প্রশংসায় ভাসছে এনভায়রনমেন্টাল থিয়েটার ‘কোর্ট মার্শাল’

প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৩২

  সরকার আব্দুল্লাহ তুহিন

প্রশংসায় ভাসছে বিজয় দিবসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে মঞ্চায়িত এনভায়রনমেন্টাল থিয়েটার ‘কোর্ট মার্শাল’। নির্দেশক, কলাকুশলী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ উপস্থিত দর্শকরা।

থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের প্রযোজনায় নাটকটি সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে প্রশংসার ফুলঝুরি।

১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চায়িত হয় এনভায়রনমেন্টাল থিয়েটার ‘কোর্ট মার্শাল’। নাট্যকার এস. এম. সোলায়মানের ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকটির নব্য রূপায়িত স্ক্রিপ্ট ও নির্দেশনায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক মো. মাজহারুল হোসেন তোকদার (বাঁধন)।

অগ্নিবীণা হল, লাইব্রেরি ভবন, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসন ভবনের সম্মুখ ভাগ এবং কেন্দ্রীয় মাঠের একাংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল নাটকের মঞ্চ। যার আয়তন প্রায় ৪০ হাজার স্কয়ার ফিট, ক্যান্টনমেন্টের পরিবেশ তৈরি করে থিয়েটারের মাধ্যমে মঞ্চায়িত নাটকটিতে ব্যবহৃত হয়েছে একটি করে মাইক্রোবাস, জিপ, অ্যাম্বুলেন্স, আর্মি ভ্যান, রিক্সা এবং ৭টি মোটরবাইক ও ৫টি বাইসাইকেল।

২ শতাধিক অধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রু, ভলান্টিয়ারের সমন্বয়ে বাংলাদেশের বৃহৎ নাটকগুলোর অন্যতম নাটকটিতে অভিনয় করছেন- বর্তমান সময়ে ছোট পর্দার পরিচিত মুখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক মনোজ কুমার প্রামাণিক, স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের প্রভাষক মো. রাকিবুল ইসলাম।

প্রশিক্ষিত মোটরবাইক স্ট্যানিং গ্রুপ, সাইকেল স্ট্যানিং গ্রুপ এবং নির্মাণ কাজে নিয়োজিত ২০ জন শ্রমিক নাটকটিতে অভিনয় করে। এছাড়াও বিজয়ের ৪৭ বছর উপলক্ষে ৪৭ ফিটের একটি পতাকা প্রদর্শিত হয় নাটকের দৃশ্যে। প্রায় দেড় ঘণ্টার এ নাটকটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিশেষত বীরাঙ্গনাদের প্রসঙ্গটি ওঠে এসেছে স্পর্শকাতরভাবে।

মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে সেই আলোকেই ‘কোর্ট মার্শাল’। শ্রেণি সংঘাতের ভিত্তিতে আমাদের সমাজের প্রকৃত চেহারাটি নাটকটিতে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের নিধন এবং মূল্যবোধের সব অর্জনকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত চক্রান্ত নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে। ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও নিষ্পেষণে একসময় অধীন ব্যক্তিরা হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাজে তাদের জায়গা হয় না।

মহান বিজয় দিবস

মহান বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে দিচ্ছে নাটক ‘কোর্ট মার্শাল’

 

নাটকের নির্দেশক মো. মাজহারুল হোসেন তোকদার বলেন, ‘‘কোর্ট মার্শাল’ তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ ভাবনায় ইতিবাচক পদক্ষেপ রাখবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জ্বীবিত একটি সুসজ্জিত ও সুগঠিত বাহিনীর মতো ৬০ জন সেনা সদস্য দৃপ্ত শপথকে বুকে ধারণ করে নিজেদের প্রস্তুত করেছিলেন এ নাটকের জন্য। ‘কোর্ট মার্শাল’ এর সেট, লাইট, কস্টিউম, প্রপস্, মিউজিক ও মেকআপ এর মাধ্যমে পুরো মঞ্চটিকে মনে হয়েছিল মিনি ক্যান্টনমেন্ট। দর্শকরা হয়ে উঠেছিল এই নাটকের অংশ।’’

অগ্নিবীনা হলকে সেনাদের আবাসিক কোয়ার্টার- যমুনা, লাইব্রেরি ভবনকে- ক্যান্টনমেন্ট সদর দপ্তর, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের একটি কক্ষকে জঙ্গিদের আস্তানা হিসেবে নাটকে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সজিবুল ইসলাম সজিব নাটক শেষে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘বাঁধন স্যার (মাজহারুল হোসেন তোকদার) দেখিয়েছেন নির্মাণাধীন ভবনকে কিভাবে নাটকের অংশ বানানো যায়, ওপরে মালামাল তোলার ক্রেনকে সেনারা কিভাবে ব্যবহার করতে পারে, নির্মাণ শ্রমিকদের নাটকের অংশ হিসেবে ব্যবহার সবমিলিয়ে অসাধারণ কনসেপ্ট, দক্ষ উপস্থাপনা, অসাধারণ এক পরিবেশনা উপভোগ করেছি।’

উন্মুক্ত নাটকটি দেখতে এসেছিলেন হাজার হাজার উৎসুক দর্শক। নির্দেশক, কলাকুশলী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ উপস্থিত দর্শকেরা। ভালুকা থেকে আসা এক দর্শক বলেন, ‘জীবনের সেরা নাটক দেখলাম, ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট সকলকে।’

পুনরায় মঞ্চায়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ময়মনসিংহ থেকে আসা অপর এক দর্শক বলেন, ‘নাটকটি বেশি বেশি মঞ্চায়ন হওয়ার দরকার দেশের বিভিন্ন জায়গায়। মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস রোধ এবং বীরঙ্গনাদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব দূরীকরণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে নাটকটি।’

নাটকটি সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কিছু উল্লেখযোগ্য স্ট্যাটাস হলো আশিকুর রহমান সৈকত নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এমন ঐতিহাসিক প্রোগ্রাম নিয়মিত চাই। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম নজরুলের মতোই হয়েছে।’

অনন্যা নওরীন নামের অপর এক শিক্ষার্থী লিখেন, ‘অসাধারণ বললে কম বলা হবে। একটা মুহুর্ত মিস করলে মনে হচ্ছিল অনেক কিছু হারিয়ে ফেলব। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ নাটক।’

অংকুর সরকার নামের শিক্ষার্থী তার স্ট্যাটাসে বলেন, ‘মাসব্যাপী পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। আমি একটি মানুষের চেষ্টা আর ভালোবাসা দেখেছি কাজের প্রতি যার প্রেক্ষিতে কাজটা তার পরিশ্রম মনে হয়নি মনে হয়েছে একটা আস্ত কোর্ট মার্শাল নিজেই মাজহারুল তোকদার স্যার। এক কথায় অসাধারণ, স্যালুট স্যার।’

প্রায় সাত লক্ষ টাকা ব্যয়ে নাটকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নাটকে ব্যবহৃত কস্টিউম তৈরি করেছেন এবং ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী (প্রপস) কিনেছেন। নাটকটির ব্যয়ের বিপুল অর্থ সংগ্রহ করতে বেগ পোহাতে হয়েছে নির্দেশককে।

নির্দেশক মাজহারুল তোকদার বলেন, ‘‘এর অর্থ সংগ্রহ করতে অনেকের কাছে গিয়েছি, কোথাও পেয়েছি, কোথাও পাইনি কিন্তু হাল ছাড়িনি। দীর্ঘ এক বছরের চেষ্টার ফল হবে এই ‘কোর্ট মার্শাল’। ব্যয়ের লক্ষাধিক টাকা শিক্ষার্থীরা নিজেরা দিয়েছে, এছাড়া, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আরএফএল আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আমাদের সহায়তা করেছে।’’

কোর্ট মার্শাল

‘কোর্ট মার্শাল’ নাট্য মঞ্চ

 

দীর্ঘ দুই মাস ধরে দুই ধাপে সকাল থেকে রাত অবধি অভিনয় করা শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে মহড়া কার্যক্রম পরিচালনা করেন নির্দেশক মো. মাজহারুল হোসেন তোকদার। নাটকটি নির্মাণে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ. এইচ. এম. মোস্তাফিজুর রহমান এবং কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. সাহাবউদ্দীন বাদল।

এছাড়াও সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন প্রক্টর উজ্জ্বল কুমার প্রধান, শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি তপন কুমার সরকার, বর্তমান সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম ও সহসভাপতি ড. এমদাদুর রাশেদ সুখন।

নাটকটিতে প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্বপালন করেন থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ইসমতআরা ভূঁইয়া ইলা। এ বিভাগের সকল শিক্ষকগণ এবং প্রায় সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সেট, লাইট, কস্টিউম, মিউজিক, মেকআপসহ সকল কাজের সমন্বয় করেছেন। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও নাটকটির সমন্বয়ে অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানান নির্দেশক।

লেখক : শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়