• মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

আপনার পাশে থাকা মানুষটিই ‘সিজোফ্রেনিয়ায়’ আক্রান্ত নন তো?


০৫ জুলাই ২০১৯, ১০:০৬
সিজোফ্রেনিয়া
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী মনে থাকে অহেতুক ভয়; (ছবি- ইন্টারনেট)

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাকিব। সেদিন রাতের ৩টার দিকে হুট করে পোশাক পাল্টে ঘরের বাইরে বের হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। বাবা এসে জানতে চাইলে জানাল তার বন্ধু সুমন কল দিয়েছিল। খুব বিপদে আছে। তাকে রাস্তার মোড়ে ডাকছে। 

ছেলের সঙ্গে রাশেদ খানও গেলেন। কিন্তু গিয়ে কাউকেই পেলেন না। মোবাইলের কল লগ চেক করেও সুমনের অস্তিত্ব পাওয়া গেল না। সুমনকে কল দিয়ে জানা গেল সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাহলে রাকিবের সাথে কথা বলল কে? 

আজকাল রাকিব এমন অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড করছে যা পরিবারের মানুষকে অবাক করে দিচ্ছে। সারাদিন নিজের ঘরে ঝিম মেরে বসে থাকা, একা একাই অদৃশ্য কিছুর সাথে কথা বলা, অহেতুক ভয় পাওয়া— এসব তার আচরণের অংশ। জ্বীনের আছর আছে বলে নানী ঝাড় ফুঁকও করিয়েছেন। কোনো লাভ হয়নি। শেষ অব্দি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, রাকিব সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। 

১৭ বছর বয়সী সনিয়ার মানসিক অবস্থা আরও করুণ। ঘরের খাবার দেখলেই ছুঁড়ে ফেলে দেয় সে। তার ধারণা, কেউ তার খাবারে বিষ মেশাচ্ছে। পরিবারের মানুষজন যেকোনো সময় তার ক্ষতি করবে এমনটা ভাবনা তার। রুমের লাইট অফ করে এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে সনিয়া। মাঝেমধ্যে একাই হেসে ওঠে আবার একাই চিৎকার করে কাঁদে। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর জানা গেল সনিয়া যেই মানসিক সমস্যাটিতে ভুগছে তা হলো সিজোফ্রেনিয়া। 

কী এই সিজোফ্রেনিয়া? এই রোগের লক্ষণই বা কী? আপনার ঘরের কেউ কিংবা পরিচিত কোনো বন্ধুর সঙ্গে কি উপরের উপসর্গগুলো মিলে যাচ্ছে? তবে চলুন জটিল এই মানসিক রোগ সম্পর্কে আরেকটু বিশদভাবে জেনে নিই- 

সিজোফ্রেনিয়া কী? 

একটি জটিল মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়া। এই রোগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশের মধ্যে সঙ্গতি না থাকা। Skhizein (to Split বা বিভক্ত করা) ও phrenos (mind বা মন) শব্দমূল থেকে সিজোফ্রেনিয়া শব্দটির উৎপত্তি ঘরে। এই রোগটিকে অনেকসময় মানসিক রোগের ক্যানসার হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। রোগির অদ্ভুত আচরণের কারণে তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলা কষ্টকর হয়ে পড়ে। 

শুরুর দিকের কথা- 

১৮৮৭ সালে জার্মান মনোবিদ এমিল ক্রেপলিন প্রথম এই রোগের সন্ধান পান। ধারণা করা হয়, এই রোগ মূলত মানুষের চেতনাকে আক্রান্ত করে। ১৯১১ সালে সিজোফ্রেনিয়া শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন ইউগেন ব্লুলেয়ার। চীনে এই রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ থেকে এক কোটি ২০ লাখ। ভারতে সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪০ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৮০ লাখ ৭০ হাজার। বাংলাদেশের প্রায় ১৬ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। 

কাদের সিজোফ্রেনিয়া হয়? 

যে কারোরই সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ যেকেউ এই মানসিক রোগটিতে আক্রান্ত হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে ১৫-২৫ বছর বয়সীদের সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

কেন হয় এই রোগ? 

সিজোফ্রেনিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন কারণে এটি হতে পারেন। ব্যক্তি ভেদে কারণ ভিন্ন হয়ে থাকে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে অনেকগুলো কারণ একসাথেও কাজ করতে পারে। মা কিংবা বাবার সিজোফ্রেনিয়া থাকলে সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ১৭ শতাংশ। আর যদি উভয়ের থাকে তবে তা সন্তানের হওয়ার সম্ভাবনা ৪৬ শতাংশ। 

মস্তিষ্কে নিউরোকেমিক্যাল উপাদান ভারসাম্যহীন হলে এবং এক ধরনের রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণে ত্রুটি দেখা দিলে এ রোগ হয়। বঞ্চিত পরিবারের শিশুদের সিজোফ্রেনিয়া বেশি হয়ে থাকে। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত অনেকেরই আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। 

যুক্তরাষ্ট্র্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের মতে, সিজোফ্রেনিয়া একক কোনো রোগ নয়। আটটি ভিন্ন সমস্যার সমন্বিত রূপ এটি। এই রোগ নির্ণয়ের আলাদা কোনো পরীক্ষা নেই। আক্রান্ত ব্যক্তি আচরণ ও অতীত কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা হয়। 

সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ কী? 

এই রোগের মূল লক্ষণ হলো- 

● ভ্রান্ত বিশ্বাস
● অন্যকে অহেতুক সন্দেহ করা
● অসংলগ্ন কথা বলা
● অবাস্তব চিন্তাভাবনা

এ রোগের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো- 

● আবেগহীনতা 
● পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা 
● চিন্তার অক্ষমতা 
● যেকোনো বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ 

সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মনে এমন ধরনের বিশ্বাসের জন্ম নেয় যার কোনো ভিত্তিই নেই। কেউ হয়ত মনে করে তিনি অলৌকিক ক্ষমতা অধিকারী। তিনি অনেকে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অকারণেই বিশ্বাস করে যে তার কাছের মানুষরা তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। তাকে পাগল প্রমাণের চেষ্টা করছে কিংবা খুন করতে চাইছে। কেউ কেউ নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর প্রচণ্ড সন্দেহ প্রকাশ করেন। 

অবাস্তব দৃশ্যগুলোকে রোগীর কাছে বাস্তব মনে হয়। কোনো বাস্তব স্পর্শ বা উপস্থিতি ছাড়াই তিনি অনুভব করেন কেউ তাকে স্পর্শ করছে কিংবা খোঁচা দিচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি কল্পনায় নিজের সামনে অন্যদের উপস্থিতি টের পান। 

এই রোগীদের আচরণ হয় অস্বাভাবিক।  কখনো একদম চুপচাপ থাকেন তারা আবার কখনো অস্থির হয়ে ওঠেন। পোশাক-আশাক আর নিজেরা অপরিষ্কার থাকেন। কোনো কাজেই এদের উৎসাহ থাকে না। সবার থেকে আলাদা হয়ে একা থাকতেই ভালোবাসেন সিজোফ্রেনিয়া রোগী। 

এ রোগের চিকিৎসা কী? 

সঠিক সময়ে চিকিৎসা হলে ২৫ ভাগ  সিজোফ্রেনিয়া রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। ৫০ শতাংশ রোগী ওষুধ সেবনের মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন করতে সক্ষম হন। আর বাকি ২৫ শতাংশ কখনোই সুস্থ হন না। তাই, যত দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে ততই মঙ্গল। 

সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকেই সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে জিন ভূতে ধরা মানুষ ভাবেন। কবিরাজ, ফকির, ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসা করাতে চান। এতে রোগীর মানসিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। অথচ ঠিকমতো ওষুধ সেবনের মাধ্যমে একজন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। 

কোথায় পাবেন চিকিৎসা?

রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ; আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগ ও পাবনা মানসিক হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসা মিলবে খুব সহজে। 

আপনার পাশে থাকা মানুষটি কি হঠাৎ করেই ঘরকুণো স্বভাবের হয়ে গেছে? ভয় আর সন্দেহ কি তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে? প্রতিনিয়ত অসংলগ্ন কথা বলে যাচ্ছে? আজই তবে মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ওডি/এনএম 

স্বাস্থ্য-ভোগান্তি, নতুন পরিচিত অসুস্থতার কথা জানাতে অথবা চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ পেতেই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ দেবার প্রচেষ্টা থাকবে আমাদের।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড