• বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

মেঘের বাড়ি ‘মেঘালয়’ (৪র্থ দিন)

  সোমিত্র সৌম্য ১০ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:৫২

রেইনবো ফলস
রেইনবো ফলস

সকাল ৬ টায় আমরা যখন চলতে শুরু করেছি বাইরে তখন হালকা কুয়াশা, শীতের চাদর তখন যাই যাই ভাব। সূর্য তখন ঠিক মত পাহাড়ের ঠিক মাথার উপর আলো ফেলতে শুরু করেছে, এতে পাহাড়ের চুড়াগুলোকে মনে হচ্ছিল ‘বুড়ো দাদুর টাক’। আলো পড়াতে কেমন চকচক করছে। 

আগের রাতে ঘুম ভাল হওয়াতে শরীর ছিল ফুরফুরে। মুহূর্তেই আমরা পৌঁছে গেলাম প্রায় অর্ধেক রাস্তা। আর মনের মধ্যে রোমাঞ্চ কাজ করছিল প্রতিক্ষিত দুইটি ঝর্নার কাছাকাছি পৌঁছানোর। কিন্তু সুখ তো সবসময় থাকে না, তেমনি সিড়ির পথ একসময় শেষ হয়ে এলো শুরু হল পাথর বিছানো, মাটি কাটা ভাঙা, খাঁড়া ভঙ্গুর পথ। 

বাম পাশে ন্যাচারাল সুইমিং পুলকে ফেলে রেখে আমরা হেটে চললাম রেইনবো ফলসের উদ্দেশ্যে। গুগুল ম্যাপ জানালো আর মাত্র কিছুক্ষণের পথ। রাস্তার বাম পাশে বেশ কিছু বেয়ে চলা ঝর্ণাকে কাটিয়ে আমরা উঠতে লাগলাম পাহাড়ের ওপরে। রেইনবো ফলসের কাছাকাছি আসতেই বুঝতে পারলাম এর বিশালতা, দূর থেকে কানে আশা শো শো শব্দ তাহলে মিছে নয়। এর পক্ষেই সম্ভব এমন গর্জন।

‘রেইনবো ফলস’ এর নামকরণের কারন হচ্ছে এর বৈশিষ্ট্য। সূর্য যখন ঠিক এই ঝর্ণার মাথার উপর উঁকি দেয় ঠিক তখন নিচের জলের মধ্যে রঙধনু দেখা যায় কিন্তু আকাশ তখন রঙধনু শুন্য। আর এই কারণেই এর নাম ‘রেইনবো ফলস’। এটি হচ্ছে মেঘালয়ের অন্যতম হিডেন ট্যুরিস্ট স্পট। দুর্গম পথ আর কষ্টকর ট্রেকিং এর কারণে এখানে টুরিস্ট সংখ্যায় খুব কমই আসে বলা চলে। 

এই ঝর্ণার সাদা ফেনিল জল নিচের একটি গোলাকার আকৃতির বিশাল পাথরের উপর সরাসরি পড়ে। এর গতি এতই বেশি যে আমরা প্রায় ৫০ মিটার দূর থেকেও ভিজে যাচ্ছিলাম। সবার তখন নিজের চাইতে মোবাইল ফোন বাচানোর আকুল প্রচেষ্টা।  

এর নিচে নামার রাস্তা বেশ পিচ্ছিল তাই আমরা বৃথা চেষ্টা করে আবার ফিরে এলাম উপরে। শুকনো খাবার নিয়ে এসেছিলাম আমরা সাথে করেই। সেটা খেয়ে আধা ঘণ্টা পর আবার আমরা রওনা দিলাম ফিরতি পথে যেখানে অপেক্ষা করছে মেঘালয়ের সুন্দরী ‘ন্যাচারাল সুইমিং পুল’। 

‘ন্যাচারাল সুইমিং পুল’ কে এক কথায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। মনে হয়, ঈশ্বর নিজ হাতে মর্ত্যের মানুষের জন্য এমন একটা জলধারের ব্যাবস্থা করে রেখেছেন। ১০ ফুট উপর থেকে একটি জলের তীব্র ধারা একটা বিশাল গোলাকার পাথরে দুভাগ হয়ে নিচে পড়ছে। লম্বায় প্রায় ৪০-৫০ ফুট গোলাকার একটি পুলের জলের রঙ নীলাভ নীল, যাকে ঘিরে আছে বিশাল বিশাল উঁচু পাথর। 

হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা স্বচ্ছ জল আর নিচে ভেসে যাওয়া সাদা রঙা ছোট মাছের দল মিলেমিশে যেন এক জীবন্ত একুরিয়াম। সাঁতার না জানা থাকলে আর এখানে এসে স্নান না করলে আপনার এত কষ্ট করে আসাই বৃথা। যারা আমার মত স্বপ্ন পাগল তারা পুলের উপর ভেসে থাকা পাথরে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দিবা স্বপ্ন দেখতেই পারেন। নীল জলে দাপাদাপি, মাছেদের সাথে ভেসে থাকা আর ডুব দিয়ে রঙিন পাথর কুড়ানো; এটাই বুঝি জীবন। 

এক ঘণ্টা পর সবাইকে ডেকে যখন উপরে তোলা হল আমরা তখন আনন্দে ক্লান্ত, সবার মনে তখন আরেকটু থেকে যাবার ইচ্ছা। কিন্তু সে ইচ্ছাকে আমরা অনেক কষ্টে জলাঞ্জলি দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম গ্রামের উদ্দেশ্যে। এখানে এসে একটা জিনিস খেয়াল করলাম, মেঘালয়ের মানুষ খুবই পরিছন্ন। পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে এরা খুবই সচেতন। এই দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায়ও তারা ময়লা জড়ো করে রাখে পাথরের পাশে রাখা বড় কোন পলিথিনে। 

আমরা যে হোমস্টেতে ছিলাম তার মালিকের নাম কি ছিল জানি না কিন্তু আমরা আদর করে নাম দিয়েছিলাম ‘ব্রাদার বুলেট’। এই ৫৬ বছর বয়সেও সে যেভাবে দৌড়ে কাজ করছিল তা দেখে আমরা সবাই হা! রান্না থেকে রাজমিস্ত্রী সব কাজে সে সমান ভাবে পারদর্শী। সে কথা বলতে পারে ৮টি ভাষায়। সেখানেই নুডুলস আর ডিমের ওমলেট খেয়ে বিদায় নিয়ে রওনা হলাম আবার তিরনা গ্রামের উদ্দেশ্যে। আবার সেই ক্লান্তিকর জার্নি। 

আগের পর্ব পড়তে : মেঘের বাড়ি ‘মেঘালয়’ (তৃতীয় দিন)

কিন্তু এবারেরটা আরো ভয়ংকর। প্রায় ২০ কেজি ওজনের ব্যাগ নিয়ে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে সবারই দম শেষ অবস্থা। প্রায় ২ ঘণ্টা কষ্টকর অধ্যায় পার হয়ে আমরা পৌঁছালাম তিরনায়। 

silong

রাতের শিলং 

আমাদের প্ল্যান ছিল গাড়ি নিয়ে চেরাপুঞ্জি যাওয়া আবার সেখান থেকে গাড়িতে শিলং শহর। সে অনুযায়ী আমরা ১৬০০ রুপি দিয়ে দুইটি ক্যাব ভাড়া করলাম। কিন্তু আধাঘণ্টা পর গাড়ি সেখানকার বাসস্ট্যান্ডে যাওয়া মাত্রই আমাদের চোখ পড়ল লোকাল জীপের উপর যেটা সরাসরি শিলং শহরে যায়। তাই আমরা চেরাপুঞ্জির প্লান বাদ দিয়ে ১০০০ রুপিতে সে জীপে চড়ে বসলাম সবাই। এতে সময় এবং অর্থ দুটিই বেঁচে গেল সহজেই।

গাড়ি যখন রাস্তা ধরে আগাচ্ছিল অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম পাহাড়ের উপর কী সুন্দর করে গড়ে উঠা শিলং শহর! দারুণ সব স্থাপত্যশৈলীর মাঝে উঁকি দিচ্ছে সারি সারি পাইন গাছ। সাজানো গোছানো এক পরিপাটি শহর বলা চলে শিলং কে। এখানে গাড়ির ওভারটেকিং নেই বললেই চলে। সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে চলেছে যার যার গন্তব্যে। 

বিকাল পাঁচটা নাগাদ গাড়ি যখন পুলিশ বাজারের কাছাকাছি এলো তখন কিছুটা জ্যাম পেলাম। ড্রাইভার জানালো একমাত্র এ জায়গাটিতেই নাকি একটু জ্যাম হয় এবং বাকি সব রাস্তাই ফ্রি। পুলিশ বাজার হচ্ছে শিলং এর প্রাণ কেন্দ্র। এখানে প্রচুর হোটেল রয়েছে এবং যেহেতু টুরিস্টরা এসে মূলত এখানেই থাকে তাই এই বাজারকে ঘিরেই সব ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

আমাদের ইন্ডিয়ান কারেন্সি শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে বাজারে নেমেই ডলার ভাঙ্গিয়ে নিলাম। এবার শুরু হল হোটেল খোঁজা। এখানে হোটেলের ভাড়া বেশি। তাই আমরা অনেক খুঁজে একটা হোটেলে দুইটা রুম পেলাম যার ভাড়া ৩০০০ রুপি। 

রুমে এসে ফ্রেশ হয়েই আমরা বেরিয়ে পরলাম শিলং শহর দেখতে। এখানে রাত মানেই রঙিন। মনে হলো, চীন অথবা থাইল্যান্ডের কোন শহরে এসে পড়েছি। প্রথমেই আমরা টেস্ট করতে শুরু করলাম স্ট্রিট ফুড, শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামলাম বিরিয়ানি তে। হালকা শীতে শিলং শহরে হাঁটার মজাই আলাদা। রাত ১১টার দিকে রুমে ফিরে পরের দিনের প্রস্তুতি হিসাবে ঘুমিয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি।

চলবে...  

প্রয়োজনীয় কিছু টিপস-

#আগে থেকেই ভ্রমণ ট্যাক্স কেটে নেবেন।
#সেখানে যেহেতু অধিকাংশ সময় বৃষ্টি হয় তাই অবশ্যই মনে করে ছাতা অথবা রেইনকোট নিয়ে নিবেন।
#ডাউকি বাজারে তেমন মানি এক্সচেঞ্জ চোখে পড়েনি তাই আপনি যদি ইন্ডিয়ান রুপি না নিয়ে যান তবে স্থানীয়রা বিএসএফ এর চোখের আড়ালে তাদের দোকানে মানি এক্সচেঞ্জ করে থাকেন সেখান থেকেও করে নিতে পারেন। 
#শিলং, চেরাপুঞ্জিতে আবহাওয়া ঠান্ডা তাই অবশ্যই হালকা গরম কাপড় সাথে নিয়ে নিবেন।
#প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে নিতে ভুলবেন না। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যেহেতু হাঁটবেন সেহেতু মশা বা পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচতে অডোমাস নিতে পারেন। 
#এছাড়া পলিব্যাগ, পাওয়ার ব্যাংক, টর্চলাইট নিয়ে নিবেন।
#ইন্ডিয়াতে সিম কিনে চালু হতে ২ দিন সময় লাগে তাই দুই দিনের আগে কেউ যদি  পুরাতন ইন্ডিয়ান সিম দিয়ে যোগাযোগ করতে চান তাহলে অবশ্যই ইন্ডিয়ান বর্ডারে ঢুকে কাস্টমার কেয়ার থেকে সিমটি চালু করে নিবেন।
# মেঘালয় খুব সুন্দর একটা রাজ্য। সেখানে রাস্তায় ময়লা আবর্জনা দেখা যায় না বললেই চলে। তাই দয়া করে কেউ রাস্তায় ময়লা ফেলবেন না। 
#আপনার আচরণ আপনার ব্যক্তিত্ব, পরিচয় বহন করে। তাই স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। 

ভ্রমণ মানুষের তৃতীয় চোখ খুলে দেয়। তাই বেশি বেশি ঘুরুন, নিজেকে আবিষ্কার করুন প্রতিনিয়ত এই বিশালতার মাঝে।

দেশ কিংবা বিদেশ, পর্যটন কিংবা অবকাশ, আকাশ কিংবা জল, পাহাড় কিংবা সমতল ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা অথবা পরিকল্পনা আমাদের জানাতে ইমেইল করুন- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড