• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘মুরগির মাংসে বিষ’ গুজবে সয়লাব মিডিয়া!

  ডা. মোঃ সাইফুল ইসলাম

২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:০৭
ব্রয়লার মুরগি
ছবি : সংগৃহীত

আমরা কি জানি পোশাক শিল্পের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পটি হচ্ছে পোল্ট্রি শিল্প? দেশে প্রায় ৬০ লক্ষ নারী-পুরুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পোল্ট্রি শিল্পের সাথে জড়িত। তবে ৯০ এর দশক থেকে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই শিল্পটি নানাভাবে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

যে সকল কারণে পোল্ট্রি শিল্প হুমকির মুখে তার অন্যতম একটি কারণ গুজব ও ভীতি সৃষ্টি। তন্মধ্যে অন্যতম ভীতি হচ্ছে পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম একটি প্রজাতি ব্রয়লার মুরগি নিয়ে। বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নানা শিরোনামে উঠে আসে ব্রয়লার মুরগির কথা।

গুজবটি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগির মাংসে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। এই গুজবটি প্রকাশ পায় মূলত ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবুল হোসেনের প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে।

গবেষণাপত্রটির সাথে যদি দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদ মেলাতে যান, তবে বুঝবেন তারা গবেষণাপত্রটি ভালোভাবে না পড়েই ভীতিকর তথ্য প্রচার করছে। এক কথায় বলা যায় গুজব ছড়াচ্ছে।

অধ্যাপক আবুল হোসেন তার গবেষণা কর্মটি পরিচালনার জন্য হাজারীবাগের বিভিন্ন ট্যানারি বা চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শিল্প থেকে নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করেন। নমুনাগুলো হচ্ছে স্কিন কাট ওয়েস্টস (SCW) এবং লেদার শেভিং ডাস্ট (LSD)। যেগুলোকে গরম পানিতে ফুটিয়ে রৌদ্রে শুকিয়ে কিছু হাড়ের গুঁড়ার সাথে মিশিয়ে দেশি মিট বোন (DMB) তৈরি করা হয়। অতপর সংগৃহীত নমুনা, DMB দিয়ে তৈরিকৃত পোল্ট্রি খাদ্য নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। পাশাপাশি বাজার থেকে প্রস্তুতকৃত পোল্ট্রি খাদ্য যা দেশের বিভিন্ন খামারে খাওয়ানো হয় এমন নমুনাও সংগ্রহ করেন। অতপর নমুনগুলোতে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পরীক্ষা করেন।

table

 

তিনি সংগৃহীত নমুনাগুলোতে নাইট্রিক এসিড ও পারক্লোরিক এসিড ১:১ অনুপাতে মিশিয়ে অ্যাবসরপশন স্পেকট্রোসকপি যন্ত্রের সহায়তায় ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পরীক্ষা করেন। তার গবেষণালদ্ধ ফলাফল হচ্ছে : 

•    প্রতি কিলোগ্রাম স্কিন-কাট ওয়েস্টস (SCW) এবং লেদার শেভিং ডাস্ট (LSD) এ ক্রোমিয়াম থাকে ১৪,০৮৫ মিলিগ্রাম।
•    প্রতি কিলোগ্রাম ‘দেশি মিট বোন’ এ ক্রোমিয়াম থাকে ৮,২১০ মিলিগ্রাম।
•    বাজার থেকে ক্রয়কৃত প্রতি কিলোগ্রাম পোল্ট্রির খাদ্যে কোনো ক্রোমিয়াম পাননি। (BDL - Below detection limits)।  

এই ফলাফল থেকে স্পষ্ট জানা যায়, বাজার থেকে ক্রয়কৃত খাদ্যে কোনো প্রকার ক্রোমিয়াম থাকে না। এ কথাটি আবুল হোসেন তার গবেষণাপত্রের ফলাফলের চার নম্বর পৃষ্ঠায় সুন্দরভাবে বলে দিয়েছেন।

table

 

ফলাফলের পরের কথাগুলো নিয়েই গুজব মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে যায়। যেহেতু বাজার থেকে ক্রয়কৃত খাদ্যে কোনো ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাননি তাই তিনি তার গবেষণা কর্ম চালাতে ট্যানারি থেকে সংগৃহিত LSD ও SCW দিয়ে প্রস্তুতকৃত খাদ্য মুরগিকে খাওয়ান। এরপর সেই মুরগির বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে পরীক্ষা করে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পান। আর এই ক্রোমিয়ামের অতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে ক্যান্সার হতে পারে বলে বিভিন্ন কথা বলেন।

সচেতন পাঠকরা একটু লক্ষ করুন। আবুল হোসেন বাজার থেকে ক্রয়কৃত খাদ্যে ক্রোমিয়াম পাননি বলে সেই খাদ্য আর মুরগিকে খাওয়াননি। খাওয়ালেন ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য। এছাড়াও তিনি তার গবেষণায় বাজার থেকে কেনা চারটি মুরগি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু তার গবেষণায় সরাসরি খামার থেকে কিনে নিয়ে আসা মুরগি ব্যবহার করেননি। এছাড়াও ব্যবহার করেননি খামার থেকে বা বাজার থেকে সংগৃহীত নামিদামি কোম্পানির কোনো খাদ্য। তাহলে খামারের মুরগিতে যে ক্ষতিকর মাত্রায় ক্রোমিয়াম রয়েছে এ কথা বলা যায় কী?

হ্যাঁ, তার গবেষণায় একটি বিষয় বোঝা যায়। তা হচ্ছে, যদি ক্রোমিয়ামযুক্ত ট্যানারি বর্জ্য মুরগির খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়, তবে মুরগির মাংস হয়ে মানব শরীরে ক্রোমিয়াম প্রবেশ করতে পারে। আর বাস্তব চিত্র হচ্ছে ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে খাদ্য তৈরি সম্পূর্ণ অবৈধ। 

খাদ্য তৈরির পর সরকারি যে অনুমোদন লাগে তাতে ক্ষতিকর উপাদান, ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহারের প্রমাণ মিললে সেই অনুমোদন বাতিলসহ জেল, জরিমানার বিধান রয়েছে। তাই বাজারে প্রাপ্ত নামিদামি কোম্পানির খাদ্যে ট্যানারি বর্জ্য ও ক্রোমিয়াম সম্ভাবনা নাই বললেই চলে।

কথা হচ্ছে, আবুল হোসেন তার গবেষণায় বাজারের খাদ্যে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি না পেলেও জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও ব্রয়লার মুরগি সম্পর্কে ভীতি ছড়াচ্ছে কেন? হতে পারে সংশ্লিষ্ট মিডিয়ার অজ্ঞতা। তাছাড়াও স্পষ্ট প্রমাণিত হয় কোনো তথ্য ভালোভাবে পড়াশোনা না করেই সংবাদ পরিবেশনের মানসিকতা ও দায়িত্বহীনতা। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত নয় কি?

তথ্যসূত্র : রিসার্চ গেট ডট নেট।
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড