• বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হঠাৎ কেন আন্দোলনমুখি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা?

  নুরুজ্জামান শুভ

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫:২৮
আন্দোলনমুখি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। (ছবি: সংগৃহীত)

করোনার কারণে গত একবছর ধরে বন্ধ থাকলেও হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার জন্য আন্দোলনমুখি হয়েছে শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে পার্শ্ববর্তী গেরুয়া গ্রামের সংঘর্ষের ঘটনার মাধ্যমে।

এ ঘটনার কয়েকদিন পূর্বে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নারকীয় হামলা চালিয়েছিল স্থানীয় শ্রমিকরা। দুটি ঘটনা শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

বিগত কয়েক মাস ধরেই শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় গুলো খুলে ক্লাস পরীক্ষা গ্রহণ করে দ্রুত সেশনজট নিরসন করা। ইতিমধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে পরীক্ষা চলমান ছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেশনের পরীক্ষা ইতিমধ্যে অনলাইনে শেষ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ মার্চ হলগুলো খুলে দিয়ে প্রয়োজনের ভিত্তিতে সিনিয়র ব্যাচগুলোর পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল।

গত ১৯ শে মার্চ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘাতের সূত্র ধরে ২০ শে মার্চ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জীবনের নিরাপত্তা ও শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবিতে প্রশাসনকে হলগুলো খুলে দেওয়ার আল্টিমেটাম দেয়। প্রশাসন দাবি মেনে না নেওয়ায় শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে হলে অবস্থান করতে শুরু করে। এই আন্দোলনের উত্তাপ পরদিন ঢাকা, রাজশাহী সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং হলগুলো খুলে দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার দাবি জোরদার হতে থাকে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিক্ষামন্ত্রী ১৭ মে থেকে হল খোলা এবং ২৪ মে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেন। একই সাথে চলমান সকল পরীক্ষা স্থগিত করার নির্দেশ দেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর এমন নির্দেশনায় খুশি হতে পারেনি শিক্ষার্থীরা, বিশেষ ভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের পরীক্ষা চলমান ছিল তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

ফলে ঢাকার সাত কলেজের একটি অংশ শিক্ষামন্ত্রীর ওই নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা করে চলমান পরীক্ষাগুলো নেওয়ার দাবিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতেই ঢাকার নীলক্ষেত সড়ক অবরোধ করে এবং পরদিন ২৪ শে ফেব্রুয়ারি নীলক্ষেত, সাইন্সল্যাব সহ বেশ কয়েকটি সড়ক অবরোধ করে। একই সাথে সারাদেশের বিভিন্ন জায়গার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই দাবীতে আন্দোলনরত করে।

আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সাত কলেজের পরীক্ষাগুলো চলবে বলে পুনরায় ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত অন্য কলেজের পরীক্ষা পূর্বের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থগিত থাকবে বলে জানানো হয়।

অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার তারিখ ঘোষণায় বিব্রত হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ফলে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতা।

প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ করে শিক্ষার্থীদের মাঝে এতো ক্ষোভের জন্ম নিলো কেন? কেন তারা আন্দোলনমুখি হলো?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত দেশের পর্যটন কেন্দ্র, নির্বাচন, মিটিং-মিছিল, সিনেমা হল, হাট-বাজার সব কিছুই চলমান রয়েছে। যেহেতু দেশের সব কিছুই চালু রয়েছে, সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা সমীচীন মনে করছে না শিক্ষার্থীরা।

এদিকে অফলাইনে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও অনলাইনে সীমিত পরিসরে ক্লাস, টিউটোরিয়াল, প্রেজেন্টেশন চালু রয়েছে। তবে দেশের সব জায়গায় ইন্টারনেটের গতি সমান নয়। প্রান্তিক অঞ্চলে বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী ক্লাস করছে। সারাদেশে ভালো সার্ভিস রয়েছে এমন কোনো সিম কোম্পানির সাথে সরকার চুক্তি করে স্বল্প টাকায় যদি শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা যেত তাহলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতো। আবার অনলাইনে ক্লাস করার জন্য অসংখ্য শিক্ষার্থীর ডিভাইস সংকট রয়েছে। ফলে দেখা যায় অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের শতকরা হার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।

এদিকে করোনার কারণে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। অসংখ্য শিক্ষার্থী টিউশনি করে নিজে ও পরিবারকে চালাতো। প্রায় একবছর ধরে টিউশনিও নেই তাদের। যদিও কিছু শিক্ষার্থী নিজ নিজ ক্যাম্পাসের আশেপাশে থেকে টিউশনি করাচ্ছেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে টিউশনিরও সংকট রয়েছে। ছুটি বাড়তে থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ছুটির সময়সীমা না জানার কারণে খণ্ডকালীনভাবে তারা কোন কাজের সাথেও যুক্ত হতে পারছেন না। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসে এবং তারা দ্রুততম সময়ে স্টাডি শেষ করে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য চাকরি অথবা কিছু একটা করার চাপ থাকে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা দেওয়ার জন্য অসংখ্য শিক্ষার্থীরা মেস ভাড়া করে অবস্থান করছে। এমতাবস্থায় হঠাৎ করে পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণাতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঠিক একই ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।

একদিকে ব্যাপক সেশনজটের শঙ্কা অন্যদিকে করোনার কারণে একই বর্ষে দুই বছরের অধিক সময় ধরে থাকার কারণে এ সকল শিক্ষার্থীরা খারাপ অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে মানুষিক ভাবে বিপর্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে।

দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত, কিন্তু এ সময়ে তারা শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা গ্রহণ করছে না। অথচ সরকার থেকে যখন গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিতে বলা হয়েছিল তখন এ সকল প্রতিষ্ঠান স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তাদের এই স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী স্কুল, কলেজ আগামী ৩০ মার্চ থেকে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আরও ক্ষোভের জন্ম দেবে। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি, সকল সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

ওডি

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড