• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

অর্ধবৃত্ত : জীবনের নানান সত্ত্বার গল্প

  তকিব তৌফিক

০৪ মার্চ ২০২০, ০৯:৩৪
প্রচ্ছদ
প্রচ্ছদ : উপন্যাস ‘অর্ধবৃত্ত’ 

শুরুতেই লেখককে জানাতে চাই,
অর্ধবৃত্ত উপন্যাস ইংরেজি সাহিত্যের বই হলে এই বই অথবা উপন্যাস যেভাবেই বলি এর নাম Maze বা The Maze of Relationship দেয়া যেতো। এটা পাঠকের জায়গা থেকে বলছি। 

উপন্যাসের গল্পকে কেন্দ্র করে ব্যাপারটা আলোচনা করা যেতে পারে, তবে আমি কয়েক বাক্য নিজের কিছু অনুধাবনের কথা বলছি:
আমি একটা কথা বিশ্বাস করি, একজন মানুষ তার এক জীবনে নানান সত্ত্বা বয়ে বেড়ায়। জীবনের যে বয়স স্তর তার সাথে সাথে এই সত্ত্বার পরিবর্তন আসে। এবং এই পরিবর্তন আর আচার-আচরণগুলো কিংবা যদি বলি ভাবনা-চিন্তার ক্ষমতাটা একটু সবার ক্ষেত্রেই হয় তবে এলোমেলো কিংবা আগে পরে। তারপর একটা সময় নির্দিষ্ট একটি সত্ত্বায় স্থির হয়। এবং তা বয়ে যায় জীবনের অন্তিমে। এই ধারায় দু’টো মানুষের জীবনের সত্ত্বা হয়ে যায় আলাদা। দুই দেহের দুইটি প্রাণের সত্ত্বা গুলো তখনই পার্থক্যের বিবেচনায় পরে। বিষয়গুলো সম্পূর্ণ আমার ভাষ্যে বলা, যা জীবনের নিয়ম বলে আমি ধরে নিই কিংবা পোষণ করি। 

বলছিলাম অর্ধবৃত্ত উপন্যাসে’র ভেতরের গল্পের কথা! এই গল্পের চরিত্রগুলো নিয়েই আমি নিজে ভারি সংকটে পরি। প্রতিটি চরিত্র যার বিপরীতে কিংবা যার সাথে সম্পর্ক জড়িয়ে আছে তাদের সাথে এক অদ্ভুত দু’টানা; সংকটময়। না না, উভয় সংকট বললেই মনে হয় যথার্থ হবে। কিন্তু কেনো এমন হবে? কি জন্য এমন হতেই হবে?

তার প্রত্যুত্তরে এটাই কি ধরে নিতে হবে যে, মানুষ তার স্থিরীকৃত সেই সত্ত্বার প্রভাবে সেভাবেই পরিচালিত হয়ে বিপরীত মুখো! হ্যাঁ তাই তো! দু’জন মানুষ, দু’টি মানুষ মন, দু’মুখো সত্ত্বা হলে তো এমনটাই হবে।

আর গল্পে এমনটাই এসে গেছে। এটাই রোজকার চোখের দেখা; আর চোখের দেখা মানেই অধিকাংশেরও বেশি বাস্তবতা বয়ে বেড়ায়। অর্থাৎ এটাই বাস্তবতা; যা লুতুপুতু গল্প নয়।

গল্পের শুরুর দিকে মুনিয়ার এহেন আচরণ! একজন রাফির ঘোরে কিংবা একজন রাফির সৃষ্ট কবিতার ঘোরে থাকা এটা খুব অস্বাভাবিক মনে হতে গিয়েও হয় না, কেন না মুনিয়ার মত করেই হয়ত রাফিকে নিয়ে ভাবতে শিখে যায় তারই মেয়ে ঋদ্ধি। রাফি তো ঋদ্ধির বান্ধবীর ভাই এমনটা তার হতে পারে; কিছু অনুভূতি জাগ্রত হতেই পারে। কিন্তু মা হয়ে মুনিয়ার এমনটা হয় কেনো? কিভাবে? 
কিন্তু এমন গল্প এই শহরে, নগরে, গ্রাম কিংবা পল্লীতে হাজারো আছে। উহ্য বয়ে বেড়ায় বলে হয়তো বাতাসে মিলায়।

গল্পের ভেতর থেকে আরো বলা যায়, তাতে কি যারা এখনো সাদাত হোসাইনের ‘অর্ধবৃত্ত’ পড়েনি তাদের পড়বার ইচ্ছার যে কৌতূহল তা কি নষ্ট হবে? অর্থাৎ ব্যাপারটা স্পয়লার হচ্ছে কিনা তাই ভাবছি। আমার আবার এই জায়গায় বদনাম রয়েছে। আমি পাঠ-পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিশদতার ঘোরে নাকি সব বলে বসি। তাই তো থেমে ছিলাম; কিন্তু সাদাত হোসাইনের ‘অর্ধবৃত্ত’ শেষ করবার পর আর থেমে থাকা যায়! 

প্রসঙ্গকথায় আসা যাক
মুনিয়া- রাফি কিংবা ঋদ্ধির কথা না হয় সেটুকুতেই থামাই। কিন্তু সুমির কথা কি বলবো! কি বলবো আমি বেগমের ব্যাপারে কিংবা একজন আফজল হোসেব ও মছিদা বিবির পঞ্চাশ বছরের সংসারের ব্যাপারে, যেখানে বুঝবার দায় পরে যায় সম্পর্ক কি টিকে থাকে ভালোবাসায় নাকি মায়ায়? মায়া আর ভালোবাসা কি এক? হয়তো; হয়তো না।

একটু রাফি প্রসঙ্গে বলি।
লেখক তার উপন্যাসে রাফি চরিত্রকে খ্যাপাটে, বুনো, খামখেয়ালি এক বাউণ্ডুলে বলেছেন। আর আমি পাঠক হয়ে বলতে চাই, এমন রাফিকে হয়তো আমরা অনেকবার দেখি, অনেক জায়গায় দেখি। চিনতে পারি কিংবা পারি না। যদি চিনেও থাকি বুঝতে পারি না। বুঝে উঠলেও হয়তো না বুঝবার ভান করে থাকি।  কারণ এই মরণ কুণ্ডলীতে বাউণ্ডুলে নিয়ে ভাববার সময় যেনো কারোর নেই। কেবল লেখকরাই তাদের নিয়ে ভাবেন, তাদেরকে শব্দের জোরে, বাক্যের মাধুর্য দিয়ে  সাজিয়ে গল্পের মাঝে কালের দলিল করে আগামীর জন্যে রেখে দেন। এটা একজন লেখকই পারেন। 

লেখক সাদাত হোসাইন যেটা করতে চেয়েছেন, প্রতিটি চরিত্রকে স্বাধীন ভাবে একটা Maze game এর মধ্যে যেনো ছেড়ে দিয়েছেন। তারপর হাত গুটিয়ে তাদের পাগলপ্রায় আর রহস্যময়ী অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে নিজেই হাসছেন; কখনোবা আবার নিজেই রহস্যের ফাঁদেও পরে যাচ্ছেন। তবে তিনি জানতেন এই ঘুরপাক কিংবা ঘোরপ্যাঁচের সমাধানটা কোথায়। শুধুশুধুই মাথা গুলিয়ে দেয়ার জন্য সম্পর্কের  দু’টানা জুড়ে রহস্য এঁটে দিয়েছেন। 
 
দিনশেষে এটাই দাঁড়ায়। চোখ বুজে ভাবলাম, তারপর চমকে উঠলাম। আরে! আরে! এখানেই তো লেখকের সার্থকতা! লেখক তো পাঠককে এই ঘোরের মধ্যেই রাখতে চেয়েছেন! হ্যাঁ ঠিক তাই। এই যাবত লেখকের প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে আমার কাছে দারুণ মনে হয়েছিল ‘অন্দরমহল’ এবং ‘আরশিনগর’। কিন্তু এখন যুক্ত হলো ‘অর্ধবৃত্ত’।

অর্ধবৃত্ত নিয়ে ভালো লাগার একটি কারণ বলা উচিত। সেটি হল, লেখকের এই উপন্যাসে শুরু থেকেই একটা কাব্যিক ছন্দ আছে। উপন্যাসের প্রয়োজনে যুক্ত কবিতার কথা বলছি না। বলছি গল্পের শুরু থেকে শেষ দিকে আগানোর কথা। এক বাক্য থেকে অন্য বাক্যে লাফিয়ে লাফিয়ে না গিয়ে মন্থরে স্নিগ্ধ কদমে এগিয়ে যাওয়ার মোলায়েম ভালো লাগার কথাই বলছি। এটা সাধারণত একজন কবি ঔপন্যাসিক হয়ে উঠলেই হতে দেখা যায়। 

গল্প থেকে এইবার বেরিয়ে যাওয়া যাক। বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে বলা যাক, দুর্দান্ত।  চারু পিন্টুর গুরুত্বপূর্ণ আর দারুণ কাজের একটি হয়ে থাকলো অর্ধবৃত্ত উপন্যাসের প্রচ্ছদ। 

বইয়ের প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে কোনো রকম গাফেলতি চোখে ধরা পরেনি সাধারণত ওমন মোটা পরিধির বই পড়তে পাঠকের যে সমস্যাটা হয় সেটা কমই হয়েছে। প্রশংসা পাবার যোগ্যতা রাখে ‘অন্যধারা প্রকাশনা’।

আরও পড়ুন : ‘লণ্ঠনের গ্রাম’ হীরক জ্যোতির আলোক বিকিরণ

গ্রন্থ পরিচিতি

উপন্যাস : অর্ধবৃত্ত 
লেখক : সাদাত হোসাইন 
প্রকাশনা : অন্যধারা
প্রচ্ছদ : চারু পিন্টু

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড