• শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

১ মণ ধান ৪শ টাকা

ধানের বাম্পার ফলনেও ভালো নেই কৃষক

  শাকিল মুরাদ, শেরপুর

১৫ মে ২০১৯, ২০:১৬
ধান ক্ষেত
সোনালী ধানে ভরে গেছে ধান ক্ষেত তবে কৃষকের মুখে নেই তৃপ্তির হাসি (ছবি- দৈনিক অধিকার)

শেরপুরে বোরো মৌসুমে এবারও হয়েছে বাম্পার ফলন। সোনালী ধানে ভরে গেছে ধান ক্ষেত। তবে কৃষকের মুখে নেই তৃপ্তির হাসি। ধান কাটাতে শ্রমিককে দিতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ভালো নেই ধানের বাজারও, কাঙ্খিত দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। উৎপাদন মূল্যের সাথে বিক্রয় মূল্যের অনেক পার্থক্য। যার কারণে কৃষকের মুখে চিন্তার ছাপ। যদিও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দাবি, সরকারিভাবে চাল সংগ্রহ শুরু হলে, বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধি পাবে। এতে লাভের মুখ দেখবে কৃষক। বোরোর বাম্পার ফলনের কারণে দামের পরিবর্তন হয়েছে। বোরোর পরিবর্তে আউশ ও ভুট্টা আবাদ লাভজনক হওয়ায়, বোরোর বিকল্প হিসেবে ভুট্টা ও আউশ আবাদের পরামর্শ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের।

সবুজ শ্যামল ফসলের মাঠ দেখে জুড়িয়ে যায় চোখ। তাই রমজানের মধ্যে কড়া রোদ মাথায় নিয়ে এই ধান ঘরে তুলতে গিয়ে বেকায়দায় রয়েছে কৃষকরা। বাজারে প্রতি মণ ধান ৪শ থেকে ৫শ টাকা। আর দুইমণ ধানের সমান টাকা দিয়ে নিতে হচ্ছে একজন শ্রমিক। 

সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শেরপুরের প্রান্তিক কৃষকরা কেউ ধান কেটে ঘরে আনছেন, কেউবা ধান শুকাচ্ছেন। অনেক স্থানে আবার ধান কাটার আধুনিক যন্ত্র ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। হাজার হাজার কিষাণ কিষাণী মাঠে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। প্রকৃতিনির্ভর এ বোরো ফসলকে ঘিরে পাহাড়ি এ জনপদে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে এখন। 

বোরো ধানের বাম্পার ফলন (ছবি- দৈনিক অধিকার)

সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও জেলা জুড়ে লক্ষমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জিত হয়েছে বোরো আবাদ। তাই জেলার প্রান্তিক কৃষকও নিশ্চিন্তে ধান ঘরে তুলতে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। স্বপ্নের কাঁচা ধান সময়মতো পাকতে শুরু করেছে। অনেকেই ধান গোলায় তোলেছেন। তবে চলতি বছর বোরো ধান ঘরে উঠলেও এখনো সরাসরি সরকারি গুদামে ধান দিতে না পারায় লাভের মুখ দেখছেন না তারা। 

সরকারি হিসেবে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪০ টাকা হলেও কৃষকদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৪শ থেকে ৫শ টাকায়। এতে করে আবাদের আসল টাকাই ঠিকমতো উঠছে না কৃষকদের। তাই আবাদ ভালো হলেও ধানের ন্যায্য দাম থেকে কৃষকরা এখনো বঞ্চিত।   

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন প্রতিদিনই বোরো ফসল কাটা হচ্ছে। প্রতিদিন বেড়েই চলছে তার পরিমাণ। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। এসব যন্ত্র দিয়ে দ্রুত রোপণ ও কাঁটামাড়াই করেছেন কৃষকরা। সব কিছুর পরেও নেই কেন জানি উৎসবের ছোঁয়া। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় আসল টাকা উঠাতে না পেরে হতাশ কৃষকরা। 

সদর উপজেলার পূর্ব ঝিনিয়া এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে জমি বর্গা লইয়া ধান চাষ করছি। ওই সময় ধানের সার দেওয়া পরিচর্চা করা থকি শুরু করি ধান কাটার সময়ও শ্রমিকরে টাকা দেওয়া লাগছে। কিন্তু বর্তমান বাজারে ধান বিক্রি করতে হইলে ৫শ টাকা মণ। এতে করে আমরার আসল টাকাই উঠে না। আগামী দিনে ধানের আবাদই করুম না’।

আরেক কৃষক তপা খন্দকার বলেন, ‘বাপু মইরা গেছি গ্যা। ধার হাওলাত কইরা ধান করছিলাম। এহন তো বাপু আসল টাকায় তুলবার পাইনা। সরকার কৃষকরে মাইরালছে’।

স্বপ্নের ধান শুকানো হচ্ছে (ছবি- দৈনিক অধিকার)

ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া এলাকার কৃষাণী জয়বানু বেগম বলেন, ‘৪ বিঘা জমিতে ধান করছিলাম ছেলে-মেয়ে লইয়া শান্তিতে চলমু করিয়া। কিন্তু ধানের দাম ৪০০-৫০০ টাকা মণ। যা ধান হইছে তার অর্ধেক দেওয়া লাগবো যার জায়গা তারে। এখন ধান আবাদে খরচ হইছে ও শ্রমিকরে রোজ ৭শ টাকা দিয়া কাজ করাইয়া ধানের দাম নাই। এখন আমরা লোকসান দিয়া ধান বেচা লাগবো’।

শ্রীবরদী উপজেলার মাটিয়াকুড়া এলাকার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমি এক বিঘা জমি চাষ করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা। সে জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ২২ মণের মতো। প্রতি মণ ৫শ টাকা বিক্রি করলে তার আয় হবে ১১ হাজার টাকা। অথচ আমার খরচ হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। আমরা খুব বিপদে আছি’।

কৃষি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণও কম নয়। শ্রীবরদী উপজেলার কৃষক রহিমা বেগমের নিজের জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তিনি ধান চাষ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন তিনি ধান বিক্রি করে আর লাভের আশা করেন না। শুধু ভাতের জোগান হলেই হলো। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আবাদ আর করবো না, খরচ ওঠে কেম্বে? বাজার খাবো? না কাপড়-চোপড় কিনবো, না ছেলে-মেয়েদের কোন খাবার খাওয়াবো’? 

ঝিনাইগাতী মিল মালিক ও খাদ্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রহিম মিয়া বলেন, এখন থেকে ৪/৫ বছর আগে জেলাতে এত অটোগাড়ি (ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক), রিক্সা ছিলো না। সবাই ক্ষেত মজুর কইরে দিন চালাত। কিন্তু এখন সব শ্রমিকরা অটো, সিএনজি, রিক্সা চালায়; কেউ পরিবার নিয়ে ঢাকায় গার্মেন্টস করে। তাই জেলাতে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। একজন্য দিন দিন শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে।  

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আশরাফ উদ্দিন দৈনিক অধিকারকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার ৫টি উপজেলাতে ৮৯ হাজার ৫ শ ৫৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ৯১ হাজার ৭২ হেক্টর জমিতে। আর ইতোমধ্যে ধান কাটা হয়েছে প্রায় তিন ভাগের একভাগ জমির। বাজারে ধানের দাম কিছুটা কম তবে আমি বোরো আবাদের পরিবর্তে কম খরচে আউশ ধান ও ভুট্টা চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহী হতে পরামর্শ দিবো। কেননা, বোরো মৌসুমে শ্রমিকের অভাব থাকে, সার বীজসহ অন্যান্য খরচও বেশি আউশ ধান চাষে এসব বিষয়ে খরচ কম।

এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ফরহাদ খন্দকার দৈনিক অধিকারকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ধান ও চালের বরাদ্দ লক্ষ্যমাত্রা পেয়েছি। এখন আমরা উপজেলা খাদ্য সংগ্রহ মনিটরিং কমিটির কাজ থেকে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা নিব এবং সেই কৃষকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩মেট্রিক টন ধান ২৬ টাকা কেজি দরে আমরা সরকারিভাবে নিবো। আমরা যখন গুদামে ধান নেওয়া শুরু করবো অবশ্যই কৃষকরা লাভবান হবেন এবং ধানের দাম বৃদ্ধি পাবে। 

তিনি আরও বলেন, যদি কৃষকরা দুইমাস ধান মজুত করে রাখতে পারে, তাহলে কৃষকরা লাভবান হবে বলে ব্যক্ত করেন তিনি।  

ওডি/এসএ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড