• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

কার্টুন না দেখতে দিলে খাবই না!

নিশীতা মিতু  
০৭ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৩৭

শিশুর কার্টুন দেখা
ছবি : প্রতীকী

দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র রিজন। বাংলা অত ভালোভাবে বলতে শেখেনি এখনও। যুক্তাক্ষর রয়েছে এমন শব্দ উচ্চারণে খানিকটা আটকে যায়। তবে হিন্দি ভাষাটা বেশ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছে এই বয়সেই। নাহ, কোনো ভিনদেশি ভাষা শেখার কোর্স করে নয়, টেলিভিশনের পর্দায় কার্টুন দেখেই শিখেছে হিন্দি ভাষা। 

একই অবস্থা সদ্য স্কুলে পাড়ি জমানো সায়মার। নাকিনাকি কণ্ঠ ছাড়া কথাই বলতে পারে না সে। নাক বা কণ্ঠনালীর কোনো সমস্যা নয়, প্রিয় কার্টুন চরিত্র শিনচ্যানকে অনুকরণ করতে গিয়েই তার এই হাল। এমনকি মায়ের কাছে বায়নাও ধরেছে লাল গেঞ্জি আর হলুদ প্যান্ট কিনে দেওয়ার জন্য। শিনচ্যান ঠিক অমন রঙের পোশাক পরে কিনা! 

শিশুদের এই কার্টুনপ্রীতি আর কার্টুনকে অনুকরণ করা এখনকার সমাজে বেশ স্বাভাবিক। মা-বাবাও কার্টুন দেখানোর শর্তে শিশুকে দিয়ে করাচ্ছেন নানা কাজ। স্কুলে গেলে কার্টুন দেখতে দিব, অঙ্কটা পারলে কার্টুন দেখতে পারবে, ঠিক সময়ে গোসল করলে পাবে কার্টুন দেখার সুযোগ— এমন আরও কত কী!

শিশুরাও কম যাচ্ছে না। নানা কাজের বিনিময়ে আদায় করে নিচ্ছে কার্টুন দেখার সুযোগ। কার্টুন দেখতে না দিলে খাওয়া বন্ধ, কার্টুন দেখতে দিলে তবেই হোম ওয়ার্ক করতে বসা... সবকিছু মিলিয়ে মা-বাবা জিম্মি শিশুর কাছে আর শিশুর মস্তিষ্ক জিম্মি ভিনদেশি কার্টুনে। 

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। কার্টুন দেখের প্রিয় কার্টুন চরিত্রের ভাষা থেকে শুরু করে পোশাক, আচরণ, হাটা-চলার ধরন সবকিছুই তারা করতে চায় অনুকরণ। আর ফলাফল হিসেবে হারাচ্ছে নিজস্বতা, নিজের সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ কিংবা নিজের মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশ করার ক্ষমতা। 

মনোবিদ কায়লা বইস আর ব্র্যাড বুশম্যান মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে শিশুদের কার্টুন দেখার বিষয়টি নিয়ে একটি সমীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুরা সপ্তাহে গড়ে ৩২ ঘণ্টা কার্টুন দেখে। ছয় থেকে এগারো বছরে যা নেমে আসে ২৮ ঘণ্টায়। ৫৩ শতাংশ ক্ষেত্রে কার্টুন দেখার সময় শিশুরা অভিভাবকের তত্ত্বাবধান থেকে দূরে থাকে। আর এভাবে নিয়মিত কার্টুন দেখার ফলে বদলে যায় শিশুর আচার-আচরণ। এমনকি নিরীহ বাধ্য শিশু হয়ে উঠতে পারে হিংস্র। 

শিশুর মানসিকতা বিকাশের বয়সে মা-বাবা তাকে ঠেলে দিচ্ছেন কার্টুনের রঙিন জগতে। নিজেদের কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকা অবিভাবকরা দিন শেষে সন্তানকে খুশি করাতেও তাকে দিচ্ছেন প্রিয় কার্টুন চরিত্রের ছবি সম্বলিত ব্যাগ, ফ্ল্যাক্স কিংবা টিফিন বক্স। আর সব মিলিয়ে আপনার সামান্য হেঁয়ালিতে আপনার সন্তান রপ্ত করছে ভিন দেশের ভাষা আর সংস্কৃতি। হয়তো একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবেন সে অঙ্ক ভুল করে চিৎকার করা কাঁদছে আর বলছে, ‘ডরিমন, মুজেহ মাদাত কারো’। আপনার সাহায্য না চেয়ে ডরিমনের সাহায্য চাওয়াতে অবাক হবেন না যেন, কেননা আপনিই তাকে সে সুযোগ করে দিয়েছেন। 

উপায় তবে কী? 

যে কোনো সমস্যারই সমাধান থাকে। সময় থাকতে শিশুকে কার্টুনের এই বিপদগামী পথ থেকে ফেরানোর দায়িত্ব আপনারই। কথা হচ্ছে কীভাবে? হুট করে কার্টুন দেখা বন্ধ করে দিলে তা শিশুর মনে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। শুরুতে কার্টুন দেখার সময় বরাদ্ধ করে দিন। সর্বোচ্চ দেড় ঘণ্টার বেশি সময় যেন কিছুতেই কার্টুন না দেখে। 

সম্ভব হলে নিজে কিছু কার্টুন নির্বাচিত করে দিন যেগুলো দেখে সে কিছু শিখতে পারবে। হতে পারে ছড়ার কিংবা শিক্ষামূলক গল্পের কার্টুন। এমন কার্টুন সিরিজ যদি খুঁজে পান যাতে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ফুটে ওঠে তবে তাই নির্ধারিত করুন শিশুর জন্য। 

একটু সময় করতে পারলে শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন বাইরে। ঘুরিয়ে আনুন পার্ক কিংবা ছোটদের খেলার জায়গায়। এটি তার মানসিক বিকাশে সাহায্য করবে। 

ঘুমানোর আগে গল্প বলার অভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনুন। ফিরে যান রূপকথার গল্প বলার সময়ে। তাতে অন্তত শিশুকে কার্টুনের বিষাক্ত ছোবল থেকে বাঁচাতে পারবেন। 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড