• শুক্রবার, ২১ জুন ২০১৯, ৭ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

ঈদ আনন্দের ছোঁয়া লাগেনি বেদে সম্প্রদায়ে

  নজরুল ইসলাম শুভ, সোনারগাঁও প্রতিনিধি

০৪ জুন ২০১৯, ১০:৪৩
বেদে সম্প্রদায়
বেদে সম্প্রদায়ে কারো মাঝেই নেই ঈদের আনন্দ (ছবি: দৈনিক অধিকার)

দুখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার সুখ কী ? ঝড়, তুফান, শীত, গরম উপক্ষো করে সারা বছর স্রোতে ভেসে বেড়ানো জীবন নদীতে ঢেউ খেলানো বেদেদের সমাজ সংসার। নিয়তির ওপর ভর করে কোন মতে বেঁচে থাকাটাই আনন্দ তাদের কাছে। বেদেরা সব মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক হলেও বছরের বড় দুটি উৎসব ঈদে আনন্দ নেই বেদে পল্লীর কারো মনে। জীবন জীবিকায়, ঘর সংসারে ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার ব্রহ্মপুত্র ও মারীখালি নদী তীরবর্তী লাঙ্গলবন্দ ও পিরোজপুর এলাকায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন ঈদ বঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়ের প্রায় ৪ শতাধিক মানুষ। 

পিরোজপুর এলাকায় বসবাসরত বেদে বহরের সর্দার আরসাদ জানান, প্রায় ২২ বছর ধরে সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে আসছেন তারা। বেদে বহরে ৪০টি পরিবারে প্রায় ৪ শতাধিক মানুষ রয়েছে। বর্তমান সময়ে দুনিয়া জুড়ে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের জীবন মানের অনেক উন্নতি হলেও বেদে সম্প্রদায়ের লোকের ওপর তা কোনো প্রভাব ফেলেনি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বঞ্চনা আর অবহেলাই বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের নিত্য সঙ্গী। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় ঝাঁড়-ফুঁক, তাবিজ, কবজে এখন আর তেমন বিশ্বাসী নয় মানুষ। সে জন্য আগের তুলনায় বেদেদের জীবন জীবিকা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত নাগরিক জীবনে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, স্বাস্থ্য সেবা, ভোটাধিকার, বিশুদ্ধ খাবার পানি, বিদ্যুৎ সুবিধার অভাব, আয় রোজগার কমে যাওয়া সব মিলিয়ে আমাদের জীবন ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

তাছাড়া ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণের জন্য কোনো স্কুলে ভর্তি করতে চাইলে কেউ লেখাপড়া করার সুযোগ করে দেয় না। এখন পর্যন্ত আমাদের বেদে বহরের ছেলে মেয়েদের কেউ অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হয়নি। তাছাড়া কেউ মারা গেলে তাকে কবর দেওয়ার জন্য সাড়ে তিন হাত মাটিরও কোন স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। বেদে বহরে বসবাসরত পরিবারের সদস্যদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। বেদে পরিবারের কয়েকজন সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত ছিল না। সভ্যতার বিকাশে দেশের পাহাড়ি উপজাতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর শান্তির সুবাতাস লাগলেও বেদে পরিবারের সদস্যদের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ভাসমান (নৌকায় বসবাসরত) বেদে বহরের মানুষগুলো মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, মারিখালি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন। কেউ কেউ নদীর জোয়ারের পানি থেকে, ঝড়-তুফান বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে নদী তীরের পরিত্যক্ত জায়গায় পলিথিন কাগজে তৈরি খুপরি ঘরে অথবা খোলা আকাশের নিচে কোনো রকম এক একটি পরিবারের ৬/৭ জন সদস্য নিয়ে থাকেন।

বেদে বহরের সর্দার আরসাদ আরো জানান, সারা বছর কষ্ট করে কোনো রকম বসবাস করলেও বর্ষার সময়ে তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। আগে সংসার পরিচালনায় পরিবারের শুধু নারী সদস্যরা অর্থ উপার্জনের জন্য ঝাঁড়, ফুক, সিংগা লাগানো ও তাবিজ বিক্রিসহ বিভিন্ন রকম কাজ করতো। বাজার মূল্য উর্ধ্বগতি হওয়ায় এখন নারী-পুরুষ সবার কাজ করতে হয় সংসার চালানোর জন্য। আবার কোনো কোনো নারী ঢেউ খেলানো নদীতে মাছ ধরার মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করছে নিজ সন্তানকে সাথে নিয়ে।

পুরুষ লোক কেউ সাপের ঝুড়ি অথবা বানর নিয়ে, কেউবা আবার সাপ ও বেজি নিয়ে বের হয় দূরের গ্রামগুলোতে খেলা দেখায় জীবিকার সন্ধানে। খেলা দেখিয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়ে কিছু পয়সা রোজগার করে সন্ধ্যায় তারা নৌকায় ফিরে আসে। পুরুষদের মধ্যে কেউ পাখি শিকার করে অথবা সাপ ধরে বিক্রি করে।

সরেজমিনে বেদে বহর ঘুরে দেখা গেছে, আধুনিক সমাজ ও জীবন যাত্রায় ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা এখানে নেই বললেই চলে। বেদে বহরটি একেবারে ঘোর অন্ধকারে রয়েছে বলে মনে করেন বেদে বাসিন্দারা। শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই, নিজ সন্তানদের ভবিষৎ চিন্তা করে আয় রোজগারের দুই পয়সাও সঞ্চয় করার সুযোগ নেই, ভাসমান জীবনে নদী তীরের সংসারে নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অধিকাংশ সময়ই শিশুরা খোলা জায়গায় খাবার খেয়ে নানান রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকেন। তবে বেদেরা কষ্টে দিনযাপন করলেও নিজেদের মধ্যে তাদের ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেন মহা-ধুমধামের সাথে। বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেলে বেদে বহরে আনন্দের সীমা থাকে না। এই বেদে বহরে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের কোনো বালাই নেই।

তাছাড়া নিজেদের মধ্যে কারো কোনো সমস্যা হলে বেদে সর্দার তার সমাধান করে দেন। বেদেদের জীবন যাত্রা এখন আর আগের মত নয়।  দৈনন্দিন কাজেও অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। আগে সাপের খেলা দেখিয়ে এবং তাবিজ কবজ বিক্রি করে যে টাকা আয় হত এখন আর ততটা আয় রোজগার হয় না। তাই বাধ্য হয়েই বেদেরা তাদের পেশা পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় দেশের মানুষের জীবন মানের উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত বেদে সম্প্রদায়ের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি।

ওডি/এএন 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড