• রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

ঝরাফুলের কাব্য : এক নান্দনিক রূপের মসৃণ উচ্চারণ

  রবিউল করিম মৃদুল

১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৫৮
প্রচ্ছদ
প্রচ্ছদ : কব্যিগ্রন্থ ‘ঝরাফুলের কাব্য’

‘ভালোবাসি
সে কথা তো বলতে আসিনি
বলতে আসিনি তোমার অসমাপ্ত আত্মজীবনী
অজস্র ঘৃণায় যন্ত্রণা কাতর তুমি
কাতরতায় ক্লান্ত তোমার প্রত্যেকটি বেদনা যেন
এক একটি ঝরাফুলের কাব্য।’

ভালোবাসাবাসি ওসব বরং থাক। কবির যেন মন ভালো নেই। ঈষৎ বিষণ্ণ হৃদয় কবির বুকের ভেতর যেন বেজে চলে অনবরত টিংটং টিংটং বেদনার কাঁটা। তবে সে কাঁটাগুলোকে কেবলই কাঁটা বলে মানতে নারাজ কবি। কবি ধ্রুপদী রিপন। আমার বন্ধু মানুষ। বেদনার কাঁটাগুলোকে পরম মমতায় তিনি দিতে চান নান্দনিক রূপ। গড়তে চান ঝরাফুলের কাব্য। তার বেদনায় আর্ত হৃদয়ের মসৃণ উচ্চারণ এই ঝরাফুলের কাব্য। প্রকাশিত হয় একুশের বইমেলা ২০১৭তে। বইটি প্রকাশ করে চৈতন্য প্রকাশনী। 

‘ঝরাফুলের কাব্য’ নামটির মধ্যে ছড়িয়ে আছে একরাশ বিষাদের প্রলেপ। সময় বয়ে যায় সময়ের নিয়মে। ছোট চারা গাছ, বড় হয়। সে গাছে কুঁড়ি আসে। কুঁড়ি থেকে ফোটে ফুল। সে ফুল ঝরেও পড়ে। লোকেরা সে ফুলের সৌরভ পায় কি পায় না তার হদিস এখানে অনুপস্থিত। চরম বাস্তবতা হলো ফুলগুলো ঝরে পড়ে। এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু হয় না। রিপন এই ঝরে পড়া ফুলগুলো দিয়েই গড়তে চান কাব্য। সুন্দরের কাব্য। নন্দনের কাব্য। অধিকারের কাব্য। সংগ্রামের কাব্য। একই সাথে কাব্য সে প্রেমের।
একজন সোনালীর গল্প কবিতায় তিনি লিখেছেন, 
‘ছলাকলা দেখিয়ে পাশের বাড়ির মোহন
খুলে নিলো তোমার হাতের বালা
তুমি নির্বাক, যেন আজও তুমি কিশোরী;’

বহুকাল আগে পলাশী পরাজয়ের পর বাংলা অঞ্চলের রূপ লাবণ্যের প্রতি যে লোলুপ দৃষ্টি পড়ে ব্রিটিশদের, তার ধারাবাহিকতা জারি থাকল স্বাধীনতাত্তোর কালেও। এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের রক্ত শুষে নিয়ে গড়ে উঠছে প্রতিবেশী দেশগুলোর শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। ৪৭র এর পর থেকে নিয়েছে পাকিস্তান। ৭১ এর পর থেকে নিচ্ছে ভারত। সময়ের বিবর্তনে জোড়াজুড়িটা বদলে গেছে ছলাকলায়। কবি রিপন এখানে রাখঢাক করেননি। 

সরাসরিই আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন প্রতিবেশীর কূটকৌশল। যদিও  এ থেকে পরিত্রানের কোনো উপায় বাতলে দেননি। কি বা বাতলে দেবেন? আছে কি কোনো উপায়? যে অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে সোনালী নামক দেশটা, তার মুক্তির পথ কি? তাই তো বেদনা কবির হৃদয়ে। সেই বেদনা থেকেই জন্ম দিতে চান সুন্দর। সুন্দরের কাব্য।

একই কবিতায় অন্য একটি চরণে লিখেছেন-
‘তোমার নূপুর-বালা, ঘন কালো বনানী-বুকের উঁচু মাংসপিন্ড
এক বীভৎস চিত্র; তোমার সন্তান তোমার ভক্ষক।
দু:খিত আমি-
ভুলেই গেলাম তুমি চল্লিশ ছুঁই ছুঁই, এবং
তুমি আমার মা!’

কেমন করে মাতৃরূপী জন্মভূমির ওপর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হুংকারে এরই সন্তানেরা। খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গুম, সুদ, ঘুষ সব চলছে দেদার। যে যেভাবে পারছে চুষে নিচ্ছে মায়েরই শরীর। এক ভয়ংকর বীভৎসতা ফুটে উঠছে দেশ মাতার সর্বাঙ্গজুড়ে। অথচ দেখার কেউ নেই। কে দেখবে? শত্রু বাইরের হলে তাকে চেনা যায়। ঘরের শত্রু চেনা যায় না। এই দেশের, এই মাটির সন্তানেরাই বারবার রক্তাক্ত করছে দেশকে। ছোট্ট শিশুর অফোটা যোনী ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে একেরপর এক। কোনো প্রতিবন্ধকতা কোনো প্রতিরোধই গড়া যাচ্ছে না যেন। কবি রিপন, সরাসরি দু:খ প্রকাশ করেছেন এ বিষয়ে, দু:খিত আমি- ভুলেই গেলাম তুমি চল্লিশ ছুঁইছুঁই, এবং তুমি আমার মা!
রিপন সরাসরি কথা বলতে যেমন ভালোবাসেন। তেমনি নান্দনিক তার রূপকের ব্যবহার। উঁই পোকাদের গল্পে তিনি লিখেছেন-
‘একটি পিরামিডের উপরিতলে
 কিছু সুগন্ধী ছেটানো হলো
পরম যত্নে; এক আলো আঁধারি রাতে
আরও অভ্যন্তরে, দুর্গন্ধরা সমবেত হয়
জোট বাঁধে কিছু উঁইপোকা
মাংসের রসে বেড়ে ওঠা উঁইপোকারা
বায়ু দূষণ করে চলে বিরামহীন।’

ওপরের সুগন্ধির তলে ভেতরে ভেতরে জমাট বাঁধে উঁইপোকার দল। মাংসের রসে বেড়ে ওঠে ওরা। বায়ু দূষণ করে চলে বিরামহীন।  এ যেন সমাজেরই অন্য রূপ। সভ্যতার মুখোশ পরা মানুষগুলো যেন একএকটি উঁইপোকা। মাংস লোভী সকলে। অথচ ওপরে কি দারুণ খুশবু গা থেকে ছড়ায় এদের। নিষ্পাপ নিষ্কলুশ মনে হয়। অথচ ভেতরে দুর্গন্ধে ঠাসা!

ঝরাফুলের কাব্যজুড়ে আমরা এক বেদনাহত কবিকে খুঁজে পাই বারবার। ব্যথাতুর একটি ভগ্ন হৃদয় বারবার ব্যথিত করে আমাদেরকে। যে বেদনার কেন্দ্র বিন্দুতে কখনো থাকে দেশ, কখনো থাকে একজন মানবী। সেও দেশেরই যেন আরেক রূপ। যার বুকে মাথা গুঁজে রাখার কথা ছিল। কিন্তু হয় না। মাঝখানে কেটে যায় তাল। শূন্যতারা চেপে বসে বুকের কাছে-
‘আমার আকাশে তুমি
অস্তাচলে ডুবে যাওয়া রবি।
তোমার আকাশে আমি
পথহারা মোসাফির
বাউল কিংবা কবি।
আমার দুয়ারে তুমি
অগ্নিমূর্তি, হৃদয় শিকারী
তোমার দুয়ারে আমি
অভাগা কাঙ্গাল
প্রেমিক না হয়ে ভিখারি।’

তবুও তাকে হেলাফেলা করলে চলে না। এখনো কবিহৃদয়ে জাগ্রত থাকে মধ্য দুপুরে সূর্যের মতো প্রেয়সীর মুখ। কবি থাকে পথহারা। কিংবা ঘরছাড়া বাউল। যার কোনো ঠাঁই নেই। যার কোনো দিক নেই। কেবলই ভেসে চলা এঘাট থেকে ওঘাটে। কাঙালের বেশে। ভিখারির বেশ। একটু শান্তির, সুখের পরশ কেউ বুলাবে বলে।

একদিকে যেমন খেলেছেন প্রেম নিয়ে অন্যদিকে কটাক্ষের চোখে তাকিয়েছেন চেতনার ধ্বজাধারীদের দিকে। তথাকথিত চেতনাবাজদের স্পষ্ট  করেই বলেছেন-
‘তোমরা বিপ্লবী বলে
আজও আনাচে-কানাচে, ফসলের ক্ষেতে কিংবা ঝোপে;
অনিচ্ছায় রক্তাক্ত হয় অগনিত পাজামা
সাদা-কালো রাজপথ রক্তাক্ত করে কিছু উজবুক জানোয়ার।
তোমরা বিপ্লবী বলে
শাসকের কাছে শোষিত হয়ে তোল তৃপ্তির ঢেঁকুর
জীবিত মননে বহন করে চলো আগামী লাশের গন্ধ।
তোমরা বিপ্লবী বলে
কৃতজ্ঞচিত্তে তোমাদের জানাই আহসান হাবীবীয় ধন্যবাদ।’

এত যে বিপ্লব, এত যে চেতনার বাহার তোমাদের, তাতে লাভটা কি? কি হচ্ছে ওতে? কিছু কি বন্ধ করতে পারছ? এখনো নৈমেত্তিকভাবে আনাচে কানাচে, ফসলের ক্ষেতে, ঝোপে ঝাড়ে, বাড়িতে, গাড়িতে, এমনকি রাষ্ট্রীয় অতিথিশালার কক্ষে পাওয়া যায় রক্তাক্ত অগণিত পাজামা। রাজপথ রঞ্জিত হয় বারবার। আগুনে পুড়ে মনে জ্যান্ত মানুষ। অথচ তোমরা বিপ্লবীরা তোল তৃপ্তির ঢেঁকুর। অনেক বিপ্লব তো করা হল। এদেরকে রিপন অবজ্ঞার ধন্যবাদ ছুঁড়ে দিয়েছেন!

একই রকমভাবে হাহাকার ফুটে উঠেছে তার সুলেখা কবিতাটিতে। সুলেখাকে সমস্ত প্রেম নিয়ে ভালোবাসা নিয়ে, সত্য সুন্দর, নিয়ে বারবার তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এই আঙিনায়- 
‘চলে এসো সুলেখা
বাতাসে ভেসে আসা বারুদের গন্ধে মেলে ধরো তোমার আঁচল
অভিমান ভুলে বিলিয়ে দাও কিঞ্চিত ফুলের সুবাস’

সর্বমোট ৪৫টি ভিন্নভিন্ন স্বাদের কবিতা স্থান পেয়েছে ধ্রুপদী রিপনের ঝরাফুলের কাব্য গ্রন্থে। ভিন্ন ভিন্ন সময়ের বয়ান তিনি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে চিত্রায়ণ করেছেন এখানে। অতিরিক্ত ভাষার ব্যঞ্জনা তৈরির প্রয়াস নেই। নেই শব্দ চাপিয়ে দেওয়ার উটকো যন্ত্রণা। যা কিছু যেমন, ঠিক তেমনই ভাবে ধরার চেষ্টা রয়েছে তার কবিতায়। সরল বাক্যভঙ্গিতে লিখতে পছন্দ করেন তিনি। অধিকাংশ কবিতাই পাঠকের ভালো লাগবে আশা করি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি তার কবিতায় দৃশ্যকল্প তৈরির ঘাটতি লক্ষ করেছি কিছুটা। 

কবিতার শব্দের বুনন এমন হওয়া চাই, যেন চোখের সামনে ফুটে উঠে তার ছবি। পাঠক সেই ছবির মধ্যে হারিয়ে যায়। শব্দগুলো  গিয়ে আঘাত করে অন্তরের গহিনে। রিপন সঠিক ট্রাকেই চালাচ্ছেন তার কবিতা। কেবল আরেকটু স্থীর হওয়া দরকার। বয়ানে আরেকটু মাধুর্যতা হলেই বিষয়টা জমে যায়। তারপরও কবিতা জোর করে লেখার বিষয় তো আর না। যেমনটা ভেতর থেকে আসতে চাইবে, কবিকে তাই লিখতে হবে। জোর করে কবিতা লেখা যায় না। কবিতার জন্ম আপনা আপনি হয়। যে যেভাবে আসে, তাকে ঠিক সেইভাবেই জন্ম দিতে হয়। কবির এইখানে কিচ্ছু করার থাকে না তেমন। কবি যেন বোধগ্রস্থ এক প্রাণ। কবিতাই চালনা করে তাকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাফুলের কাব্যর জন্য অফুরাণ শুভকামনা কবি ধ্রুপদী রিপনের জন্য। বাংলা কবিতার জমিনে নতুন চাষীকে আমন্ত্রণ।


কাব্যগ্রন্থ : ঝরাফুলের কাব্য
কবি : ধ্রুপদী রিপন
প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান
প্রকাশকাল : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭, 
প্রকাশন : চৈতন্য প্রকাশনী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড