• বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

সামনে ঈদ, দম ফেলার সময় নেই তাঁত শ্রমিকদের

  সোহেল রানা, সিরাজগঞ্জ ১৬ মে ২০১৯, ১৫:৩৭

তাঁতপল্লী
তাঁতপল্লীতে গামছা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক (ছবি : দৈনিক অধিকার)

রমজানের শুরুতেই ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লীগুলো। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শ্রমিকরা পাওয়ারলুম-হস্তচালিত তাঁতে নিখুঁতভাবে তৈরি করছেন জামদানি, সুতি কাতান, সুতি জামদানি, সিল্ক শাড়ি, বেনারসি শাড়ি, শেড শাড়ি, থ্রি-পিচ এবং হরেক রকমের লুঙ্গি ও গামছা।

আবার কাপড়ের উপর প্রিন্ট এবং রঙ তুলির আঁচড়ে এবং হাতে করছে নান্দনিক ও মনোমুগ্ধকর নকশা। সিরাজগঞ্জের তৈরি শাড়ি-লুঙ্গি-গামছা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে প্রতিনিয়তই রং-সুতাসহ উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেলেও খুব একটা বাড়ছে না কাপড়ের দাম। দাম প্রায় একই থাকায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন তাঁতিরা।

(ছবি : দৈনিক অধিকার)

নাটাইয়ে সুতা কাটছেন শ্রমিক (ছবি : দৈনিক অধিকার)

সরকার কর্তৃক সম্পাদিত তাঁত শুমারি ২০০৩ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে পাঁচ লক্ষাধিক হস্তচালিত তাঁত রয়েছে। তন্মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলাতে রয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজারের অধিক। সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম তাঁত অধ্যুষিত এলাকা। তাঁত বস্ত্র উৎপাদনের জন্য এ জেলা বেশ সুপরিচিত। সিরাজগঞ্জ জেলার সঙ্গে তাঁতের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সিরাজগঞ্জ জেলায় তাঁতি পরিবারের সংখ্যা মোট ১৪ হাজার ৮৭০টি এবং তাঁত সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজারের অধিক। প্রতিবছর এ জেলায় হস্তচালিত তাঁত থেকে প্রায় ২৩ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদিত হয়ে থাকে। এছাড়া এ শিল্প সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

(ছবি : দৈনিক অধিকার)

শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক (ছবি : দৈনিক অধিকার)

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী, এনায়েতপুর শাহজাদপুর, কাজিপুর, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও সলঙ্গার তাঁত কারখানাগুলো খটখট শব্দে মুখরিত। ঈদকে ঘিরে বাড়তি আয়ের আশায় তাঁত কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। তাঁত পল্লীগুলোতে নারী-পুরুষদের কেউবা নাটাই ঘুড়িয়ে সুতা কাটছে, কেউবা নলিতে সুতা কাটছে, আবার কেউবা কাপড় ছেঁটে কাপড় গুছিয়ে রাখছে। সব মিলিয়ে শ্রমিকদের যেন দম ফেলানোর ফুরসত নেই।

বিশেষ করে এ অঞ্চলের তাঁত কারখানা ঘিরে দেশের বিভিন্ন নামি দামি ব্র্যান্ডের শো-রুমে এ কারখানার কাপড় যাচ্ছে। স্ট্যান্ডার্ড, আমানত শাহ, ফজর আলী, বৈঠক, বোখারী, মেমোরি, বাবা, পাকিজা, ফাইভ স্টার, অনুসন্ধান, বসুন্ধরা, আড়ংসহ দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো এখানে শো-রুম খুলেছে। এ সব কোম্পানিগুলো অফ সিজনে তাদের দেওয়া ডিজাইনে তাঁতিদের কাছ থেকে হাজার হাজার পিস শাড়ি-লুঙ্গি-গামছা কম মূল্যে কিনে মজুদ করে রাখেন। পরে সিজনের সময় নিজেদের লেভেল লাগিয়ে দ্বিগুণ দামে দেশের বিভিন্ন স্থান এমনকি সৌদি আরব, দুবাই, ভারতসহ বিভিন্ন এলাকায় রপ্তানি করছেন।

(ছবি : দৈনিক অধিকার)

নিখুঁতভাবে তৈরি করা হচ্ছে জামদানি শাড়ি (ছবি : দৈনিক অধিকার)

এছাড়াও তাঁতিরা তাদের উৎপাদিত তাঁত পণ্য এনায়েতপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ নিউমার্কেট এবং টাঙ্গাইলের করটিয়ায় কাপড়ের হাটেও বিক্রি করছেন। এসব হাট থেকে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকার কাপড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে তাঁতিদের অভিযোগ প্রতিনিয়তই রং-সুতাসহ তাঁতের উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে তুলনায় কাপড়ের দাম বৃদ্ধি না পাওয়া তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

অপরদিকে সময়মতো শ্রমিকদের মজুরি ও রং-সুতার দাম, ব্যাংক লোন পরিশোধের জন্য অল্প দামেই তাদের কাপড় বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তাঁত শিল্পকে রক্ষা করতে রং-সুতার দাম নির্ধারণসহ স্বল্প সুদে ঋণের দাবি জানিয়েছেন তাঁতিরা।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাইতরা এলাকার তাঁত শ্রমিক হোসেন আলী, ইউনুস আলী, রেজাউল করিম, মরিয়ম খাতুন জানান, আমাদের তাঁত শ্রমিকদের কোন বোনাস নেই। কাজ করলে মালিকরা টাকা দেয় না করলে কোন টাকা পাই না। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে ঈদ কাটানোর জন্য একটু বেশি কাজ করছি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। তাছাড়া রমজান মাসে খরচ একটু বেশি হয় তাই পরিশ্রম বেশি করতে হচ্ছে।

তাঁত মালিক আব্দুল লতিফ, সেরাজুল ইসলাম, সবুর হোসেন ও আব্দুল কাদের জানান, বাঙালী নারীদের চাহিদা মোতাবেক বিভিন্ন নান্দনিক ডিজাইনের রুচিসম্মত শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। উৎপাদিত শাড়ি ৩০০ থেকে ১০ হাজার টাকায় পাইকারি বিক্রি হলেও রং-সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের সমন্বয় না হওয়ায় তাঁতিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়াও নারীরা লেহেঙ্গা, স্কার্ট, গেঞ্জি, প্যান্ট ও থ্রি-পিচের প্রতি বেশি ঝুঁকে যাওয়ায় এবং অবৈধ পথে ভারত থেকে কমদামী শাড়ি আসার কারণে বাজারে তাঁতের শাড়ির চাহিদা দিনদিন কমে যাচ্ছে।