• সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

পা দিয়েই স্বপ্ন জয়ের চেষ্টা আয়েশার

  রফিকুল ইসলাম রফিক, গাইবান্ধা

০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৫০
গাইবান্ধা
অদম্য আয়েশা আক্তার (ছবি : দৈনিক অধিকার)

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান আয়েশা আক্তার (২৪)। এই গ্রামে ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করে আয়েশা। জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই তার। হাতদুটো বাহুর কাছেই শেষ। জন্মের পর থেকেই শত অপমান-অনাদর তাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে। 

স্কুলের সহপাঠী থেকে পাড়ার খেলার সাথী সকলের কাছে আয়েশা ছিল হাসির পাত্র। তবে এই হাসি-ঠাট্টা নিয়ে তার নেই কোনো অভিযোগ। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্রীও নন তিনি। তাই পা দিয়ে লিখেই চালিয়ে যাচ্ছেন লেখাপড়া। রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স প্রথম বর্ষে জেলার গাইবান্ধা সরকারি কলেজে পড়ালেখা করছেন তিনি। পা দিয়ে লিখে ক্লাসের পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চাকরি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন তিনি। অসাধারণ মানসিক শক্তি ও মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষাঙ্গন থেকে কর্মজীবনে। পা দিয়ে লিখলেও তার লেখা চোখ জুড়ানোর মতো। 

আয়েশার বাবা আব্দুল লতিফ একজন গরিব কৃষক। মা মাজেদা বেগম গৃহিণী। আয়েশারা চার বোন, ভাই নেই। বোনদের মধ্যে আয়েশা মেজো। বড় ও ছোট বোনদের বিয়ে হয়েছে। তারা সবাই স্বামীর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মা বাবাকে নিয়ে তার পরিবার। হাজারো স্বপ্ন তার মনে।

মা মাজেদা বেগম বলেন, আয়েশা জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী। ওর জন্মের পর থেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ি। মেয়ে হয়ে জন্মেছে তার ওপর দুটি হাত নেই। শিশুকালে হাঁটতে কিছুটা সমস্যা হলেও সাড়ে চার বছর বয়সের পর থেকে সে ঠিকমতো হাঁটতে শেখে। বড় দুই মেয়ে বাড়িতে লেখাপড়া করার সময় আয়েশা আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছে বসে থাকত। বাড়ির পাশ দিয়ে পাড়ার ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেত। তা দেখে সেও যেতে চাইত। তার আগ্রহ দেখে তাকে সঙ্গে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে বোনরা। পরে আয়েশাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করাই। এভাবেই আয়েশার পড়ালেখা শুরু। 

আয়েশার বড় বোন নুরজাহান বলেন, ‘আয়েশা ২০১২ সালে কচুয়া হাট এইচ আর এম বালিকা বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৩ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ২০১৪ সালে সাঘাটা উদয়ন মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৩ পেয়ে এইচএসসি পাশ করে। আয়েশা এই কলেজ থেকে ২০১৭ সালে সিজিপিএ-৩ দশমিক ৯৯ পেয়ে বিএ পাশ করে। বর্তমানে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ২০১৮ মাস্টার্সে ভর্তি হয়। ৬ মাস মেয়াদি কম্পিউটার শিখেছেন তথ্য কল্যাণীর কাছে। তার কয়েক প্রকারের সেলাই ও কম্পিউটারের এম এস ওয়ার্ড মোটামুটি দক্ষতাও রয়েছে। তবে সে মাস্টার্সে ভর্তি হলেও বই কিনতে পারি না অর্থের অভাবে। তিনি আরও বলেন, আয়েশার একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড হয়েছে। সে তিন মাস পর মাস দুই হাজার ১শ টাকা পান। এ দিয়ে পড়ালেখার খরচ জোগান সম্ভব হচ্ছে না।

আয়েশার সঙ্গে কথা হয়। সে বলে, পা দিয়ে সে শুধু লেখাই নয়, সব ধরনের কাজ করতে পারে। ঘর গোছানো, পরিষ্কার করা, রান্না করা, ল্যাপটপ চালানো, মোবাইলে কথা বলা, দরজায় লাগানো তালা চাবি দিয়ে খোলা, কাপড় ভাজ করাসহ দৈনন্দিন সব কাজ করতে পারে। আয়েশার ইচ্ছা, লেখাপড়া শিখে সে সরকারি চাকরি করবে ও পরিবারের উন্নতি করবে। সে আরও বলে, আমি প্রতিবন্ধী বলে কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। বিগত ২০১২ সালে সিঙ্গার-চ্যানেল আই সাহসিকতা পুরস্কার পেয়েছেন আয়েশা। 

সাঘাটা উদয়ন মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আয়েশার লেখাপড়ার ইচ্ছা প্রবল। সে সব কিছু করতে পারে। সাধারণ মেয়ের মতোই চলাচল করতে পারে। কলেজে পড়াকালীন সে ক্লাস ফাঁকি দেয়নি। লেখাপড়ায় সে অনেক ভালো। কলেজে তার একটা চাকরি ব্যবস্থার করার চেষ্টা চলছে। 

এ দিকে, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ পরিচালক এমদাদুল হক প্রামাণিক দৈনিক অধিকারকে বলেন বিষয়টা জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে সমাজসেবা থেকে নিবন্ধনকৃত এনজিও গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পড়ালেখা ও শিক্ষা বৃত্তিসহ আয়েশার কর্মের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন তিনি। 

ওডি/এএসএল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড