• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

জীবনবোধের অধ্যায় গিরীশ গৈরিকের ‘মেডিটেশনগুচ্ছ’

  মাসুদ চয়ন

০৭ মার্চ ২০২০, ১৩:৪৪
প্রচ্ছদ
প্রচ্ছদ : কাব্যগ্রন্থ ‘মেডিটেশনগুচ্ছ’

বেদনাকে কতো সহজে গভীর জীবন বোধের ভাষার রূপদানে শিল্পে পরিণত করা যায় সে কথা জানতে বা অনুধাবন করতে হলে গিরীশ গৈরিকের কবিতার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। গিরীশ গৈরিক সাম্য স্বচ্ছতার কথা বলেন, মানবিক জীবনদর্শন তার কবিতার মূল নিয়ামক; যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে ‘মা : আদিপর্ব’ এবং ‘ডোম’ সিরিজ কাব্যগ্রন্থের গভীরে। গিরীশ গৈরিক কবিতা বলার বা লেখার জন্য নিজস্ব এক ভাষার কথা বলার ধরন সৃষ্টি করেছেন; তিনি সহজভাবে কথা বলতে ভালোবাসেন পদ্যে বা গদ্যে; সেই সহজবোধ্য ভাষার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীরতম উপলব্ধিবোধ, সেই সঙ্গে আধুনিক দর্শনবাদ; ২০২০ সালের একুশে বইমেলায় তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মেডিটেশনগুচ্ছ’ কথাপ্রকাশের প্যাভিলিয়নে গিয়ে দেখেছি তার গ্রহণযোগ্যতা। কাব্যগ্রন্থটি সংগ্রহ করার পর নিমগ্ন হয়ে দু’বার পাঠ করা শেষ করেছিলাম।

আধুনিক কবিতায় ইদানিংকালে অতিরিক্ত পরাবাস্তবতার প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়। সঠিক সাবলিল পরাবাস্তবতার প্রয়োগে কবিতা হয়ে ওঠে শিল্পবোধে অনন্য; পক্ষান্তরে ভুল অযৌক্তিক পরাবাস্তবতার প্রয়োগ কবিতাকে করে তোলে দুর্বোধ্য এবং বোধহীন। গিরীশ গৈরিক তার ‘মেডিটেশনগুচ্ছে’ পরাবাস্তবতা, পৌরাণিক ও আধুসিক প্রয়োগে যৌক্তিকতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তার কবিতায় কেবল নিজেকে বিবরণ দেয়ার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়নি; তিনি অগনিত পঙক্তিতে প্রশ্ন রেখেছেন পাঠকের কাছে। যাতে পাঠক ভাবার বা চিন্তা করার অবকাশ পায়। এই কাব্যের পঙক্তিতে নিবিষ্ট হওয়া যাক :
‘আলো জন্মের বহু আগে থেকে আমি অন্ধ
তবুও তোমরা কেউ কি আমায় একটি জন্মান্ধ আয়না দিবে?
আমি একটি অন্ধকারের কাবিতা লিখবো’

কবির এখানে অন্ধকারের অতলে ডুবে থাকার গভীর গ্লাণিভরা আফসোসের অনুসন্ধানের খোঁজ মিলেছে। কবি যে হতাশার কথা বলতে চেয়েও বলতে পারেননি। অথচ অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলেন। মানুষের অন্ধচক্ষু খুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র কবিকে স্বাধীনভাবে বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। সত্যিই তো চারদিকে আজ অমানবিক অন্ধকারের শোরগোল। তাই কবি জন্মান্ধ আয়নার সাক্ষাৎ নিয়ে অন্ধকারের কাব্য লিখতে চেয়েছেন। যে অন্ধকারে জর্জরিত আজ মানব সভ্যতা। কবি বলেছেন :
‘পৃথিবীতে আবার একটি সকাল এসেছে
‘আবার’ শব্দটি প্রমাণ করে পূর্বে আরেকটি সকাল ছিলো।
এভাবে ‘আবার ও আরেকটি’ শব্দদ্বয় প্রমাণ করে নতুন একটি সকালের প্রত্যাশা’

কতো সহজভাবে টেনে দিলেন অতীত থেকে ভবিষ্যৎ অব্ধি দূরত্ব রেখা। যে রেখায় ভর করে জীবন নদীটি বেয়ে চলছে যুগ যুগ ধরে। এবার কবির ভাষায় পরাবাস্তবতার প্রয়োগ লক্ষ করি:
‘একদিন তোমার কবিতা আকাশ হলো
সেই আকাশে আমি তিমি হয়ে উড়লাম।
একদিন আমার দুঃখ সাগর হলো
সেই সাগরে তুমি ঈগল হয়ে ডুবলে’

কবির কল্প ভাবনার চিত্রকল্প পরাবাস্তবতার প্রয়োগে নতুন এক জগতকে রূপ দিয়েছেন, যে জগতে পাখিরা জলে সাঁতার কাটতে বা ডুবতে জানে আর মাছেরা আকাশে উড়তে জানে। কতো সহজেই কাছে পেলাম নতুন এক কল্পজগৎ। যা মানুষের কল্পবাজ হৃদয়ের নিত্যনৈমিত্তিক খোরাক। প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা কল্পজগৎ আছে। কেউ প্রকাশ করতে বা আঁকতে পারে কেউবা পারে না। কবি এখানে সেই কল্পজগৎকে আঁকতে সক্ষম হয়েছেন শিল্পস্বচ্ছ নিবেদনে। আরও কিছু পরাবাস্তব চিত্রকল্পে নিমগ্ন হই তবে। দেখি কতো গভীরে নিবিড় নির্জন হওয়া যায়:
‘রামধনু ছাতা হাতে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে বোধের স্টেশনে
তুমি ওই পাহাড়ে আমি এই পাহাড়ে
আমাদের মাঝে অদৃশ্য নদী
আমরা ছুটছি, আমরা প্রাণপণে ছুটছি রঙিন ছাতা হাতে অদৃশ্য নদীতে’

এবার কবির দার্শনিক চিত্তাকর্ষণের নির্যাস আচ্ছাদন করা যাক:
‘তুমি স্থির অবিচল হয়ে বসে আছো 
যেন বুদ্ধের ভাসান।
যোগৈশ্বর্য তোমাতে লীন হয়ে আছে 
আমি তোমার শরণাগত’

গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে কবি নিজের ভিতরে নিজেকে প্রবেশ করিয়েছেন। তারপর কতো কথা কতো গল্প কতো প্রশ্ন টেনে এনেছেন স্বকীয় হৃদয়ের গহীন হতে।কবির কাব্যখানি যেন পঙক্তির স্মারক দলিল। কতো কতো যে দার্শনিক অভিজ্ঞতা বলে শেষ করা যাবে না। কবি হয়তো সেই শেষ অতল ছুঁয়ে দেখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন:
‘কোমল বাতাস। সিঁদুরে মেঘ। বাঁশির ঘ্রাণ নদীর জলে মিশে পবিত্র হয়ে উঠেছে
এ যেনো কোনো এক সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মন’

এই দর্শনবোধ থেকে আরেকটি চিরায়ত সত্য স্পষ্ট হয়েছে। মানুষ চাইলে নিজেকে বদলাতে পারে। প্রয়োজন পরিশুদ্ধিকরণ অরাধনার। কবি যে আরাধনা গ্রন্থটি লেখার সময় অসংখ্যবার করেছেন। বইমেলায় সময় অসংখ্য নিউজ-পোর্টালে কবির একটি কমেন্ট প্রকাশিত হয়েছে, সেটা পড়ে দেখা যাক : ‘আমি মেডিটেশনগচ্ছ লিখেছি গভীর রাতে। প্রথমে স্নান করে নগ্ন হয়ে হয়ে টেবিলে বসতাম, তারপর এক-এক করে অসংখ্য মোমবাতি, আগরবাতি, ঘিতপ্রদীপ জ্বেলে দিতাম। টেবিলে রাখা রঙিন পানি পান করতাম আর একঘণ্টা ধরে ধ্যানের মিউজিক শুনতাম। এভাবে আমি রাতের পর রাত কবিতা লিখেছি।’। এই হলে গিরীশ গৈরিকে ধ্যান। এমন ধ্যান তিনি ‘ডোম’ কাব্যগ্রন্থ লেখার সময় করেছিলেন অন্যরূপে।

আরও পড়ুন : অর্ধবৃত্ত : জীবনের নানান সত্ত্বার গল্প

গ্রন্থ পরিচিতি

কাব্যগ্রন্থ : ‘মেডিটেশনগুচ্ছ’
কবি : গিরীশ গৈরিক
প্রকাশনী : কথাপ্রকাশ
প্রচ্ছদ : আইয়ুব আল আমিন
মূল্য : ৪০০ টাকা
অলঙ্করণ : নাসিফ আহমেদ (বাংলাদেশ), শ্রী গোপাল চন্দ্র নস্কর (ভারত), ভিতোর সান্তোস (পর্তুগাল), লুইডমিলা কোগান (আমেরিকা), ফার্নান্দো কোবেলা (ভেনেজুয়েলা), আইরিনা অরলভ (আমেরিকা)।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড