• শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

টেকনাফে দাউদ ইব্রাহিম খ্যাত আরেক সাইফুলের উত্থান

  শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার

২৮ জানুয়ারি ২০২২, ২১:৪৫
দাউদ ইব্রাহিম খ্যাত শীর্ষ ইয়াবা কারবারি সাইফুল ইসলাম
দাউদ ইব্রাহিম খ্যাত শীর্ষ ইয়াবা কারবারি সাইফুল ইসলাম। (ছবি: সংগৃহীত)

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলেছে দুই ‘সাইফুল’ এর ইয়াবা রাজত্ব। পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান দুই সাইফুলের নামে দেশে আসলেও তালিকাভুক্ত সীমান্তে ইয়াবা ডন খ্যাত সাইফুল করিমের নাম বার বার উঠে এসেছে। অনেকটা অপ্রকাশিত ছিল আরেক শীর্ষ ইয়াবা কারবারি সাইফুল ইসলামের নাম। ২৫ সদস্যের ‘উপকূলীয় ইয়াবা সিন্ডিকেট’ গঠন করে এই সাইফুল সাগর পথে ইয়াবা এনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ১১ জানুয়ারি সাইফুলের ফিশিং বোটের মাঝি সৈয়দ করিম ইয়াবা ও আইস নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে গ্রেফতার হওয়ার পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে সাইফুল ইসলামের ইয়াবা সাম্রাজ্যের অজানা সব তথ্য। সৈয়দ করিমকে দিয়ে ইয়াবা ও আইস পাচারের অভিযোগে সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

জানা গেছে, সীমান্তে ইয়াবা ডন খ্যাত দুই সাইফুলের মধ্যে সাইফুল করিম অধ্যায়ের ইতি ঘটে ২০১৯ সালের ৩১ মে। পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর সাইফুলকে ভুলে যেতে বসেছিল মানুষ। কিন্তু ওই নামটি আবার জাগ্রত করে তোলে সাইফুল ইসলাম নামে আরেক মাদক কারবারি। টেকনাফ উপকূলে ২৫ জনের সিন্ডিকেট তৈরি করে সাগর পথে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের বড় বড় চালান আনার খবর উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। উপকূলে দাউদ ইব্রাহিম খ্যাতি অর্জন করেছে এই সাইফুল ইসলাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ লেঙ্গুরবিল গ্রামের সৈয়দ হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম। শীর্ষ ইয়াবা গডফাদার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত) বিএনপি নেতা জাফর আহম্মদ প্রকাশ জাফরের সাথে রাজনীতির পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন সাইফুল ইসলাম। আস্তে আস্তে সীমান্তের ওপারেও ইয়াবা ব্যবসা রপ্ত করেন। পর্যায়ক্রমে মিয়ানমারের ইয়াবা কারবারিদের কাছে আস্থা অর্জন করার পর তাকে আর পিছন ফিরে থাকাতে হয়নি।

আরও জানা যায়, হাজী সাইফুল করিমের পাশাপাশি সাইফুল ইসলামও ইয়াবার জগতে একছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। নিজেই কিনে নেন তিনটি ফিশিং বোট। সাগরে মাছ শিকারের নামে সিন্ডিকেট সদস্যদের দিয়ে সাগর পথে মাদকের পাশাপাশি বিদেশী অস্ত্রের ব্যবসায়ও জড়ায় সাইফুল। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক সন্ত্রাসীদের কাছে নাইন এমএম পিস্তল ও দেশীয় তৈরি বন্দুক সরবরাহের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন উপকূলীয় সিন্ডিকেট প্রধান এই সাইফুল। তার বিরুদ্ধে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, টেকনাফ, রামুসহ বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে। ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ২০১১ সাল থেকে ২৫ জনের উপকূলীয় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক তিনি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরাসরি মিয়ানমারের ইয়াবা কারখানা থেকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ পাচার করছে সাইফুল। ২০১৪ সালে রামু থানায় ইয়াবাসহ প্রথম আটক হয় সে।

ডিএনসি টেকনাফ বিশেষ জোন সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ জানুয়ারি বিকালে সাইফুল ইসলামের ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার আ্যমফিটামিন যুক্ত ইয়াবা ট্যাবলেট ও ক্রিস্টাল মেথ পাচারের সময় ফিশিং বোট মাঝি সৈয়দ করিমকে আটক করা হয়। টেকনাফ রাজার ছড়া মেরিন ড্রাইভ রোডস্থ নাহিদ স্টোরের সামনে থেকে তাকে আটক করে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের টেকনাফ বিশেষ জোনের রেইডিং টীম।

জব্দকৃত ইয়াবা ও আইস সাইফুল ইসলাম তাকে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে কক্সবাজার পৌঁছে দেওয়ার জন্য দিয়ে ছিল বলে ডিএনসির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে সৈয়দ করিম মাঝি।

এ ব্যাপারে টেকনাফ বিশেষ জোনের উপ-পরিদর্শক তুন্ত মনি চাকমা বাদী হয়ে আটক সৈয়দ করিম মাঝি ও ইয়াবা ডন সাইফুল ইসলামকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। টেকনাফ থানার মামলা নং- ৪৩, জিআর-৪৩।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাইফুলের উপকূলীয় ইয়াবা সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যরা হলেন- মিঠাপানির ছড়ার নুর বশর প্রকাশ বুলু ড্রাইভার (তার রয়েছে তিনটি ফিশিং বোট), টেকনাফ সদর হাতীয়ার ঘোনার আব্দুল্লাহ, উত্তর লেঙ্গুরবিলের মো. আয়াছ, সোলাইমান, জাহালিয়া পাড়ার মো. জাফর, মো. আয়াছ, হাতিয়ার ঘোনার মো. আবদুল্লাহ ও একই এলাকার মোহাম্মদ রশীদ (আনুইয়া)। এদের প্রত্যেকেরই ফিশিং বোট রয়েছে। সেইসাথে মাদক মামলার আসামীও তারা।

স্থানীয়রা আরও জানান, ইয়াবার চালান নিয়ে প্রথম কক্সবাজারের রামু থানায় গ্রেফতার হন সাইফুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে কক্সবাজারের রামু থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নং ২৩/৩৭৩,১৬ অক্টোবর। এরপর দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে এসে ফের শুরু করেন মাদক চোরাচালান ব্যবসা।

টেকনাফ মডেল থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ইয়াবা কারবারি সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা নং ৪৪/৩১২, তাং-১৩ এপ্রিল ২০১৭। ডিএমপি যাত্রাবাড়ী থানার মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা নং ৫০/১৩৫২,তাং-১১ ডিসেম্বর ২০১৮, টেকনাফ থানার মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা নং ২২/৫৪৫, তাং-১০ জুলাই ২০২১, টেকনাফ থানার মামলা নং-১৯/৬৪১, তাং-৪ আগস্ট ২০২১, সর্বশেষ টেকনাফ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা নং ৪৩/৪৩, তাং-১১ জানুয়ারি ২০২২ মামলা রয়েছে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, সাইফুল ইসলাম ক্রিস্টাল মেথ ও ইয়াবা আনেন সরাসরি মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে। ওপারের রোহিঙ্গাদের সাথে সিন্ডিকেট রয়েছে তার। রোহিঙ্গাদের ১০/১৫ জন দেশী ও রোহিঙ্গা ডাকাত দিয়ে সশস্ত্র পাহারায় বিভিন্ন সময়ে টেকনাফ লেংগুর বিল ঘাট, তুলাতলি ঘাট, হাতিয়ার ঘোনার ঘাট, মিঠাপানির ছড়া ঘাট, হাবিরছরা ঘাট, নোয়াখালী পাড়া ঘাটে ইয়াবা খালাস করে। ৩০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে উপকূলীয় এই সিন্ডিকেটের। সব ফিশিং বোটের মাঝিরা রোহিঙ্গা হওয়ায় তাদের ওই দেশের সব জায়গা পরিচিত এবং সাগরপথও অজানা নয়। এই সাইফুল উপকূলীয় সিন্ডিকেটসহ স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের সমন্বয়ে গঠিত আরও ৩/৪ টি ইয়াবা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একটি বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই উপকূলীয় সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে ও ইয়াবা কারবারিদের সুরক্ষায় ঢাকা থেকে জনৈক আবদুল বারি নামের কোনো এক ব্যক্তি বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার পরিচয় সনাক্তে কাজ করতে গোয়েন্দা সংস্থা। এই আবদুল বারিই সীমান্তে ইয়াবা সিন্ডিকেট সদস্যদের সুরক্ষার কথা বলে ফায়দাও হাসিল করছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে শুরু হলে ক্রসফায়ারের ভয়ে দুবাই পালিয়ে যান সাইফুল। মেজর সিনহা হত্যার পর মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে ভাটা পড়লে ফের দেশে চলে আসে সাইফুল। অর্ধ-ডজন মাদক মামলা মাথায় নিয়ে গ্রেফতার এড়াতে সাইফুল ফের বিদেশে পালানোর আয়োজন শেষ করেছে।

ওডি/জেআই

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড