• রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫ আশ্বিন ১৪২৭  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আকবর আলীরা যেন না হারায়

  মোস্তফা মাহমুদ অপু

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:০২
বাংলাদেশ
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল (ছবি: সংগৃহীত)

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পথচলা ১৯৯৮ সালে। এরপর আরও ১১টি যুব বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে জুনিয়র টাইগাররা। চ্যাম্পিয়ন হতে ১২টি আসর খেলতে হলেও প্রতি আসরেই পারফর্ম করে নজর কেড়েছেন কোনো না কোনো বাংলাদেশি যুবা। তবে আফসোসের বিষয়, এদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজনই গড়তে পেরেছেন সফল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

যুব দল থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল হয়েছেন আশরাফুল-সাকিব-তামিম-মুশফিকরা। তবে সফলদের চেয়ে ব্যর্থদের সংখ্যাই বেশি। যুব বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলেও বিশ্বমঞ্চে নিজেকে মেলে ধরার আগেই হারিয়ে গেছে অনেকে সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার। কারও কারও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটলেও কেউ কেউ হারিয়ে গেছেন অভিষেকের আগেই।

সাব্বির খানের নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে যুব বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরে অংশ নেয় বাংলাদেশ। নামিবিয়াকে হারিয়ে জয় দিয়ে যুব বিশ্বকাপ শুরু করে জুনিয়র টাইগাররা। এরপর নিউজিল্যান্ডের কাছে হারলেও ইংল্যান্ডকে হারায় তারা। তবে ইংল্যান্ডের সমান পয়েন্ট নিয়েও রানরেটে পিছিয়ে থাকায় কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। তবে প্লেট পর্বের চ্যাম্পিয়ন হয়েই সেবার বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ করে সাব্বির খানের দল।

সে বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে নজর কেড়েছিলেন আল শাহরিয়ার ও মেহেরাব হোসেন অপি। ২৮৪ রান নিয়ে শাহরিয়ার সপ্তম ও ২৬০ রান নিয়ে মেহেরাব হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের অষ্টম সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। অন্যদিকে বল হাতে ১৩ উইকেট নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের তালিকায় পঞ্চম হয়েছিলেন অধিনায়ক সাব্বির খান। একই আসরে খেলা ক্রিস গেইল, মোহাম্মদ কাইফ, আব্দুল রাজ্জাক, হরভজন সিং, রামনারেশ সারওয়ান, কাইল মিলস, শোয়েব মালিক, মারলন স্যামুয়েলস, বীরেন্দর শেওয়াগ ও ইমরান তাহিররা গড়েছেন সফল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। আর শাহরিয়ার-মেহেরাবরা জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েও মেলে ধরতে পারেননি নিজেদের। শাহরিয়ার ১৫ টেস্ট ও ২৯টি ওয়ানডে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। মেহেরাব খেলেছিলেন ৯ টেস্ট ও ১৮টি ওয়ানডে। সাব্বির খান তো পাননি সুযোগও। একই দলের কেবল মাঞ্জারুল ইসলাম রানাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যজনক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তাকে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে হয়েছিল।

২০০০ সালে হান্নান সরকারের নেতৃত্বের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে অংশ নেয় বাংলাদেশ। হান্নান সরকার ছাড়াও সে দলে ছিলেন রাজিন সালেহ ও বিকাশ রঞ্জন দাসের মতো সম্ভাবনাময় তরুণরা। সেবার প্লেট পর্বের রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ দল পেরিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও আলো ছড়ান হান্নান সরকার-রাজিন সালেহ ও বিকাশ রঞ্জনরা। তবে জাতীয় দলে সুযোগ পেলেও লম্বা করতে পারেননি ক্যারিয়ার। বিকাশ রঞ্জন ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট একাদশে। সে ম্যাচে দুই ইনিংসে মাত্র ১ উইকেট শিকারের পাশাপাশি ব্যাট হাতে করেন মাত্র ২ রান। এরপর আর কখনো সুযোগ পাননি তিনি। হান্নান সরকার খেলছেন ১৭টি টেস্ট ও ২০টি ওয়ানডে এবং রাজিন সালেহ খেলেছেন ২৪ টেস্ট ও ৪৩ ওয়ানডে। এ দুইজনের কেউই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য পারফর্ম করতে পারেননি।

২০০২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলা মাশরাফি বিন মর্তুজা, মোহাম্মদ আশরাফুল, আফতাব আহমেদ, নাফিস ইকবাল, সৈয়দ রাসেল ও তালহা যুবায়ের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন। এ ছয়জনের মধ্যে মাশরাফি, মোহাম্মদ আশরাফুল ও আফতাব আহমেদ দেশের জার্সিতে খেলেছেনও দুর্দান্ত। তিনজনের মধ্যে মাশরাফি ও আশরাফুল দেশের অধিনায়কত্বও করেছেন দীর্ঘদিন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এ দুইজন তারকাখ্যাতিও পেয়েছেন। এখনো বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি। দেশের ইতিহাসের সেরা অধিনায়কও ভাবা হয় তাকে। ফিক্সিং কাণ্ডে নিষিদ্ধ হওয়া আশরাফুলকে ভাবা হয় ক্রিকেটে দেশের প্রথম বড় তারকা। ৬১ টেস্ট, ১৭৭ ওয়ানডে ও ২৩ টি-টুয়েন্টি খেলা আশরাফুল নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে আবারও জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে আফতাব আহমেদও বাংলাদেশের দলের নিয়মিত সদস্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে দীর্ঘদিন জাতীয় দলে খেলা আফতাব শেষদিকে নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন। আর তাই ক্যারিয়ারের শেষটাও করেছেন আফসোস নিয়েই। নাফিসের শেষটাও হয়েছে আফসোসে। দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবালের বড় ভাই নিজেকে প্রমাণ করলেও জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছেন কেবল ১১টি টেস্ট ও ১৬টি ওয়ানডে। আর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দুর্দান্ত খেলা তালহা যুবায়ের সন্তুষ্ট থেকেছেন ৬ টেস্ট ও ৭ ওয়ানডে খেলেই। সৈয়দ রাসেলও ক্যারিয়ার লম্বা করতে পারেননি।

২০০৪ সালের যুব বিশ্বকাপেও আফতাব আহমেদ ও নাফিস ইকবাল খেলেছেন। আফতাব ও নাফিস ছাড়াও এ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে থাকাদের মধ্যে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছেন আরও ৭ জন। এরা হলেন- নাঈম ইসলাম, নাজিমউদ্দিন, ধীমান ঘোষ, নাদিফ চৌধুরী, নাজমুল হোসেন, এনামুল হক জুনিয়র ও শাহাদাত হোসেন। এদের মধ্যে এনামুল হকের অভিষেক হয়েছে বিশ্বকাপের আগেই। নাঈম ইসলাম, এনামুল হক জুনিয়র ও শাহাদাত হোসেন কিছুটা আলো ছড়ালেও বাকিদের ক্যারিয়ার ব্যর্থই হয়েছে। আর এ তিনজনও প্রতিভার পুরোটা প্রমাণ করতে পারেননি।

২০০৬ সালে যুব বিশ্বকাপে খেলেছেন বাংলাদেশের বর্তমানের তিন তারকা সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম ও তামিম ইকবাল। এ তিনজন দেশের অন্যতম সফল তিন ক্রিকেটারও। তবে একই বিশ্বকাপে খেলা রকিবুল হাসান, মেহেরাব হোসেন জুনিয়র, ডলার মাহমুদ, শামসুর রহমান ও সোহরাওয়ার্দী শুভ জাতীয় দলে সুযোগ পেলেও হারিয়ে গেছেন দ্রুতই।

ডলার মাহমুদ ও সোহরাওয়ার্দী শুভ ২০০৮ সালের যুব বিশ্বকাপের দলেও ছিলেন। বাকিদের মধ্যে মোহাম্মদ মিঠুন, নাসির হোসেন, রনি তালুকদার, রুবেল হোসেন ও শুভাশিস রয় খেলেছেন জাতীয় দলে। এদের মধ্যে সবচেয়ে সফল হয়েছেন রুবেল হোসেন। আর নাসির হোসেন একসময়ে দলের নির্ভরযোগ্য পারফর্মার হলেও এখন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। মিঠুন খেলছেন বর্তমান দলেও, মাঝে মাঝে ব্যাট হাতে রান পেলেও এখনো ধারাবাহিক হয়ে উঠতে পারেননি এ ক্রিকেটার। পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারেননি নিজেকে।

২০১০ সালে যুব বিশ্বকাপে খেলাদের মধ্যে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন এনামুল হক বিজয়, মুমিনুল হক, সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান, কামরুল ইসলাম ও নুরুল হাসান সোহান। এদের মধ্যে এনামুল হক ও সাব্বির রহমান প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে জাতীয় দলে আসলেও ব্যর্থ হয়েছেন নিজেদের প্রমাণ করতে। তাই দীর্ঘদিন ধরেই আছেন দলের বাইরে। এছাড়া নুরুল হাসান সোহান ও কামরুল ইসলামও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তাই তারাও আছেন দলের বাইরে। মুমিনুল খেলছেন কেবল টেস্ট ফরম্যাটে। সৌম্য ব্যাট হাতে ঝড় তুলে ক্যারিয়ার শুরু করলেও ধীরে ধীরে হারিয়েছেন ধারাবাহিকতা। তবে এখন পর্যন্ত তার ওপর আস্থা রেখেছে নির্বাচক ও কোচ। দেখার বিষয় আবারও পুরনো রূপে তিনি ফিরতে পারেন কি না।

২০১২, ২০১৪, ২০১৬, ২০১৮ সালের যুব বিশ্বকাপে খেলা যুবাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত জাতীয় দলে খেলেছেন আবু হায়দার, আবু জায়েদ, আল আমিন, লিটন দাস, মোসাদ্দেক হোসেন, তাসকিন আহমেদ, মেহেদী হাসান মিরাজ, জুবায়ের হোসেন, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুস্তাফিজুর রহমান, সাদমান ইসলাম, জাকির হাসান, মেহেদী হাসান রানা, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, সাইফ হাসান, মোহাম্মদ নাঈম, আফিফ হোসেন ও নাঈম হাসান। এসব ক্রিকেটাররা এখনো তরুণ। তাদের ক্যারিয়ারও দীর্ঘদিনের নয়, তাই তাদের সফলতা ও ব্যর্থতার বিচার করার সময় এখনো হয়নি। যুব দল থেকে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়াদের মধ্যে কেবল মাশরাফি, আফতাব, আশরাফুল, তামিম, সাকিব ও মুশফিক পেয়েছেন তারকাখ্যাতি। অনেকেই হারিয়ে গেছেন, আবার অনেকেই পাননি পর্যাপ্ত সুযোগ। বাংলাদেশকে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ দেওয়া আকবর আলী-জয়- শরিফুলরাও যেন হারিয়ে না যায়। তারাও যেন হয়ে উঠতে পারেন সাকিব-তামিম। আর তাই বিসিবিও নিয়েছে নানা পদক্ষেপ। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছেন, ‌বিশ্বকাপজয়ী যুবাদের নিয়ে অনূর্ধ্ব ২১ দল গঠন করা হবে। আর প্রত্যেক ক্রিকেটার দুই বছর বিসিবির তত্ত্বাবধানে থাকবেন এবং এই সময় একেকজন প্রতিমাসে পাবেন এক লক্ষ টাকা করে।’ দেশের মানুষেরও প্রত্যাশা বিসিবির পরিচর্যায় আগামীর ভবিষ্যৎরা হারিয়ে না গিয়ে ছাড়িয়ে যাক সাকিব-তামিমদেরও।

ওডি/এমএমএ

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড