• শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিতর্কের পরও স্বপদে বহাল রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান

  রাজশাহী প্রতিনিধি

২৫ মার্চ ২০২০, ২১:৩৪
হোসেন
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোকবুল হোসেন (ছবি : দৈনিক অধিকার)

কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে হয়েছিলেন ওএসডি। তারপর আবার পদায়ন হয় কলেজে। তবে এবার অধ্যক্ষ নয়, বিভাগীয় প্রধান। সেখানেও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ সত্ত্বেও প্রেষণে নিয়োগ পান রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে। সেখানেও একের পর এক ঘটিয়ে চলেছেন অনিয়ম ও নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। তারপরেও তিনি বহাল থাকছেন স্বপদে। তিনি হচ্ছেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোকবুল হোসেন। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে রাজশাহীর শিক্ষাবিদদের মধ্যে। তারা চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করছেন।

ড. মোকবুল হোসেন সর্বশেষ বিতর্কের জন্ম দেন বিদেশ থেকে ফিরেও হোম কোয়ারেন্টিন না মেনে। দুই সপ্তাহ কানাডা সফর শেষে গত ১১ মার্চ রাতে দেশে ফেরেন তিনি। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৫ মার্চ পর্যন্ত তার হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা। কিন্তু দেশে ফিরেই তিনি বসেন নিজ কার্যালয়ে। অংশ নেন আলোচনা সভা, কেক কাটা, ম্যুরাল উদ্বোধন এমনকি প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানেও।

এসব অনুষ্ঠানে তার সংস্পর্শে এসেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ জেলার ভিআইপি ব্যক্তিরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর জেলা প্রশাসন এবং বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাকে তিরস্কার করা হয়েছে। আর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির এমন দায়িত্বহীন কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্বহীনতার আরেকটি নমুনা ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতনতার জন্য বোর্ড থেকে প্রচার করা বোর্ডের একটি প্রচারপত্রে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগকে কোভিড-৯১ লেখা হয়েছে। নোটিশে তিনবার কোভিড-৯১ লেখা হয়েছে।

হাসনাত রনি নামের এক ব্যক্তি সোমবার এর একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এসে কোভিড-১৯, ৯১ হয়ে গেছে। সচেতনতার চাপ আর কি! চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর থাকা ওই প্রচারপত্রে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে ১৫টি উপায়ের কথা লেখা হয়েছে। ১৫ নম্বরে লেখা আছে, ‘নিজে নিরাপদ থাকুন, অপরকে নিরাপদ রাখুন’।

কোয়ারেন্টিন না মানার বিষয়টি উল্লেখ করে সরদার জুয়েল নামে এক ব্যক্তি মন্তব্য করেছেন, ১৫ নম্বরটা পড়তে ভালো লাগল। নিজেই কদিন আগে বিদেশ থেকে এসে মেয়র সাহেবের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেয়ারম্যান হওয়ার কিছু দিন পরই অধ্যাপক মোকবুল নিয়ম ভেঙে বোর্ডের ছয় কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেন। গত ৫ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এই অনিয়ম ধরা পড়েছে। পদোন্নতি পাওয়া ছয় কর্মকর্তার প্রত্যেকে সপ্তম গ্রেডের কর্মকর্তা ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে ষষ্ঠ গ্রেড টপকে সরাসরি তাদের পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতি দেন চেয়ারম্যান।

বোর্ডসভা অনুষ্ঠিত না হলেও গত ১৫ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের পদোন্নতির আদেশ জারি করেন তিনি। এরপর গত ২৬ জানুয়ারি স্বাক্ষর করার জন্য বোর্ডের সচিব ড. মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে বেতন শিট উপস্থাপন করা হলে পদোন্নতির বিষয়টি জানাজানি হয়। বিধিসম্মতভাবে পদোন্নতি হয়নি বলে তিনি বেতন শিটে স্বাক্ষর করেননি। তারপরেও স্বেচ্ছাচারিতা করে চেয়ারম্যান তার একক স্বাক্ষরেই বেতন দেন। এসব অনিয়ম ধরা পড়ার পর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় তার বিরুদ্ধে কমিশনে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটিকে আরেকটির পরীক্ষা কেন্দ্র করার নিয়ম নেই। এর ফলে এক প্রতিষ্ঠান অপর প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার একটি কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের বেশি কড়াকড়ি করলে অপরটিও শুরু করে। কিন্তু বোর্ড চেয়ারম্যান নগরীর কোর্ট কলেজ এবং শহীদ মামুন মাহমুদ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজকে একে অপরের পরীক্ষা কেন্দ্র করেছেন।

আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কমিটি অনুমোদনের সময়ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমন একটি ঘটনায় তাকে আদালতেও তলব করা হয়েছিল।

গতবছর অধ্যক্ষ কমিটি দাখিল না করলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার রাজবাড়ী কলেজের গভর্নিং বডি অনুমোদন দিয়েছিলেন বোর্ড চেয়ারম্যান। এ নিয়ে কলেজটির অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান আদালতে মামলা করেন। এ মামলায় কলেজের নির্বাচিত সভাপতি মেসবাউল হক, শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান মোকবুল হোসেন এবং কলেজ পরিদর্শক হাবিবুর রহমানকে আসামি করা হয়। এ নিয়ে নথিপত্র নিয়ে সশরীরে হাজির হতে বোর্ড চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

রাজশাহীর শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড মডেল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন মোকবুল হোসেন। সেখানে তিনি কোনো পদে না থাকলেও টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ফলাফল ঘষামাজা করারও অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তদন্তে এসবের সত্যতা পাওয়ায় তাকে ওএসডি করে রাখা হয়েছিল। পরে রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজে পদায়ন হয় তার। তবে এবার আর অধ্যক্ষ হতে পারেননি। হয়েছিলেন বাংলা বিভাগের প্রধান। সেখানেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু তাকেই করা হয় বোর্ড চেয়ারম্যান। এ নিয়ে রাজশাহীর শিক্ষাবিদদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বোর্ড চেয়ারম্যানের দ্রুত অপসারণ দাবি করেছেন তারা।

আরও পড়ুন : করোনা প্রতিরোধে লক্ষ্মীপুরে পুলিশের কুইক রেসপন্স টিম

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোকবুল হোসেন বলেন, ষড়যন্ত্র চলছে। তাই এসব কথা ছড়ানো হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা নেই। কোয়ারেন্টিন না মানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি যখন বিদেশ থেকে আসি তখন কোয়ারেন্টিন নিয়ে এত কড়াকড়ি ছিল না। আর আমি কাজ না করলে গোটা বিভাগের শিক্ষকদের দুর্ভোগ হবে। সেজন্য কাজ করতেই বোর্ডে গিয়েছিলাম। কোভিড-১৯-এর নাম ভুল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টা জানা নেই। এর দায় আমার নয়।

ওডি/এএইচ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড