• মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের তালপাতার পাখা

  সাজ্জাদুল আলম শাওন, দেওয়ানগঞ্জ ( জামালপুর)

২৭ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৩২
জামালপুর
মো. মিমান (ছবি : অধিকার)

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে তাল পাতার পাখা। বাঙালি সংস্কৃতির একটি প্রাচীন ঐতিহ্য এই পাখা। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিতে এ পাখার একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। আজ সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। ধীরে ধীরে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। এক সময় নতুন জামাই, কিংবা বাড়ির অতিথির জন্য ঘরে রকমারি পাখা বানিয়ে দেওয়া হত। যেন বাইরের গরম থেকে কিছুটা প্রশান্তি লাভ করে।

এই পাখার বাতাস যেমন শরীরকে শীতল করে, তেমনি রঙিন কাপড়ে চারদিকে বাঁধানো দেখতেও মন জুড়িয়ে যায়। এই পাখা যে কেন্দ্র করেই তখন বিভিন্ন গান পরিবেশন হত। তেমনি একটি জনপ্রিয় গান "তোমার হাতপাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে’ এমন অনেক হাজারো গান বেজে উঠত সেসময়। শুধু তাই নয়, তাল পাতা সাহিত্যরও একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান ছিল। হাতপাখার নতুন পাতায় ‘তালের পাখায় মধু মাখা’ ইত্যাদি নানা ধরণের লোক সাহিত্য এখনো শোনা যায় মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার বিকাশ এবং বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে তালপাতার পাখার চাহিদা কমে গেছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে কি ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পটি হারিয়ে যাবে?

বিলুপ্ত প্রায় এই পেশাটি আজও ধরে রেখেছেন জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার চিকাজানি এলাকার বাসিন্দা মো. মিমান। তার নিখুঁত হাতেই এখন তৈরি হয় বাহারী রকমের পাখা। তালপাতার পাখা বানানো এখন তার প্রধান পেশা। পরিবারের ৬ জন সদস্য নিয়ে সারাদিন পাখা তৈরিতে ব্যাস্ত থাকেন। তিন ছেলে-মেয়ে, এক স্ত্রী ও তার বৃদ্ধা মা তার এই কাজের প্রধান সহযোগী। চাহিদা বেশী হলে প্রতিবেশী অনেকেই এই কাজে সহযোগীতা করেন। তার বিনিময়ে দেওয়া হয় তাদের পারিশ্রমিক। বর্তমানে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন। কিন্তু মিমান বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশাটিকে এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। এছাড়া তার উপায়ও নেই। কারণ, অন্যপেশা তার জ্ঞানের বাইরে।

মিমান অনেক কষ্টে তার বড় ছেলেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করিয়েছেন। মেঝ মেয়ে সাদিয়া আফরিন দেওয়ানগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট মেয়ে মোছা. সানি চিকাজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। সামান্য আয়ে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটানো কষ্টসাদ্য। তবুও ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাতে হাজারো কষ্ট মাথা পেতে নিতে তিনি প্রস্তুত। তাদের যেন এই পেশায় জড়াতে না হয়। তারা বড় হয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ুক এই তার কামনা।

পাখা শিল্পী মো. মীমান বলেন, আমার নিজ পরিবারের সদস্য ব্যতীত প্রতিবেশী অনেক স্কুল পড়ুয়া শিশু শিক্ষার্থীরা পাখা বানিয়ে দেয়। তাদের পারিশ্রমিক মিটিয়ে এক একটি পাখা তৈরিতে খরচ হয় ১২ থেকে ১৫ টাকা। আর বিক্রি হয় (পাইকারি) ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এতে আমার প্রতি পাখায় প্রায় ১৩ টাকা লাভ হয়। সরকারের পৃষ্টপোষকতা পেলে আমার এই পেশাকে আরো বড় করতে পারতাম। আমি চাই এই ঐতিহ্য টিকে থাকুক আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। ক্ষুদ্র এই কুটির শিল্প বাঁচাতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এক সময় এই পাখা ছাড়া চলা দায় হয়ে পড়ত। আমার এখানে প্রতিদিন ৩০/৪০টি পাখা তৈরি করতে পারি। বানানো এসব তাল পাতার পাখা উপজেলার বিভিন্ন হাটে বিক্রি করি। পাখার পাশাপাশি খাঁচা ও ডালি তৈরি করি। মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাঁশ দিয়ে বানাতে পারি।

তিনি আরও বলেন, তাল গাছের কচি পাতা সংগ্রহ করে পানিতে ভিজিয়ে শুকানোর পর পাখা তৈরির উপযোগী করে তোলা হয়। কিন্তু এখন গ্রামাঞ্চলে তাল গাছের সংখ্যা কমে গেছে। যে কারণে পাতা সংগ্রহ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এক সময় এসব পাতা এমনিতেই সংগ্রহ করা গেলেও এখন প্রতিটি পাতা ৫ টাকা দরে গাছের মালিকের কাছ থেকে কিনে আনতে হয়। যে কারণে এখন পাখা তৈরির খরচ বেড়ে গেছে। আমরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০টি পাখা তৈরি করতে পারি।

পাখা তৈরিতে ব্যস্ত মায়া বলেন, আমি ৩য় শ্রেণীতে পড়াশুনা করার সময় এই কাজ শিখি। দাদার কাছ থেকে এই কাজের হতে খড়ি হয়। বাবা দরিদ্র হওয়ায় আমার পড়াশুনা খরচ এই কাজ দিয়েই চালাতে হয়। প্রতিদিন আমি স্কুল শেষ করে পাখা বানাতে শুরু করি।

ইলেট্রনিকের যুগে এসে তাল পাতার পাখা বিলুপ্তির দিকে গেলেও এখনো বাংলার গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে চিরচেনা এই পাখা তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রযুক্তির হাত ধরে বাজারে এখন ইলেকট্রনিক পাখা, এসি, এয়ার কুলারের দাপট। যার কারণে এর ব্যবহার তুলনামূলক কম। অসম প্রতিযোগিতায় ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে ঐতিহ্য তালপাতার হাতপাখা। আধুনিকতা সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠতে না পারলেও মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে এই পাখা। যা বৈদ্যুতিক পাখা কিংবা এয়ারকন্ডিশনের যুগের আগেরকার অনেকের ভালোবাসার নাম।

ওডি/

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড