• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সফলতার ৩৭ বছরে ছাগলনাইয়া গণপাঠাগার

  বকুল আকতার দরিয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:০২
ফেনী
ছাগলনাইয়া গণপাঠাগার

ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার অগণিত পাঠকপ্রিয় মানুষের ভাবৈশ্বর্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার ছাগলনাইয়া গণপাঠাগার। নানা প্রতিকূলতা ও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এটি এখন সমৃদ্ধির ৩৭ বছরে পা দিয়েছে। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় এখন ‘ছাগলনাইয়া গণপাঠাগার’ এর নাম সুপরিচিত। এর সাধারণ সম্পাদকও কুড়িয়ে নিয়েছেন কয়েকটি অমূল্য সম্মাননা।

১৯৮২ সালের কথা। মাস্টার আবুল কালামসহ আরো কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের প্রাণান্ত চেষ্টায় গড়ে উঠেছে এ পাঠাগারটি। ছাগলনাইয়া পাইলট হাই স্কুলের মাঠে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার প্রথম সভা বসে। সভার আয়োজন করেন মাস্টার আবুল কালাম আজাদ। ঐ দিনই ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পাঠাগারের স্বপ্নযাত্রা।

ছাগলনাইয়া জমদ্দার বাজারের একটি ধানের দোকানে উপরের তলায় ঘর ভাড়া নিয়ে পশ্চিম ছাগলনাইয়া গ্রামের সেলিম স্যারের দেয়া প্রায় দেড়শটি বই অনুদান নিয়ে শুরু হয় পাঠাগারের কার্যক্রম। এর অগ্রযাত্রার পথে শুরু হয় নানা প্রতিকূলতা। বেশ কয়েকবার স্থানও পরিবর্তন করতে হয়। 

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের মতো আন্তরিকভাবে এ পাঠাগারটিকে আগলে রেখেছেন মাষ্টার আবুল কালাম আজাদ। তিনি ছাড়াও এ পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রেখেছেন আরো কয়েকজন শিক্ষাবিদ। এদের মধ্যে মরহুম আলহাজ্জ জিয়া হায়দার স্বপন, মরহুম মোহাম্মদ হোসেন খাঁন, মাহবুবুল হক ভুঁইয়ার নাম উল্লেখযোগ্য।

১৯৮৭ সালের দিকে পাঠাগারটি স্থানান্তরিত হয় কলেজ রোডের একটা ভাড়া ঘরে। এর পরই ১৯৯১ সালে সর্বপ্রথম সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান হিসেবে ৬ হাজার টাকা পায় পাঠাগারটি। অদ্যাবধি এই অনুদান অব্যাহত রয়েছে। সেই থেকে পাঠাগারটি সফলতার সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখে। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। 

মাষ্টার আবুল কালাম আজাদের মতো নির্লোভ, ত্যাগী এ মানুষটি নিজের অর্থ, শ্রম ও সময় উজাড় করে দিয়েছেন এই পাঠাগারের জন্য। এলাকার হৃদয়বান ব্যক্তিরাও পাঠাগারকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে বলতে হয় ড. কর্ণেল (অব:) মঞ্জুর মোর্শেদ মানিক, কপিল উদ্দীন আহম্মেদ, শিল্পপতি নুরুন নেওয়াজ সেলিম, স্বর্গীয় লে.(অব.) নেপাল চন্দ্র নাথ, আব্দুল মান্নান মজুমদার, এম.এম. ফজলুল হক আরিফ, ডা: আছান উল্ল্যাহ ফারুক, মজিবুল হকের নাম।

এর পর একটি নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন পাঠাগার সংশ্লিষ্ট সকলেই। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার ফলশ্রুতিতে এই স্বপ্ন ২০১২ সালে বাস্তবায়ন হয়। নিজস্ব জমিতে ছাগলনাইয়া ক্লাবের পোষ্ট অফিসের পাশে টিনশেডের একটি ক্লাব ঘর ছিল। ক্লাব সভাপতি আব্দুল হাই বি.এ. এবং সম্পাদক জসিম উদ্দিন মুন্সির আন্তরিকতায় ঐ জায়গায় গণপাঠাগার কর্তৃপক্ষের সাথে যৌথ উদ্যোগে একটি ভবন নির্মাণের রেজিস্ট্রি চুক্তি হয়।

চুক্তির শর্ত থাকে পাঠাগারের ৭০% এবং ছাগলনাইয়া ক্লাবের ৩০% মালিকানা থাকবে। অবশেষে আরো অনেকের আর্থিক ও বুদ্ধিভিত্তিক সহযোগিতায় ঐ ক্লাবের জায়গায় নির্মিত হয় ‘ছাগলনাইয়া গণপাঠাগার’ এর নতুন ভবন।

গণপাঠাগারের সুনাম এখন লোকের মুখে মুখে। এখানে বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়। বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। এই পাঠাগারটিকে বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা চলে। এটি এখন নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে। বইগুলো ডিজিটাল ক্যাটালগিংয়ের আওতায় এসেছে। এর নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে এবং এটি নিত্যনৈমিত্তিক কার্যক্রম ছাড়াও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। 

প্রতিদিন সকাল বিকাল দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা পড়ার সুযোগ পায় পাঠকরা। একই সাথে বই সংগ্রহ করে পড়তে পারে এবং ফেরত দিতে পারে।  বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সহযোগিতাও এ পাঠাগারটিকে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। আলোকিত মানুষ গড়ার শিল্পী আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের পদধূলিতে এই পাঠাগার এখন লোকমুখে প্রশংসিত ও সমাদৃত। এখন নামী-দামী ব্যক্তিরা এই পাঠাগারের খোঁজ খবর রাখেন। 

তবে পাঠাগারটির সফলতার মূলে মাষ্টার আবুল কালাম আজাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি যক্ষের ধনের মতো সকাল সন্ধ্যা পাঠাগারকে শ্রমে-সময়ে আর ত্যাগে বুকে আগলে আছেন। শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণের পর সংসার থেকেও তিনি এই পাঠাগারটিকে বেশি সময় দিচ্ছেন। ঝাড়ু হাতে নিজেই পরিচ্ছন্নতার কাজটিও করেন তিনি। যেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো নিজেকে বিলিয়ে দেয়াতেই তার সুখ। 

এলাকার একজন শিক্ষানুরাগী, বইপ্রেমি ও দাঁগনভূইয়া উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সাইফ উদ্দীন আহম্মেদ এই পাঠাগারের সমৃদ্ধির কথা বলতে গিয়ে বলেন- ভবিষ্যতে পাঠাগারের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে তাকে নিজস্ব আয়ের উপর দাঁড়াতে হবে, যা এই মূহুর্তে গণপাঠাগারের নেই। এইজন্য তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সাংবাদিক আব্দুল আউয়াল চৌধুরী বলেন, সরকারিভাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণগ্রন্থাগার থেকে যে অনুদান পাওয়া যায় তা খুবই নগণ্য। এজন্য তিনি এলাকার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষানুরাগী, দানশীল ও হৃদয়বান ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতা কামনা করেন।

পাঠাগারের আজীবন সদস্য কর্ণেল (অব:) মঞ্জুর মোর্শেদ মানিক বলেন, পাঠাগারের দ্বিতল ভবনের জন্য সরকারি-বেসরকারি অনুদান খুবই প্রয়োজন। এজন্য তিনি দেশের বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তি এবং সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আহবান জানান যেন, পাঠাগারের দ্বিতল ভবন সম্পন্ন করার জন্য সহযোগিতা করা হয়। 

পাঠাগারের দপ্তর সম্পাদক, ব্যাংকার ও কবি-কবিতা বিষয়ক সংগঠন কাব্যাঙ্গনের সহ-সভাপতি রেজাউল করিম পাটোয়ারী, আর.কে. শামীম পাটোয়ারী প্রতিবেদককে বলেন, সরকারিভাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণগ্রন্থাগার থেকে যে অনুদার পাওয়া যায় তা খুবই নগণ্য। তা দিয়ে পাঠাগারের কার্যনির্বাহ হয়না। এমতাবস্থায় পাঠাগারের যদি দ্বিতীয় তলা সম্পন্ন হয় তাহলে তার ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে পাঠাগার একজন লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ করে পাঠাগার সচল রাখতে পারে।

গণ পাঠাগারের সমৃদ্ধিতে বিভোর ও ত্যাগী মানুষ, পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক, মাষ্টার আবুল কালাম আজাদ, যিনি দীর্ঘ ৩৭ বছর যাবত এই পাঠাগারটিকে সন্তানের মতো লালন করে আসছেন, তিনি প্রতিবেদককে বলেন, এই পাঠাগার আমার সন্তানের মতো, সামান্য জায়গায় কোন সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা কষ্টকর হয়, সরকারি বেসরকারি অনুদান পেলে এর দ্বিতীয় তলার কাজ করা যাবে । তাই তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ দেশের হৃদয়বান দানশীল ব্যক্তিবর্গের আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেন।

ওডি/আরবি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড