• বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ককটেলের জনপদ

  মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

১০ জুলাই ২০১৯, ১৪:০০
মুন্সীগঞ্জ
গ্রাম তল্লাশিতে পুলিশের অভিযান

মুন্সীগঞ্জের মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন ককটেলের জনপদ হিসেবে সর্ব সাধারণের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে অনেক বছর আগেই। সদর উপজেলার এই ইউনিয়নটিতে প্রায় প্রতিদিনই বিস্ফোরিত হচ্ছে ককটেল। বিস্ফোরণ আতঙ্কে নিয়ে জীবনযাপন করছে ইউনিয়নটির সাধারণ মানুষ। এ যেন এক যুদ্ধের জনপদ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে।

পূর্ব শত্রুতার জেরে গত ৯ দিন যাবত আ. লীগের দুপক্ষের মধ্যে থেমে থেমে চলছে সংঘর্ষ। দিন আর রাত নেই, দুপক্ষের লোকজন ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করছে। 

গত কয়েকদিনে সংঘর্ষ ও ককটেল তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে ৩ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আহতরা হলেন- বাবু (২৫), স্বপন (২৩)  বিল্লাল (৩০)। এছাড়াও গুলিবিদ্ধসহ দুপক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছে।

সংঘর্ষপূর্ণ সময়ে গভীর রাতে এলাকায় অনুপ্রবেশ করার সময় এক পুলিশ পরিচয় দানকারী মেহিদী, বহিরাগত ক্যাডার মোস্তফা, নাসির ও হিরু নামের চারজনকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের কাছে তুলে দেন এলাকাবাসী।

সংঘর্ষের ঘটনায় ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় একটি বিস্ফোরক ও একটি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। সংঘর্ষ এড়াতে বিপুল পরিমাণ পুলিশ এলাকায় টহল দিচ্ছে। দুইটি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৯২ জনকে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে প্রায় ৮০ জনকে। তবে এখন পর্যন্ত সংঘর্ষে জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।  

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য আহাজার হোসেনের সাথে একই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য স্বপন দেওয়ানের সাথে বিরোধ চলছে। সেই বিরোধকে কেন্দ্র করে ড্রেজারের শ্রমিকদের মারধর করেন আজহার গ্রুপের লোকজন। সেই ঘটনায় স্বপন মেম্বার বাদী হয়ে আহাজার মোল্লাসহ অনেকের বিরুদ্ধে সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। 

গত ২৯ জুন পুরাবাজার এলাকায় ড্রেজার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সে সময় স্বপন মেম্বারের লোকজন বাজারের এক দিনমজুর (কুলি) ফরিদ হালদারকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। এ সময় প্রতিবাদ জানিয়ে নোয়াদ্দা গ্রামের কয়েকজন এগিয়ে আসলে তাদেরও পিটিয়ে আহত করে স্বপন মেম্বারের লোকজন। পরে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য মহেষপুর এলাকা থেকে ছুটে যান ইউসুফ আর জাহাঙ্গীর। তারা বাজারে গিয়ে স্থানীয় ঢালীকান্দি গ্রামের ইউপি সদস্য মেজবাউদ্দিন মেম্বারের সাথে যোগাযোগ করেন। 

এ সময় স্বপন মেম্বারের গ্রুপের মানুষ মনে করেন ইউসুফ ও জাহাঙ্গীর মেজবাউদ্দিনের পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করতে এসেছে। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে নোয়াদ্দা, ঢালিকান্দি, মুন্সীকান্দি ও বেহারকান্দি গ্রামে।

অন্যদিকে ইউপি সদস্য স্বপন মেম্বারের সাথে বেহারকান্দি গ্রামের বিএনপি নেতা উজির আহম্মেদের সাথে ছিলো চরম বিরোধ। ঐ দিন নোয়াদ্দা গ্রামের লোকজন যখন স্বপন মেম্বারের বাড়িতে হামলা চালায় তখন স্বপন মেম্বারের বিপক্ষে গিয়ে হামলায় অংশ নেন তার গ্রামের বিএনপি নেতা উজির আহম্মেদের সমর্থকরা। নোয়াদ্দা গ্রামের লোকদের শক্তি পেয়ে বেহারকান্দি গ্রামের উজির আহম্মেদের লোকজন স্বপন মেম্বারের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।

এর পর দুপক্ষের লোকজন দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও ককটেল নিয়ে মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করে। একটু পর পর বিভিন্ন গ্রামের লোকজন ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ গেলে হামলাকারীরা গ্রাম ছেড়ে বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে লুকিয়ে পড়ে।
 
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়নটির বর্তমান চেয়ারম্যান মহসিনা হক কল্পনা সংঘর্ষের বিষয়টি মীমাংসা না করে একটি পক্ষকে সমর্থন করায় দিন দিন সংঘর্ষের ব্যাপকতা বেড়েই চলছে।

সংঘাত পূর্ণ গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। চারদিকে মহিলাদের আনাগোনা। সাংবাদিক আর পুলিশ দেখলে এগিয়ে এসে উভয় পক্ষের লোকজন এক পক্ষ আরেক পক্ষের নামে নানান অভিযোগ তুলে ধরে হামলাকারী হিসেবে পরিচিতি দেয়ার চেষ্টায় চালাচ্ছে।

দৈনিক অধিকার

গ্রাম তল্লাশিতে পুলিশের অভিযান 

মাত্র শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুম, খালের পানি জমিতেও আসতে শুরু করেছে। তাছাড়া পুরো এলাকার কৃষিজমিতে রয়েছে ধইঞ্চা ও পাট ফসল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুপক্ষের হামলাকারীরা ফসলি জমিতে লুকিয়ে থেকে হামলা চালায়। পুলিশ অভিযানে গেলে জমিতে লুকিয়ে পরে। বাড়িঘরগুলো থাকে সব সময় পুরুষশূন্য। 

তাদের নেটওয়ার্ক এতটাই মজবুত যে গ্রামগুলোতে পুলিশ, র‌্যাব, সাংবাদিকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক যাওয়ার আগেই সবাই জেনে যায়। গ্রামগুলো দিয়ে হাঁটার সময় দেখা যায় ফোনে নারীদের কর্মব্যস্ততা। কে কী করছে কোথায় কারা আসছে সব খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে গ্রামে থাকা নারীরা। কোথায় কোন গ্রুপের লোক অবস্থান করেছে স্থানীয় গ্রামগুলোর নারীদের সবই জানা।
 
সংঘর্ষের ঘটনায় স্বপন মেম্বার বাদী হয়ে আ.লীগ নেতা আজাহার মোল্লা, ইউপি সদস্য মেজবাউদ্দিন, বিএনপি নেতা উজির আহম্মেদসহ ৬৯ জনকে আসামি করে মামলা করে।

অপরদিকে স্বপন মেম্বারের প্রধান সহকারী সেলিম দেওয়ানও একটি চাঁদাবাজি মামলা করেছে আজহার গ্রুপের বিরুদ্ধে। হামলাকারীদের এখন পর্যন্ত আইনের আওতায় আনতে না পারার কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো ভয় আর শঙ্কা রয়েছে। কখন আবার কোন গ্রামে ককটেল হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। 

স্থানীয়দের দাবি যারা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ককটেল বিস্ফোরণ, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও লুটপাট চালাচ্ছে তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

পুরা বাজারের দিনমজুর ফরিদকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার বিষয়টি অস্বীকার করে ইউপি সদস্য স্বপন দেওয়ান বলেন, আজাহার মোল্লা ও বিএনপি নেতা উজির আহম্মেদ বর্তমানে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। এলাকায় চাঁদাবাজি, ককটেল বাজি, মাদক কারবারসহ নানা অপরাধ অপকর্ম করে সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়ে আ. লীগ নেতা আজাহার মোল্লা ও বিএনপি নেতা উজির আহম্মেদকে একাধিকবার ফোন দিলে তারা ফোন রিসিভ করেনি। 

মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন আ. লীগের সভাপতি ফরহাদ খাঁন বলেন, আমি সংঘর্ষের বিষয়টি শুনেছি। আমার জানা মতে দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনাটি চেয়ারম্যান কল্পনা মীমাংসা করিতে পারে। কিন্তু উনি বিষয়টি মীমাংসা না করে একটি পক্ষকে সমর্থন করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
 
মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহসিনা হক কল্পনা বলেন, ইউনিয়ন আ. লীগের সভাপতি ফরহাদ খাঁন ও সাধারণ সম্পাদক আজাহার মোল্লা বিএনপির লোকদের টাকা-পয়সা খেয়ে স্বপন মেম্বারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। বিষয়টি আমি মীমাংসা করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মানববন্ধন ও প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছি। 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুন্সীগঞ্জ (সদর সার্কেল) আশফাকুজ্জামান জানান, মোল্লাকান্দির সার্বিক শান্তি রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন তৎপর রয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় ২টি মামলা হয়েছে, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

ওডি/আরবি

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড