• বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

পৃথুলার হাতে গড়া ‘১২ হাত গল্প’

  নিশীতা মিতু

২৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:৩৩
পৃথুলা ঘোষ
১২ হাত গল্পের কর্ণধার পৃথুলা ঘোষ

গানপ্রেমি তরুণী পৃথুলা ঘোষ। যার রক্তে মিশে আছে রবীন্দ্রসঙ্গীত আর ভাবনায় শাড়ি। একইসঙ্গে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা ও সংগীতশিল্পী তিনি। দেশীয় শাড়ির অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘১২ হাত গল্প’ এর কর্ণধার এই তরুণী। দৈনিক অধিকারের সঙ্গে আড্ডায় জানা হয় তার শৈশব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর নানা স্বপ্ন নিয়ে।

ঢাকাতেই জন্ম আর বেড়ে ওঠা পৃথুলার। একান্নবর্তী পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ায় মা-বাবা থেকে শুরু করে মাসি-পিসি, কাকা-মামাদের আদরের শীর্ষে ছিলেন তিনি। ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পৃথুলা বলেন, ছোটবেলা নিয়ে আসলে বলতে গেলে গুটিকয়েক কিছু স্মৃতিই আমার মনে পড়ে। বাবার সাথে স্কুলে যাওয়া, আমাদের পুরোনো বাড়িতে প্রতিদিন বোনেদের সাথে খেলাধুলা, হাসাহাসি। সবার আদরে বড় হয়েছি। আর ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ চটপটে আর চঞ্চল। সবথেকে বেশি মনে পড়ে আমার গান শেখার স্মৃতিগুলো। খুব মনে পড়ে সেই দিনগুলো।

বর্তমানে অনলাইন ব্যবসা করছেন পৃথুলা। সেসঙ্গে বাংলাদেশ বেতারে যুক্ত আছেন পেশাগত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী হিসেবে। একটি স্কুলে সংগীতের শিক্ষিকা হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন এই তরুণী। কয়েকজন শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা নিয়মিত বাড়িতে এসে তার কাছ থেকে সংগীতের তালিম নিচ্ছেন। মোটকথা গান আর শাড়ি এই দুই মিলে কাটছে পৃথুলার জীবন।

মা-বাবা দুজনই ব্যাংকার হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়ার ইচ্ছে ছিল পৃথুলার। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিপরীক্ষা দিতে গিয়ে বুঝলেন পরীক্ষায় বসে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো বেশ কঠিন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চাকরির জন্য প্রস্তুতিও নিতে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন প্রতিযোগিতা কঠিনতম হচ্ছে।

পৃথুলা বলেন, একসময় বুঝলাম এই সেক্টরে টিকে থাকার যুদ্ধ এবং জয়লাভ করাটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সকল চড়াই-উতরাই পার করে চাকরি পাওয়াটা মোটেই সহজ নয়। ঠিক তখনই মাথায় আসলো, কেন না আমি অন্যের অধীনে চাকরি না করে, নিজের উদ্যোগে কিছু করি! আমার নিজের বলে কিছু থাকবে, আমার কাজ দিয়ে মানুষ আমায় চিনবে। অনেক চিন্তাভাবনা আর উৎকণ্ঠার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। আশেপাশে মোটামুটি অনেক সোর্স জানা থাকায়, অবশেষে নিজের উদ্যোগে কাজ করা শুরু করলাম দেশি শাড়ি নিয়ে।

২০১৮ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করে ১২ হাত গল্প। দেশি হ্যান্ডলুম সুতি শাড়ি নিয়ে কাজ করেন পৃথুলা। কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, যেদিন থেকে কাজ শুরু করেছি, সেদিন থেকেই আমার মূল লক্ষ্য ছিল আমাদের দেশের তাঁতিদের কাজ সবার সামনে তুলে ধরা। আর ভেবেছিলাম যেন পুরো বিশ্বের প্রতিটি দেশে একটা করে হলেও ১২ হাত গল্পের শাড়ি পৌঁছুতে পারি। কারণ আজকালকার লোকজন কোনো একটা অনুষ্ঠান কিংবা উপলক্ষতে অন্য দেশিয় পোশাকে এত বেশি ঝুঁকে পড়ছে যে আমরা আমাদের তাঁতিদের বানানো পণ্যের সঠিক সমাদর করতে পারছি না। যেখানে পাশের দেশগুলোতে আমাদের দেশের পণ্যের এত চাহিদা এবং এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী খাত, সেখানে আমাদের শিল্পকে পুরো বিশ্বের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসেই আমার কাজের শুরু।

স্ক্রিনপ্রিন্ট, ব্লকপ্রিন্টের মাধ্যমে নকশা করা শাড়ি নিয়ে কাজের পাশাপাশি রাখার চেষ্টা করেছি ছেলেদের পাঞ্জাবি, বিভিন্ন গজকাপড়, ব্লাউজপিস, হাতে বানানো গয়না, শীতের সময়ে রাখার চেষ্টা করছি শাল, চাদর ইত্যাদি।

১২ হাত গল্পের কিছু শাড়ি

করোনা কেমন প্রভাব ফেলেছে ব্যবসায়- জানতে চাই পৃথুলার কাছে। তিনি বলেন, করোনা যখন প্রথম শুরু হলো, আশেপাশে অনেককেই দেখেছি বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ করে দিতে। আমিও ভাবতাম যে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে কিভাবে কাজ এগোবো! কিন্তু আমি মনোবল হারাইনি। শুধুমাত্র ১ মাস কাজ বন্ধ রেখে ঘরে থাকা স্টক দিয়েই আমার কাজ চালিয়ে গেছি। হয়তো ক্রেতারা কম কেনাকাটা করেছেন, তখন একটু আর্থিক সংকট হয়েছে, কিন্তু আমি মনোবল হারাইনি। বুকিং সিস্টেমের মাধ্যমে হলেও কাজ চালিয়ে রেখেছি। কারণ ঐ সময়টাতে অনেকেই অনলাইনে কেনাকাটার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে গেছিল। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলব, করোনার প্রথম দিকে লস হলেও পরবর্তীতে তা ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।

১২ হাত শাড়িকে একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মনে করেন পৃথুলা। সবচেয়ে বেশি অবদান ছোট ভাইয়ের। সে ই উৎসাহ দিয়ে পেইজ খুলে দিয়েছিল। পৃথুলা বলেন, আমার ভাই না থাকলে আজ আমার এই উদ্যোক্তা পরিচয়টাই থাকতো না হয়তো। অন্য দিকে আমার শাড়ির সকল ভেন্ডরের সঙ্গে একটা চুক্তিতে যাবার আগে যেসব বিচারবুদ্ধি কিংবা বিচারবোধ থাকা জরুরি, সেটা আমার বাবাই আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন। পাশাপাশি ঢাকার এবং দেশের বাইরের সকল পার্সেল বাবা নিজ হাতে পোস্ট করে আমাকে আমার কাজে অনেক বেশি সাহায্য করেন।

আর আমার মায়ের কথা না বললেই নাহ, আমার প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান মডেল আমার মা নিজেই। আর আমার বোন হচ্ছেন দ্বিতীয় প্রধান মডেল। সুতরাং পরিবারের সাপোর্ট নিয়ে নতুন করে আর কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না।

কাজ করতে গিয়ে কখনো কী মনে হয়েছে থেমে যাবেন? প্রশ্ন করি পৃথুলাকে। তিনি বলেন, সত্যি বলতে মাঝেমধ্যে মানসিক চাপ আর আশেপাশের বিভিন্ন ব্যাপারে ভাবনাচিন্তার পর কাজ বন্ধ করে দিতে ইচ্ছা হতো। কিন্তু এখন একেবারেই এসব মনে হয় না। এটা আমার পরিচয়। নিজেকে এত সহজে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। পাশাপাশি আমার এই উদ্যোগের সঙ্গে আরও অনেক মানুষের আয়ের উৎস জড়িত। অনেক তাঁতি আছেন যাদের ঘরের আয় আমাদের দ্বারা হচ্ছে। আর এই ভাবনাই আমাকে দিগুণ শক্তিতে কাজের অনুপ্রেরণা দিয়ে সামনে এগোনোর উপায় দেখায়।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে পৃথুলা বলেন, নতুনভাবে একটা কাজ শুরুর আগে অন্তত কয়েক মাস বিষয়টি সম্পর্কে জানবেন, বুঝবেন, ঘাটাঘাটি করবেন। মার্কেট বিশ্লেষণ করে, পণ্যের চাহিদা, মার্কেটে পণ্যের দাম, কিংবা সেটার ইতিহাস সম্পর্কে জেনে তবেই সামনে এগোবেন। প্রথমেই সফলতা খুঁজবেন নাহ। অনেকেই আছেন যারা কম দামে পণ্য সেল করে মার্কেটে যায়গা করে নিতে পারবেন ভেবে বসেন। ব্যাপারটা পুরোপুরি ভাবে ভুল। মার্কেটিং সম্পর্কে জানুন, বই পড়ুন। তারপর কাজে নামুন। অন্য কাউকে অনুসরণ করলেও, অনুকরণ করবেন নাহ। কাজের প্রতি ভালোবাসা আর সততা থাকতে হবে। নিজের মনোবলকে দৃঢ় রেখে কাজ করলে কাজ করতে আনন্দ এবং উৎসাহ পাবেন।

১২ হাত গল্পকে নিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্ন দেখেন পৃথুলা। একটি আউটলেট হবে, যেখানে শাড়ির পাশাপাশি এক পাশে থাকবে আড্ডা কিংবা গানবাজনা করার যায়গা- এমনটা চান তিনি। সবাই এসে নিজের মতো করে শাড়ি বাছাই করে নিতে পারবেন সেখান থেকে, সেসঙ্গে থাকবে চা কিংবা কফির আয়োজন। একান্ত নিজের একটা জায়গাও যান তিনি যেখানে একটি দেয়াল জুড়ে থাকবে রবীন্দ্রনাথের ছবি, কবিতা কিংবা গান। আর অন্য দেয়াল জুড়ে সকলের জন্যে বই।

পৃথুলা তার স্বপ্ন পূরণ করুক আপন শক্তিতে এই কামনায় আড্ডা শেষ করলাম।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: inbox.odhikar@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড