• সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬  |   ১৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শেরপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, পানিবন্দি লাখো মানুষ

  শাকিল মুরাদ, শেরপুর

১৫ জুলাই ২০১৯, ২২:১৭
বন্যা
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক (ছবি- দৈনিক অধিকার)

টানা বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের পাঁচটি উপজেলার বন্যার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে এখন প্রায় লাখো মানুষ পানিবন্দী রয়েছে ওইসব উপজেলায়। কিছু জায়গায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে পানিবন্দি মানুষের দাবি, সরকারিভাবে ত্রাণ পাচ্ছেন না তারা। এদিকে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। 

সোমবার (১৫ জুলাই) সরেজমিন ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়।

ঝিনাইগাতী উপজেলা: 
ঝিনাইগাতী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার চার ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ঝিনাইগাতী সদর, ধানশাইল, মালিঝিকান্দা ও হাতিবান্ধা ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে। বিশেষ করে গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহস্থরা। বিভিন্ন এলাকার রোপা আমন ধানের বীজতলা ও সবজি পানিতে নিমজ্জিত এবং কাঁচা ঘর, সেতু ও গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় দুইশ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। বাড়িতে পানি উঠায় চুলা জ্বালাতে পারছেন না প্লাবিত এলাকার মানুষ। শুকনো খাবার খেয়েই দিন পার করছেন তারা। বৃষ্টিপাত না কমলে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও চরমে পৌঁছবে।

সদর ইউপি চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন বলেন, রবিবার রাতের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানির প্রবল তোড়ে মহারশি নদীর বাঁধের পূর্ব দিঘিরপাড় এলাকায় ১৫০ মিটার অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। যে কোন সময় এটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তবে ভাঙনরোধে স্থানীয় এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করছে। বন্যায় তাঁর ইউনিয়নের দিঘিরপাড়, সুরিহারা, কালিনগর, সারিকালিনগর, দড়িকালিনগর, বালিয়াগাঁও, কোনাগাঁও ও জরাকুড়া গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। 

বন্যার পানিতে প্লাবিত গ্রাম (ছবি- দৈনিক অধিকার)

ধানশাইল ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, সোমেশ্বরী নদীর পানির প্রবল তোড়ে তার ধানশাইল ইউনিয়নের নয়াপাড়া, দাড়িয়ারপাড়, কান্দুলী, মাঝাপাড়া ও বাগেরভিটা গ্রামের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ঢলের পানির প্রবল তোড়ে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ধানশাইল-বাগেরভিটা-ভটপুর সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সড়কের অধিকাংশ স্থানে ভেঙে গেছে এবং পিচ ওঠে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বাগেরভিটা এলাকায় সোমেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত ১০০ ফুট দীর্ঘ সেতুটির দুপাশের মাটি সরে গেছে। ফলে সেতুটি এখন হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে এবং এলাকাবাসী ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। 

মালিঝিকান্দা ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, তার ইউনিয়নের আটটি গ্রামের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। ফলে এলাকাবাসী নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অন্যত্র সরে যাচ্ছে। মালিঝি নদীর পাগলারমুখ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে হাতিবান্ধা-কামারপাড়ার মধ্যে সড়ক যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ঢলের পানিতে ১৫০ হেক্টর জমির রোপা আমন বীজতলা, ৫০ হেক্টর জমির সবজি খেত ও ৫ হেক্টর জমির পেঁপে বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাখখারুল ইসলাম জানান, পানি প্রবেশ করায় ৩৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল মাহমুদ বেশ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০ মেট্রিক টন খয়রাতি (জিআর) চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাদের বাড়িঘর ক্ষতি হয়েছে তাদেরকে অর্থ সহায়তা প্রদান করা হবে।

নালিতাবাড়ী উপজেলা: 
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ও কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টির পানিতে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান এলাকায় দুটি স্থানে ভোগাই নদীর সাড়ে ৬০০ ফুট বাঁধ ভেঙে  সাত গ্রামে প্লাবিত হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতায় সড়ক ডুবে থাকায় এবং বাড়ি ঘরে পানি থাকায় দুইদিন ধরে সাত গ্রামের মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিন ধরে অতি বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভোগাই নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। গত শনিবার মধ্য রাতে উত্তর কুন্নগন রাজারখালপাড়ে এলাকায় ভোগাই নদীর ২০০ ফুট বাঁধ ও  ফকিরপাড়া চেয়ারম্যানের বাড়ির পেছনে ভোগাই নদীর সাড়ে ৪০০ ফুট বাঁধ ভেঙে গেছে। 

ভাঙণ অংশ দিয়ে  ভোগাই নদীর ঢলের পানি প্রবেশ করে  মরিচপুরান, বাঁশকান্দা, ফকিরপাড়া, খলাভাঙ্গা, ভোগাইরপাড়, মরিচপুরান পুর্বপাড়া ও উল্লারপাড়  গ্রামের আশপাশে এলাকা গুলোতে সৃষ্ট বন্যা দেখা দিয়েছে। পানি সড়কে থাকায় ফকিরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, খলাভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না। মরিচপুরান থেকে ফকির পাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সড়কে, মরিচপুরান চৌরাস্তা বাজার থেকে ছনটাল হয়ে রাবার ড্যামের সড়কে ও মরিচপুরান পুর্বপাড়া থেকে খলাভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সড়ক দুইদিন ধরে পানিতে সড়ক ডুবে আছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে ২০ থেকে ৩০টি  মাছ চাষের পুকুরের মাছ  ভেসে গেছে। 

যাতায়াতের সড়কে পানি থাকায় এলাকাবাসি ঠিকমত চলাচল করতে পারছেন না। সড়কে পানি থাকায় দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঠিকমত পাঠদান হচ্ছে না। এলাকাবাসি ঢলের পানি নিস্কাশনের জন্য ভেঙে যাওয়া বাঁধ দ্রুত সংস্কারের দাবী জানান। 

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোকছেদুর রহমান লেবু  ভাঙণ অংশ পরিদর্শন করে মরিচপুরান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান খন্দকার শফিক আহমেদকে পানি কমলেই বাঁধ সংস্কারের নির্দেশ দেন। 

মরিচপুরান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার শফিক আহমেদ জানান, দুই অংশে সাড়ে ৬০০ ফুট ভোগাই নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। ভাঙণ অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করায় সড়কসহ সাতটি গ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নদীর পানি কমলেই বাঁধ সংস্কারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোকছেদুর রহমান লেবু বলেন, দুটি ভাঙণ অংশ দেখেছি। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ সংস্কার করতে বলা হয়েছে।

পানির তীব্র স্রোতে ভাঙন শুরু হয়েছে (ছবি- দৈনিক অধিকার)

নকলা উপজেলা: 
গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের কারণে শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা মৃগী নদীর পানির তীব্র স্রোতে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে বাছুর আলগা দক্ষিণ পাড়া, চকবড়ইগাছি গ্রামের আফাজ উদ্দিন ও আছিয়া বেগমের বাড়ি ঘরসহ বেশি কিছু আবাদি জমি ও চলাচলের রাস্তা নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে। অনেকেই নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাড়ি-ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে।

এলাকাবাসী জানায়, দীর্ঘদিন যাবৎ মৃগী নদীতে অবৈধ ভাবে বেশ কয়েকটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রচুর পরিমাণে বালু উত্তোলনের কারণে নদীটি অধিক গর্ত হয়ে যায় ফলে বর্তমান অতি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে নদীর উত্তরপাড়ে চকবড়ইগাছী ও বাছুর আলগা এলাকায় এ ভাঙন শুরু হয়েছে। এ কারণে ঐ এলাকার একটি ঘাট সংলগ্ন পাকা রাস্তার নিচের মাটি সরে যাওয়ায় ঝুকিতে যাতায়াত করছে এলাকাবাসী। 

নকলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদুর রহমান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সারোয়ার আলম তালুকদার, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া গত কয়েকদিনের অতি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে নকলা উপজেলার গণপদ্দী, নকলা, উরফা ও গৌড়দ্বার ইউনিয়নে অনেক ফসলী জমি ও আমন চারা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদুর রহমান জানান, নদী ভাঙনে জান মাল রক্ষায় সতর্ক থাকার জন্য ভাঙন কবলিত এলাকার লোকজনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সম্ভব হলে অন্যত্র বাড়িঘর সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। সেই সাথে ভাঙনের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম জানান, রোববার সকাল থেকে নদী ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে।

ওডি/এসএ 

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪, ০১৯০৭৪৮৪৮০০ 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড