূরের ওপর অত্যাচার আর বন্ধ হয়নি। তাকে সহ কয়েকজনকে পাঠানো হয় ডাকাও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। সেখানে নূর ব্যতীত বাকিদের সাথে সাথেই হত্যা করা হয়। কিন্তু নূরকে নিয়মিত নির্মমভাবে পেটানো হতো ও নির্যাতন করা হতো। অতপর একদিন মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় নূরকে। হত্যার সময় নূর এনায়েত খানের শেষ কথা ছিল ‘লিবার্টি’ বা স্বাধীনতা।

যুদ্ধের পর নূর মরণোত্তর বেশকিছু সন্মাননা পান। বিভিন্ন স্মৃতিফলকে তার নাম লেখা হয়। এছাড়াও ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার লণ্ডনের যুদ্ধকালীন বাড়িটি নীল ফলক দিয়ে সজ্জিত করা হয়। নূরই হচ্ছেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী, যিনি এ বিরল সন্মানে ভূষিত হন।

স্বাধীনতা অর্জিত হয় বহু ত্যাগের বিনিময়ে। অর্জিত হয় বহু সাধনায়। এই সাধনায় যারা নিজেদের উৎসর্গ করেন তারা হন অমর। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী নূর এনায়েত খানের নাম ধ্বনিত হতে থাকবে যে কোনো স্বাধীনতাকামীর হৃদয়ে।  

তথ্যসূত্র : বিবিসি, কালচার ইন্ডিয়া

ওডি/এনএম 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড