• মঙ্গলবার, ০৯ মার্চ ২০২১, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দেশের সেরা ট্যাক্স দাতাদের কাতারে নিজেকে দেখতে চাই : ‘Orso clothing’ এর এমডি কিরণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৫:৫১
অধিকার
Orso clothing এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মুশফিকুর রহমান কিরণ

আমাদের দেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি স্বল্পোন্নত দেশ। আর জাতি হিসাবেও আমরা উন্নয়নশীল। তাইতো পৃথিবীতে যে কয়টি দেশে বেকার সমস্যা সবচেয়ে চরমে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মসংস্থান না করতে পেরে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। যেখানে বেশ বড় অঙ্কের তরুণ-তরুণী নিজেদের সংসারের হাল ধরতে নাজেহাল অবস্থা পার করছেন, সেখানে কিছু তরুণ সমাজে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সকল বাধা বিপত্তিকে উৎরিয়ে তারা যেমন উদ্যোক্তা হবার পথে হাঁটছেন। তেমনি কর্মসংস্থান করছেন অসংখ্য তরুণ তরুণীর। এমনি একজন তরুণ উদ্যোক্তা মীর মুশফিকুর রহমান কিরণ। Orso clothing এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কিরণ স্বপ্ন দেখেন তিনি একদিন বাংলাদেশের সেরা ট্যাক্সদাতা হবেন। দৈনিক অধিকার কথা বলেছে এই উদ্যমী তরুণ উদ্যোক্তার সঙ্গে।

দৈনিক অধিকার : আপনার প্রতিষ্ঠান এর নাম ‘orso’ রাখার পেছনের গল্পটা কী?

কিরণ : আমি যেহেতু বিজনেসের ছাত্র সেহেতু আমার একটা ব্যাপার জানা ছিল, যে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামটা সহজ হতে হবে। যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বলতে পারে এবং লিখতে পারে এবং এর পাশাপাশি মিনিং ফুল ওয়ার্ড হতে হবে। সেই ব্যাপারটা মাথায় রেখে আমার প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া Orso। আর Orso মানে হচ্ছে ভাল্লুক। আপনি যখন আমার লোগোটা দেখবেন তখন সেখানে একটি ভাল্লুকের মুখ দেখতে পাবেন। কিন্তু ওখানে ভাল্লুকের মুখের মধ্যে আমি যে জিনিসটা দেখতে পাই সেটা হচ্ছে আমরা যদি ভাল্লুকের চোখটা যদি হাইড করে দেই তাহলে মুখে দেখতে পাচ্ছি একটা শার্টের কলার আর টাই। তার মানে দেখা যাচ্ছে ভাল্লুক নিজেই একটা ফ্যাশন ক্যারি করছে।

দৈনিক অধিকার : বাহ দারুণ। আচ্ছা প্রতিষ্ঠানের শুরুর গল্পটা শুনতে চাই?

কিরণ : আমার মূল ব্যবসা হচ্ছে বাইং হাউজের ব্যবসা। আমার অফিসে আমার বিভিন্ন বন্ধুরা আসতো কারও বিভিন্ন ব্রান্ডের টি-শার্ট বা জিন্স এর আবদার থাকতো। তো দেখা যেতো অফিসের ভেতরে আমরা সেই ব্যাপারটা নিয়ে কমফোর্ট ছিলাম না। তো দেখা গেছে কোনো এক ঈদে আমার একদল বন্ধু এসে অনেক বেশি পরিমাণের জামা-কাপড় নেয়। আগে হত কি, আমার কাছের বন্ধুরা এই cloths গুলো এমনিই নিয়ে যেত। কিন্তু এবার দেখলাম তারা cloths গুলো টাকা দিয়েই নিল। সে রাতে তারা প্রায় ৪৮ হাজার টাকার কেনাকাটা করে। তখন আমার এক বন্ধু সেতু এই পরিস্থিতি দেখে আমাকে ব্যবসার পাশাপাশি একটা শো রুম দিতে বলে। এই ব্যাপারে গল্প করতে করতে একটা চা খেতে একটা দোকানে আসি আর সেই চায়ের দোকানের পাশেই টুলেট ঝুলানো একটা দোকান দেখতে পাই। আর দেখেই পছন্দ হয়ে যায়। সেখানেই ওরস এর শো রুম আলোর মুখ দেখে। তো এভাবেই শুরু হয়ে যায় আমার Orso এর পথচলা।

দৈনিক অধিকার : আপনাদের মূল মোটো কি বা আমি যদি আরও সহজ করে বলি আপনাদের মূল বৈশিষ্ট্য কি বা আপনাদের কোন বিষয়টা অন্যদের থেকে ওরসকে আলাদা করবে?

কিরণ : যদি ভালো করে খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন সব বিষয়েই আমরা অন্যদের থেকে আলাদা। আমাদের আসলে মূল ক্রেতা হচ্ছেন যুবক থেকে মাঝ বয়সের মানুষেরা। দেখা যাচ্ছে আমরা আগে তাদের চাহিদা গুলোকে বুঝার চেষ্টা করি। তারপর আমরা বাজারে পণ্য আনি। আমি যদি আমার কাস্টমার সার্ভিসের কথা বলি তাহলে আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে অনেক ফেমিলিয়ার। আমার ক্রেতারা আমার শো-রুমে নিজেদের মত ঘুরে ফিরে পণ্য পছন্দ করে পণ্য ক্রয় করে। এ ব্যাপারে আমরা ক্রেতাদের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করি না। আর আমরা কাস্টমার সার্ভিসের কথা মাথায় রেখে আরও একটি নতুন বিষয় সংযোজন করেছি, সেটি হচ্ছে, কেউ যদি কোনো পণ্য কিনে বাসায় নিয়ে যায় এবং বাসায় যাবার পর পণ্য যদি পছন্দ না হয় বা কোনো কারণে ভাল না লাগে তাহলে সে নির্দ্বিধায় সেটিকে পরিবর্তন করতে পারবে তাও আবার সময়সীমা ৩০ দিন। আর এই এত বড় সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবর্তনের অফারটি বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দেয় কি না আমার সন্দেহ আছে। আর আমার এই কাস্টমার সার্ভিসের জন্যই দেশের জাতীয় ক্রিকেট টিমের খেলোয়াড় থেকে থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের নায়করাও আমার নিয়মিত ক্রেতা। দেখা গিয়েছে নায়ক সিয়াম আহমেদ তার কিছু চলচ্চিত্রেও আমার পণ্য গুলোকে তার সিনেমায় কস্টিউম হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর দামের ব্যাপারে যদি বলি তাহলে অন্যান্য ব্রান্ডের পণ্যের তুলনায় আমার পণ্যের মান পুরোটাই একই রেখে আমরা অর্ধেক দামে পণ্য দিচ্ছি।

Orso এর শোরুম

দৈনিক অধিকার : ব্র্যান্ড কোয়ালিটি ভালো রেখে কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারার রহস্যটা কি?

কিরণ : আসলে মূল কথা হচ্ছে আমাদের ব্যবসা তো আর এই একটা না, এক জামাকাপড়ের ওপর ভিত্তি করে আমাদের আরও অনেক ব্যবসা আছে, যেমনটি আমি আগে বলেছিলাম। আর আমার এই ব্যবসা একদিন বা দুই দিনের জন্য করছি না। এই ব্যবসা নিয়ে আমার পরিকল্পনাও অনেক এবং Orso এর শাখা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা। তাই ব্যবসা নিয়ে সকলের মাঝে বেশি দিন টিকে থাকতে গেলে অবশ্যই দাম আর কোয়ালিটির ওপর বিশেষ নজর দিতেই হবে।

দৈনিক অধিকার : পৃথিবীর এই ডিজিটালাইজেশনের যুগে ব্যবসার দিক থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অনলাইনে ‘Orso’ এর অবস্থান কোথায়?

কিরণ : সত্যি কথা বলতে ‘Orso’ নিয়ে ডিজিটাল প্লাটফর্মে আমার অনেক আগেই আসার ইচ্ছা ছিল। তবে শো রুমের বয়স ৪ বছর হবার পরও আমারা Orso কে নিয়ে ডিজিটাল প্লাটফর্মে আসতে পারিনি কেননা শো রুমেই আমাদের ব্যবসা অনেক ভালো চলছিল। তবে কোভিড-১৯ এর সময় দেখা গিয়েছে আমাদের কিছু কাস্টমার আছে যারা অন্য শো রুম থেকে পণ্য কিনে সেটিস্ফাইড হচ্ছিল না। তো সে সময়ে তাদের একান্ত অনুরোধে আমাকে এই ডিজিটাল প্লাটফর্মে আসতে হয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে তখন মহামারির সময় আমাদের হাতের কাছে যা ছিল তাই দিয়েই অনলাইনে যাত্রা শুরু করি কোনো প্রকার মডেল ছাড়া মোবাইল দিয়ে প্রডাক্টের ছবি তুলেই অনলাইনে ছবি আপলোড দিতে শুরু করি। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই অল্প সময়ের মাঝে যে আমরা সারা বাংলাদেশে এত রেসপন্স পাবো তা কখনোই চিন্তা করিনি।

দৈনিক অধিকার : অনলাইনে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

কিরণ : অনলাইনে ব্যবসা বলতে আমরা এখন ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম আছি আর খুব অল্প সময়ের মাঝে আমরা ইউটিউব আর ওয়েবসাইটেও আসছি। মূল কথা হচ্ছে আমরা ওরসকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনলাইনের প্রত্যেকটি ধারায় নিয়ে আসবো যাতে সবাই Orso কে এক নামে চিনতে পারে। তবে আমরা ভবিষ্যতে শুধু অনলাইনেই আটকে থাকব না। Orso কে নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনা অনেক ব্যাপক। অদূর ভবিষ্যতে আমরা ফ্রাঞ্চাইজি দেওয়ার চেষ্টায় আছি, নিজেদের ব্রান্ডে পাঞ্জাবি ও কুর্তি তৈরি করবো, মেয়েদের পোশাকের ক্ষেত্রে ওয়েস্টার্ন আর দেশীয় আমেজ নিয়ে একটি ফিউশনের চেষ্টা করছি। এছাড়াও দেশের বাইরের এডিডাস, ‘নাইকি’র মত ওয়ার্ল্ড ফেমাস ব্রান্ডের জুতা আর ‘রেবেনের সানগ্লাস’ ইম্পোর্ট করছি।

দৈনিক অধিকার : আজ থেকে ১০ বছর পর আপনি নিজেকে এবং Orso কোথায় দেখতে চান?

কিরণ: সত্যি কথা বলতে orso কোনো শব্দ না এটা আমার সন্তানের মত। একটা সন্তানকে মানুষ যে ভাবে লালন করে আমিও ঠিক তেমনি ভাবে গত ৪ বছর ধরে orso লালন পালন করেছি। আর আমি চাইবো এই সন্তান যেন সুসন্তান হয়ে বড় হয়ে উঠে এবং সবাই যেন আমার এই সন্তানকে ভালো বলে সেটা আমি চাইবো। আর আমি নিজেকে ১০ বছর পরে বাংলাদেশের সেরা ১০ ট্যাক্স দাতাদের কাতারে দেখতে চাই।

দৈনিক অধিকার : পরিশেষে আপনি আপনার গ্রাহকদের উদ্দেশে কিছু বলেন?

কিরণ : গ্রাহকদের উদ্দেশে যে কথাটা বলতে চাই তা হলো ফ্যাশনটা পুরোপুরি নির্ভর করে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং কম্ফোর্ট এর ওপর। সবাই সবার ইচ্ছা মত পোশাক পরেন। তবে সামর্থ্যের মধ্যে কোয়ালিটিফুল পোশাক পরেন। আর আমি তাদের উদ্দেশ্যে বিশেষ করে বলতে চাই যারা গত চার বছর ধরে আমার orso এর সঙ্গে ছিলেন তাদেরকে শুধু ধন্যবাদ দিতে চাইব না, আমি বলবো তারা যেন বিগত দিনগুলোর মত সামনের দিনগুলোতেও আমাদের সঙ্গে থাকেন। আমরা যেনো নিজেদেরকে আরও উন্নত করতে পারি সেই কামনা করছি।

দৈনিক অধিকার : আপনি একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য যদি কিছু বলতেন?

কিরণ : বহু বছর আগে আমি আনিসুল হকের একটা লেখা পড়েছিলাম সেখানে লেখা ছিল, পৃথিবীতে একদিন এমন সময় আসবে ডাক্তাররা ফেরি করে বেড়াবে। পৃথিবীতে একদিন ইঞ্জিনিয়ার এত পরিমাণে বেড়ে যাবে তারা নিজেরাই নিজেদের ফেরি করে বেড়াবে কারণ, তারা কাজ খুঁজে পাবে না। আমি যেটা বলার চেষ্টা করছি উদ্যোক্তা হওয়াটা খুব জরুরি কেননা উদ্যোক্তা হওয়ার ফলে আপনি নিজে কাজ পাচ্ছেন, নিজের পরিবার চালাচ্ছেন এবং আশে পাশের আরও অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন সো এর থেকে আর বড় কোনো প্রশান্তির বিষয় হতেই পারে না। আর দিন শেষে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে তারা নিজেরা নিজেদের কাজের দিক থেকে একেবারেই স্বাধীন। দিন শেষে কাউকে জবাবদিহিতা করতে হয় না।

দৈনিক অধিকার : একজন ভালো উদ্যোক্তার কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

কিরণ : এই ব্যাপারে আমার জীবনে একটা গল্প আছে, তাহলে সেটাই বলি। আমি আমার ব্যবসা জীবন শুরু করার আগে একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম তখন সেই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন মিটিং এ আমাকেও উপস্থিত থাকতে হতো। তার মধ্যে একবার এক বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার কথা হয়। তখন আমি তার কাছে জানতে চাই, আমি মাত্র গ্রাজুয়েশন শেষ করেছি এবং আমি ব্যবসা করতে চাই কিন্তু আমার কাছে কোনো টাকা নাই। তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন Every good relationship is an investment for every business. সো একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে যে জিনিসটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, সাহস, স্বপ্ন, আর দিনকে রাত ও রাতকে দিন করে দেওয়ার মত ইচ্ছাশক্তি এবং নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ক্রিয়েটিভিটিকে ফুটিয়ে তোলা।

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড