• শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সুরমা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন

নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে ১০ সহস্রাধিক পরিবার

  ফয়ছল আহমদ, সিলেট

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:৪২
ড্রেজার
সুরমা নদীর তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ ড্রেজার দিয়ে চলছে বালু উত্তোলন (ছবি : দৈনিক অধিকার)

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার সুরমা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ১০ সহস্রাধিক পরিবার নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে কয়েক বর্গ কিলোমিটার এলাকা। অবৈধ পাম্প মেশিন (টমটম) ও ড্রেজার মেশিন পরিচালনার ফলে দূষিত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ। পাশাপাশি ঝুঁকিতে রয়েছে ফসলী জমি, বসতবাড়ি, কবরস্থান, হাট-বাজার, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দিরসহ অসংখ্য স্থাপনা। এমতাবস্থায় নদীর তীর থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন চালিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ দিকে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সিলেট-জকিগঞ্জ নদী রক্ষা বাঁধ ডাইক।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাটে সুরমা নদীতে অবৈধ ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালু উত্তোলন করার ফলে নদীর দুই পাড়ের কয়েক হাজার পরিবার নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যেই গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের লাল নগর, রুস্তমপুর, জালালনগর, মজিদপুর, কান্দিগাঁও, পূর্বগাঁও, গোলাপগঞ্জ পৌর সভার স্বরস্বতী, চকরিয়া, রাণাপিং ও কানাইঘাটের লালারচক, ফতেগঞ্জ, মির্জারগড়, রাজাগঞ্জ, কলাগ্রাম, খালপাড়, তালবাড়ী, গাছবাড়ী, গদার বাজার, বিয়ানীবাজারের আলীনগর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রাম, মুকিগঞ্জবাজার, চারখাইসহ কয়েক শতাধিক গ্রাম ভয়াবহ নদী ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। নদী ভাঙনের কবলে এসব এলাকার ফসলী জমি, মসজিদ-মন্দির, হাট-বাজার, স্কুল-মাদ্রাসা ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

পাশাপাশি নদী ভাঙনের কারণে গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার, কানাইঘাটের মানচিত্র দিন দিন বদলে যাচ্ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নদীর পাড়ও। অবৈধ ড্রেজার মেশিন দ্বারা প্রকাশ্য দিবালোকে নদীর মধ্যবর্তী অংশে বালু উত্তোলন করলেও রাতের আঁধারে ড্রেজার মেশিন নদীর তীরের একেবারে কিনারে চলে আসে। এতে এসব এলাকায় নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে।

এলাকার লোকজন বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কাছে এ নিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করলেও অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের দাপটের কারণে তাদের বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি বিভিন্ন সময় এসব এলাকার বালু উত্তোলন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছে। একদিকে যেমন প্রশাসনের ছত্রছায়ায় নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে বর্তমানে এলাকাগুলোতে যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা বিরাজ করছে। তেমনিভাবে হুমকির মুখে পড়েছে সিলেট-জকিগঞ্জ নদী রক্ষা বাঁধ ডাইক।

এ দিকে, সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলাধীন একটি ইউনিয়ন হলো বাঘা ইউনিয়ন। সুরমা নদীর ওপারে অবস্থিত এ ইউনিয়ন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী। বিভিন্ন সময় বালু উত্তোলন করার কারণে এ ইউনিয়নের লোকজন নদী ভাঙনের আতঙ্কে রাত কাটান। নদীর তীরবর্তী এসব মানুষ অবৈধ এ ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদীভাঙন এলাকার পূর্ণগঠনের জন্য বিহিত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।

বাঘা ইউপির পূর্বগ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, নদী ভাঙনের কবলে পড়ে আমাদের গ্রামের অনেকেই অন্যত্র ঘরবাড়ি করে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। আবার অনেকেই নদীতে সহায়-সম্বলসহ নিজ বাড়ি হারিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ইতোমধ্যেই গ্রামের কয়েকটি মসজিদ-মন্দির নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। আর এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে ড্রেজার।

তিনি আরও বলেন, ড্রেজারের শব্দে রাতে ঘুমানো দায়। দিনের বেলা নদীর মধ্যবর্তী অংশে ড্রেজার চললেও সন্ধ্যার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো নদীর তীরে চলে আসে। এমতাবস্থায় নদীর তীর থেকে বালু উত্তোলন করার কারণে গ্রামের বাড়িঘর, ফসলী জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদী গর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদানের পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রামবাসীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবুও গ্রামের লোকেরা নিজেরাই এসব অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ সময় আমরা গ্রামবাসীকে শান্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিয়ানী বাজারের আলী নগর ইউনিয়নের বহর আলী বলেন, সুরমা নদীতে ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালু উত্তোলনের কারণে আলী নগর ইউনিয়নের অনেক এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। কিছুদিন বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও আবার দ্বিগুণ শক্তিতে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে এ এলাকার অসংখ্য ফসলী জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

কানাইঘাটের রাজাগঞ্জ ইউপির ছুনু মিয়া বলেন, নদী ভাঙনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে রাজাগঞ্জ বাজার। রাতে ড্রেজার মেশিনের শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। এই এলাকায় প্রতিদিন ১১টিরও বেশি ড্রেজার চলে। নদীর তীরবর্তী এই এলাকা থেকে বালু উত্তোলন না করার জন্য অনেকবার অনুরোধ করলেও তারা আমাদের কোনো কথা শুনেনি। উপরন্তু এলাকার লোকজনকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে সুরমা নদীতে বালু উত্তোলনকারী গ্রীণ চ্যানেলের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমদ জানান, আমার প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য আমি অন্য একজনকে মনোনীত করেছি। উনি কিভাবে ড্রেজার মেশিন পরিচালনা করছেন তা আমি জানিনা। নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন কিংবা অবৈধ কোনো কিছু আমি সমর্থন করিনা। এ সময় তিনি কাকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য মনোনীত করেছেন জানতে চাইলে তার নাম বলতে রাজি হননি তিনি। তিনি বলেন, সুরমা নদীতে ড্রেজার চলছে তা সত্য। তবে তা বালু আপ্তাবের ড্রেজার। এর বেশিকিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

বালু উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, টমটম ও ড্রেজার মেশিন দ্বারা নদীর তীরবর্তী অংশ থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। এ সময় অবৈধ এ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ওডি/আইএইচএন

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড