• সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বড় সন্ত্রাসী হওয়ার স্বপ্নে তিন বন্ধুর কিলিং মিশন!

  গাজীপুর প্রতিনিধি

০৯ নভেম্বর ২০১৯, ২২:২২
গ্রেফতার
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত তিন যুবক (ছবি : দৈনিক অধিকার)

মো. হোসেন ওরফে আপন (১৯), মো. ইমন রায়হান (১৮) ও মো. রায়সুল ইসলাম রিফাত (১৯)। তারা পরস্পরই প্রত্যেকের খুব কাছের বন্ধু। হঠাৎ এই তিন বন্ধুর মনে আশা জাগে তারা বড় সন্ত্রাসী হবে। গড়ে তুলবে বড় একটি সন্ত্রাসী গ্যাং। সর্বস্তরের মানুষ তাদের নাম শুনলেই ভয়ে আঁতকে উঠবে। অর্জন করবে প্রচুর অর্থ-সম্পত্তি। কীভাবে শুরু হবে তাদের এই পথচলা এটা ভাবতে ভাবতেই হোসেন তার দুই বন্ধুকে জানায় চাচা মো. সিদ্দিক ব্যাপারির কথা।

হোসেন তাদের বলে, আমার চাচার অনেক টাকা। গাজীপুর সদর থানার বিলাশপুর এলাকায় ছয় তলা বাড়িতে চাচা মো. সিদ্দিক ব্যাপারি ও তার পরিবার থাকে। একমাত্র ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন (২০) এবং ছেলের বউকে নিয়ে তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করছে। চাচার বাড়িতে ১০ থেকে ১৫ লাখ নগদ টাকা ও অনেক স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যেতে পারে বলেও দুই বন্ধুকে জানায় হোসেন। হোসেন জানায়, এসবের মালিক হতে হলে পরিবারের সবাইকে হত্যা করতে হবে।

এই পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২ নভেম্বর সকালে কিলিং মিশন সফল করতে তিন বন্ধু ব্যাগে চাকু ও রশি নিয়ে আশুলিয়া থেকে গাজীপুরের বিলাশপুরে চাচার বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয়। ওই দিন দুপুরের দিকে বাসায় পৌঁছালে ভাতিজা ও তার দুই বন্ধুকে আদর-যত্নে কাছে টেনে নেয় সিদ্দিকের পরিবার। পরে তিন বন্ধু রাতের খাবার খেয়ে ওই বাড়ির ছাদে বসেই হত্যার ছক আঁকে।

সিদ্ধান্ত হয়, পরদিন ৩ নভেম্বর ভোরে সিদ্দিক ব্যাপারি ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে গেলে তখনই তারা কিলিং মিশন শুরু করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে তারা চাচিকে হত্যা করবে। এরপর চাচা মসজিদ থেকে ফিরলে তাকেও হত্যার পর চাচাতো ভাই দেলোয়ারকে হত্যা করা হবে। আর সবশেষে ভাবিকে তিনজন মিলে ধর্ষণের পর তাকেও হত্যা করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে পূরণ হবে তাদের সব স্বপ্ন।

তিনজনের মধ্যে হোসেনের স্বপ্ন ছিল চাচার পরিবারের সবাইকে হত্যা করে লুটে নেওয়া অর্থ ও স্বর্ণ বিক্রি করে একটি ফ্ল্যাট, একটি পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল কিনবে। আর রিফাত ও রায়হানের স্বপ্ন, তারাও দুইটি পিস্তল ও মোটরসাইকেল কিনে বড় সন্ত্রাসী হয়ে নিজেদের সন্ত্রাসী জীবন পরিচালনা করবে।

এরপরই আসে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিন।

ওই দিন ভোরে তাদের পরিকল্পনার মতোই ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদের উদ্দেশে রওয়ানা হন হোসেনের চাচা সিদ্দিক ব্যাপারি। তিনি বেরিয়ে গেলে নির্ঘুম রাত কাটানো তিন যুবক নেমে পড়ে তাদের কিলিং মিশনে। প্রথমে সিদ্দিকের স্ত্রী রিনা আক্তারকে (৪৫) ঘুম থেকে ডেকে গলায় রশি পেঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে বিছানায় শুইয়ে রাখে তারা।

এরপর নামাজ শেষে চাচা বাড়ি ফেরা মাত্রই তাকেও রশি দিয়ে বেঁধে জবাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে শুরু হয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে সিদ্দিকের শরীরে এলোপাতাড়ি কোপানো। এক পর্যায়ে সিদ্দিক মৃত্যুর ভান করে ফ্লোরে শুয়ে থাকেন। এ সময় ঘাতকেরাও তাকে মৃত মনে করে আলমারির তালা ভেঙে তিন লাখ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার লুটে নিয়ে পা বাড়ায় চাচাতো ভাই দেলোয়ারের শোবার ঘরে। এ দিকে, মৃত্যুর ভান করে ফ্লোরে পড়ে থাকা সিদ্দিক কোনো রকমে গেইট দিয়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে চিৎকার দিয়েই অচেতন হয়ে পড়েন। তখন ভোরের আলো ফুটেছে মাত্র। এ চিৎকার শুনেই আশপাশের লোকজন ছুটে আসা শুরু করে। ফলে ঘাতকেরাও কিলিং মিশন শেষ না করেই কাঁধে ব্যাগ ও রক্তাক্ত জামা পরেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

না, এটি কোনো নাটক বা সিনেমার গল্প নয়। নাটক সিনেমা মনে হলেও এমন ঘটনাই ঘটেছে গাজীপুর মহানগরের বিলাশপুর এলাকায়। গত ৩ নভেম্বর রিনা আক্তার খুনের অন্তরালের কাহিনী এটি।

শনিবার (৯ নভেম্বর) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই তিন যুবককে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে র‌্যাব-১ স্পেশালাইজড কোম্পানির পোড়াবাড়ী ক্যাম্প কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, ওই তিন যুবককে গ্রেফতারের পর র‌্যাবের কাছে এমন তথ্যই দিয়েছে তারা।

এর আগে শুক্রবার (৮ নভেম্বর) রাতে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ওই যুবকদের গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মো. হোসেন ওরফে আপন (১৯) ভোলার বঙ্গেরচর (নদী ভাঙ্গা) এলাকার প্রয়াত আব্দুল হামিদ ব্যাপারির ছেলে। রায়সুল ইসলাম রিফাত ঢাকার সাভার থানার ঝাউচর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে। এছাড়া ইমন রায়হান (১৮) মাগুরার মহাম্মদপুর থানার নারায়ণপুর গ্রামের জহির রায়হানের ছেলে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব জানতে পারে, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত মো. রায়সুল ইসলাম রিফাত আশুলিয়া এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছে। এমন খবরে সেখানে অভিযান চালিয়ে রিফাতকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপর দুই বন্ধু কিলিং মিশনের মূলহোতা হোসেন ও রায়হানের নাম প্রকাশ করে। এক পর্যায়ে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রায়হানের নানা বাড়ি মাগুরা জেলার মহাম্মদপুর বাজার থেকে মো. হোসেন ওরফে আপন এবং মো. ইমন রায়হানকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত ওই তিন যুবকের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন র‌্যাব-১-এর স্পেশালাইজড কোম্পানির পোড়াবাড়ী ক্যাম্প কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল-মামুন।

ওডি/আইএইচএন

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড