• রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৫  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমেই দিন কাটে শিশু সিফাতের

'কেন? ৩ বেলা খাওয়ায় তো'

  সুমাইয়া আখতার তারিন ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২০:২৬

সিফাত
শিশু সিফাত (ছবি : দৈনিক অধিকার)

ছেলেটির নাম সিফাত। বয়স বড়জোর ১১ বছর। চঞ্চল একটা ছেলে। হ্যাঁ আর দশটা ছেলের মতই চঞ্চল। সিফাতের সমবয়সী অন্য শিশুদের ভালোবাসা দিবস যেখানে কাটে আপন মানুষদের সাথে খুনসুটিতে, সেখানে তার ভালোবাসা দিবস কেটেছে বাসযাত্রীদের সেবায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। বলছিলাম বরিশাল থেকে স্বরূপকাঠি গামী 'হিরা' বাসের হেল্পার ১১ বছর বয়সী সিফাতের কথা।

বরিশাল থেকে স্বরূপকাঠি যাওয়ার পথে বৃহস্পতিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সে রুটের 'হিরা' নামক একটি বাসে কথা হয়েছিলো তার সাথে। প্রথমে অবশ্য ভয়ে কথা বলতে চায় নি সিফাত। পরে অভয় দেওয়াতে কথার খই ফোটে শিশু সিফাতের মুখে, জানায় নিজের ও তার পরিবারের দুর্দশার কথা। সাংবাদিকের সাথে কথা বললে চাকরি চলে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় পুরো সময় জুড়ে মুখ ভার ছিল সিফাতের। 

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর মাস শেষে মাত্র ৩০০ টাকা পারিশ্রমিক পায় সিফাত। তার মধ্যে ৫০ টাকা নিজের জন্য রেখে বাকিটা বাসায় দিয়ে দেয় সে। মাত্র তিনশ টাকা পাও? জিজ্ঞেস করলে সিফাত উত্তর দেয়, 'কেন? ৩ বেলা খাওয়ায় তো।'

'এই স্বরূপকাঠি, স্বরূপকাঠি ওডেন ওডেন', 'মাধম পাশা নামবেন কে?' তার অভিজ্ঞ কণ্ঠে এরকম অস্পষ্ট অথচ দৃঢ় উচ্চারণে নিজের সুনিপুণ দক্ষতার জানান দিচ্ছিলো ১১ বছর বয়সী বাস হেল্পার সিফাত।

যাত্রী খুঁজতে ব্যস্ত সিফাত (ছবি : দৈনিক অধিকার)

চার ভাইবোনের মধ্যে সিফাত সেঝো। বাবা রিকশাচালক, মা হোটেলের কর্মচারী, পরিবারের অন্যরাও শ্রমিক। এছাড়া ছোট একটা বোন আছে সিফাতের। 

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রমের পর মসজিদ, বাস স্টেশন, খোলা বারান্দা কিংবা রাস্তায় ঘুমায় সে। পড়াশোনার ব্যাপারে জানতে চাইলে বলে, 'আফা পড়ালেহা মোর মাতায় ডোকে না।'

এরকম পড়াশোনা না করা, রাস্তায় ঘুমানো হাজারও সিফাত আমাদের আশপাশে আছে। মালিক শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে সিফাতের মত এরকম অসংখ্য শিশুকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে। তাদের দিয়ে ইচ্ছামত খাটিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে তারা, আর দিনশেষে সিফাতদের ভাগ্যে জুটছে নামমাত্র কিছু পারিশ্রমিক।

বাংলাদেশে 'জাতীয় শ্রম আইন ২০০৬' অনুযায়ী '১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজ করানো হলে তা শিশু শ্রমের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।' শিশু শ্রম নিয়ে কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাদমান সাকিব বিন রহমান দৈনিক অধিকারকে বলেন, 'বাংলাদেশে আসলে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ কিন্তু তারপরেও চোখকান খোলা রাখলেই দেখা যায় চারপাশে অনেক শিশুই নানা রকম কায়িক শ্রমের কাজের সাথে যুক্ত। এর পেছনের মূল কারণ দারিদ্র্য। দরিদ্র পরিবারে বাবা মায়েরা তাদের সীমাবদ্ধ আয়ের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় নিজের শিশুকে কায়িক শ্রমের দিকে ঠেলে দেয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশসহ আরও ৫ টি দেশে গোটা বিশ্বের প্রায় ৫০% দরিদ্র মানুষ বসবাস করে। এই দরিদ্রতাই আসলে শিশুশ্রমের পেছনের প্রধান কারণ।'

সিফাতের চোখে এক অজানা ভয় (ছবি : দৈনিক অধিকার) 

তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশ সরকার আইন করে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করেছে বহু আগেই। তারপরেও বাস্তবতা হলো শিশুশ্রম চলছেই। আইনের যথাযথ প্রয়োগ শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত করলেই এই ব্যাপারটা বন্ধ করা সম্ভব। পাশাপাশি ব্যক্তি এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা আরও বেশি বাড়ানোর মাধ্যমেই পুরোপুরিভাবে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব।'

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড