• শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

‘পুশ বাটন’ চাপলেও কাজ করছে না

  মনিরুল ইসলাম মনি

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:২১
পুশ বাটন
পুশ বাটন সিগন্যাল বিড়ম্বনায় চালক-পথচারী (ছবি : সংগৃহীত)

রাজধানীর রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পথচারীদের চলাচল নিরাপদ করতে বসানো হয় ‘পুশ বাটন সিগন্যাল’। জেব্রা ক্রসিংয়ের পাশের দুই পাড়ে হলুদ-কালো-হলুদ রঙে রাঙানো দুটি লোহার খুঁটিতে সাঁটানো রয়েছে ব্যবহার নির্দেশিকা। কিন্তু নির্দেশনা অনুযায়ী সিগন্যালের পুশ বাটন চাপলেও তা কাজ করে না।

জানা গেছে, উন্নত দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থার অনুকরণে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে প্রথমবারের মতো ‘পুশ বাটন সিগন্যাল’ স্থাপন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কিন্তু চালুর চার মাসেই অপমৃত্যু হয়েছে পুশ বাটনের!

সরেজমিনে মোহাম্মদপুরের আসাদগেটের পুশ বাটন সিগন্যালে গিয়ে দেখা যায়—হলুদ-কালো-হলুদ রঙে রাঙানো দুটি লোহার খুঁটিতে সাঁটানো নির্দেশিকায় লেখা রয়েছে ‘থামুন, বাটন চাপুন, অপেক্ষা করুন, সিগন্যাল দেখুন, হাঁটুন’। নির্দেশিকায় পুশ বাটন সিগন্যাল ব্যবহারের কলা-কৌশল লেখা হয়েছে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য বাটন চাপলে সিগন্যাল পয়েন্টে জ্বলবে লাল বাতি। তখন যানবাহন থেমে যাবে, তারপর পথচারীরা নিরাপদে রাস্তা পার হবে।

কিন্তু বাস্তবের কোনো কার্যকারিতাই নেই। পুশ বাটন আছে, নির্দেশিকা আছে, কিন্তু বাটন চাপলে কোনো কাজ হচ্ছে না। এটি স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালে পরিণত হয়েছে। তবে এই সিগন্যালটি স্বয়ংক্রিয় কি না, সে সম্পর্কেও কোনো কিছু লেখা নেই সিগন্যালটির সেই নির্দেশনায়।

‘পুশ বাটন সিগন্যাল’ নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিএনসিসির কর্মী ও ট্রাফিক পুলিশ থাকার কথা থাকলেও তাদের দেখা যায়নি। দাঁড়িয়ে থাকা পুশ বাটন সিগন্যালটি এখন যেন তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। 

‘পুশ বাটন সিগন্যাল’ সম্পর্কে কথা হয় পথচারীদের সঙ্গে। তবে বেশিরভাগ পথচারীই পুশ বাটন সিগন্যাল সম্পর্কে কিছুই জানে না। তবে কয়েকজন সচেতন পথচারী ‘পুশ বাটন সিগন্যাল’ নিয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করেন।

বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি রবির মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ মেহেদী হাসান মিথুন বলেন, আমরা পুশ বাটন সিগন্যালের বাটন চাপলেও কোনো কার্যকারিতা দেখিনি। বার বার বাটন চেপে বিভ্রান্ত হচ্ছি।

ব্যাংক কর্মকর্তা জুলহাস কবীর খোকন বলেন, পুশ বাটনের নির্দেশ অনুযায়ী বাতি জ্বলে না। এতে করে আমরা পুশ বাটন প্রযুক্তির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছি।

মারুফ জোয়ার্দ্দার রোমেল নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ট্রাফিক সিগন্যালে ‘পুশ বাটন’ থাকে। সেখানে এটির ব্যবহারও দারুণ। আমাদের দেশে এই সিগন্যালটিতেও ‘পুশ বাটন’ বসানো হয়। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ। এটার যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করে প্রতিটি সিগন্যালেই এই প্রযুক্তি লাগালে ট্রাফিক পুলিশের ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি পথচারীদের মধ্যেও একটা শৃঙ্খলাবোধ কাজ করবে। 

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, আমাদের দেশে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারের প্রবণতা নেই বললেই চলে। যার ফলে ফুটওভারব্রিজ কিংবা এলোমেলো রাস্তা ব্যবহার নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয় প্রতিবন্ধী কিংবা বয়োবৃদ্ধদের জন্য। সুস্থ মানুষ অবলীলায় ফুটওভারব্রিজ ও এলোমেলো রাস্তা পার হলেও প্রতিবন্ধী ও বয়স্করা কীভাবে পার হবে। এটা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

শুধু পথচারীই নয়, পুশ বাটন সিগন্যাল বিড়ম্বনায় পড়েন বিভিন্ন যানবাহনের চালকরাও। বাস চালক হাফিজ মিয়া বলেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতি জ্বলে থাকায় আমরা বিভ্রান্তের মধ্যে পড়ি। লাল বাতি জ্বলে ওঠে, সময়সীমা দেখালেও পরে আবার একই সময় প্রলম্বিত হয়।

মাইক্রোবাস চালক আসাদুজ্জামান সেখ বলেন, সিগন্যাল কখন লাল হয় আবার কখন সবুজ হয়, কিছুই বুঝি না। একবার দেখি ৩০ সেকেন্ড টাইম উঠল, টাইম শেষ হলে তো সিগন্যাল সবুজ হওয়ার কথা। কিন্তু না, আবারও ৩০ সেকেন্ড টাইম ওঠে। এটা কেমন সিস্টেম!

এর আগে ২৪ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউয়ের গ্রিন হেরাল্ড স্কুলের সামনে ‘পুশ বাটন ট্রাফিক সিগন্যাল’ বসানো হয় ডিএনসিসির পক্ষ থেকে। দেশে প্রথমবারের মতো আধুনিক এই সিগন্যাল চালুর এক মাস এটি ব্যবহারের কোনো নির্দেশিকা ছিল না। মানুষকে ব্যবহার বিধি শেখাতে গত ১৮ নভেম্বর সিগন্যাল পয়েন্টের পাশে পুশ বাটন ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ওই সময় ডিএনসিসির তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন পথচারী ও চালকদের ট্রাফিক আইন ও পুশ বাটন সম্পর্কে অবগত করতে লিফলেট বিতরণ করেন।

লিফলেট বিতরণকালে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ডিজিটাল পুশ বাটন ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দুই শিফটে ছয় জন, ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে চার জন এবং স্কুলের পক্ষ থেকে দুই শিফটে চার জন কাজ করবে। তারা পথচারীদের নিরাপদে পারাপার হতে সহযোগিতা করবেন।

মেয়রের সেই বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিতে রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে দায়িত্বরত কর্মী বা পুলিশের দেখা মিলেনি। গ্রিন হেরাল্ড স্কুলের নিরাপত্তাকর্মী মাহবুব বলেন, গত বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে স্কুলটি বন্ধ। ফলে পুলিশ সদস্যরা মাঝে মধ্যে এসে ঢুঁ মেরে যাচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে যে কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল এক মাস ধরে তারাও আসছে না। আর স্কুল বন্ধ থাকায় স্কুলের নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ করছেন না।

আরও পড়ুন : পাটে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ চান পরমাণুবিজ্ঞানী মোবারক

পুশ বাটন পরিদর্শন ও সচেতনতা কার্যক্রমের সময় আতিকুল ইসলাম আরও বলেছিলেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে পুশ বাটনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে পথচারী বা চালকরা সিগন্যাল না মানলে জরিমানা করা হবে।

মেয়রের এই বক্তব্য বাস্তবায়নের আলামতও চোখে পড়েনি ওই সিগন্যাল পয়েন্ট এলাকায়।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন সিগন্যালটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, সিগন্যালটির ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্কুল, সিটি করপোরেশনের লোক এবং পুলিশ থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমি ওখানে গিয়ে কাউকেই দেখিনি।

ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, সিগন্যালটি কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার জন্য করা হয়নি। আর আমাদের সমস্যা এখানেই আমরা নিয়ম করি ঠিকই, কিন্তু সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারি না।

সিগন্যালটির দায়িত্বে থাকা উত্তর সিটির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরহাদ বলেন, পুশ বাটন পদ্ধতি তার নিয়মে চলছে না, করপোরেশনের লোকও সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন না— এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। তবে সত্যিই এমন হয়ে থাকলে এটি সমাধানের জন্য দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ওডি/এমআই/টিএএফ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড