• বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গাছের খাদ্য নিয়ন্ত্রণে অভিনব আবিষ্কার আমিনুলের

  মো. আকাশ, সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:২২
গাছের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ

বোতলের মাধ্যমে গাছে পরিমিত পুষ্টি উপাদান সরবরাহ এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে গাছের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন নারায়ণগঞ্জে সিদ্ধিরগঞ্জের আমিনুল ইসলাম। তার বসবাসরত বাড়ির খালি জায়গায় এবং ছাদের বিভিন্ন গাছে তার উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি ব্যবহার করে লেবু, কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন ফসলে লাভের মুখ দেখেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (২৯ ডিসেম্বর) বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের পূর্ব সাহেবপাড়া এলাকার আল হেরা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল সংলগ্ন তার বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে এমনই চিত্র চোখে পড়ে। সরেজমিনে দেখা যায়,তার উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি ব্যবহার করার মাধ্যমে একটি গাছে সাধারণত যতসংখ্যক ফল পাওয়া যায় এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ফল পাচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন গাছপালা নিয়ে প্রায় ১০ বছর গবেষণার পর তিনি এই দুটি পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হোন। দীর্ঘ এই সময় গবেষণা করতে গিয়ে আমিনুলের ১ লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়েছে। আমিনুলের ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, স্কুলজীবন থেকেই তার গবেষণার প্রতি অন্যরকম আগ্রহ ছিল। পাশাপাশি ছোটবেলা থেকে সে প্রচুর পরিমানে অনেক গাছ লাগাতো কিন্তু কিছু গাছে ফল আসতো আবার কিছু গাছে ফল হতো না। তখন তিনি এর কারণ বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। হঠাৎ একদিন সে খেয়াল করলেন, টয়লেটের আশেপাশের গাছগুলো তুলনামূলক বেশি মোটা ও বড় হয়ে থাকে। তখন তার এই কারণ বের করতে গিয়ে তিনি দুটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আমিনুলের জন্ম কুমিল্লার মুরাদনগরে হলেও তার বেড়ে উঠা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। ২০০৪ সালে বর্ণমালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি দেন। ২০০৮ সালে ইসলামিয়া ব্যাংক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন।

উদ্ভাবনের বিষয়ে আমিনুল বলেন, বোতলের মাধ্যমে গাছে পরিমিত পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে তিনি প্রতিটি গাছে দুটি করে বোতল লাগিয়েছেন। গাছে একটি বোতলের মাধ্যমে এনার্জী এবং আরেকটি বোতলের মাধ্যমে ফুল-ফলের উপাদান দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সে যদি গাছে ফুল-ফল চায় তাহলে ওই বোতলে পরিমিত মাত্রায় পানি দিতে হবে আবার যদি সে গাছের এনার্জী চায় তাহলে এনার্জীর বোতলে পরিমিত মাত্রায় পানি দিবে। তিনি গাছের এনার্জীর জন্য তৈরীকৃত বোতলে মুরগীর গোবর, মুরগীর নাড়িভুড়ি, শাকসবজির ফেলে দেওয়া অবশিষ্ট অংশ ব্যবহার করেছেন। তবে যে কেউ চাইলে শুধু মুরগীর নাড়িভুড়ি বেশি করে ব্যবহার করে গাছের এনার্জী বোতল বানাতে পারবে।

অপরদিকে গাছের ফুল ফলের জন্য তৈরীকৃত বোতলে তিনি শুধু কলার খোসা ব্যবহার করেছেন। দুটি বোতলের সরু প্রান্তটি গাছের মাটির সাথে যুক্ত করা হয়েছে এবং অপর প্রান্তটির মুখ খোলা রাখা হয়েছে পানি দেওয়ার জন্য। অর্র্থাৎ বোতলের উপরের প্রান্তে পানি দেওয়া হলে তা বোতলের মধ্যে থাকা উপাদানগুলোর সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে মাটিতে যায়। এর ফলে মাটি পুষ্টি উপাদান সঠিকমতো পাবে। বিনা খরচেই যে কেউ এটি তৈরী করতে পারবে। ১০-১৫ বছরেও এইসব প্লাস্টিকের বোতল নষ্ট হয় না তাই এই পদ্ধতিটি দীর্ঘদিন গাছে ব্যবহার করা যায়।

তার দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি হলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ করা। এর ফলে যেকোনো স্থান থেকে গাছের খাবার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এই প্রযুক্তিটি তৈরী করতে সে প্রথমে তিনটি অংশ তৈরী করেছে। রিসিভার অংশ, মেকানিক্যাল অংশ ও ইলেকট্রনিক্স অংশ। যেকোনো ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের মাধ্যমে গাছে লাগানো বোতলদুটোতে পরিমিত মাত্রায় পানি দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এটি প্রথম পদ্ধতির চেয়ে তুলনামূলক কিছুটা ব্যয়বহুল। আমিনুল ইসলাম বলেন, গাছ অতিরিক্ত খাবার পেলে মরে যায়। উচ্চবিত্তরা অনেক টাকা খরচ করে ছাদবাগান করলেও সঠিক খাদ্যের অভাবে আশানুরূপ ফল পায় না। তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি প্রচুর পরিমানে গাছ লাগানোর উৎসাহ পাবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি জানান, বর্তমানে তার অনুবীক্ষণ যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া তার ল্যাপটপও ঠিকমতো কাজ করে না। সরকার থেকে অনুদান পেলে সে নতুন অনুবীক্ষণ যন্ত্র এবং ল্যাপটপ কিনবে। তাহলে সে তার গবেষণা আরও বড় পরিসরে করতে পারবে বলে জানান। আমিনুলের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর মো. জাকারিয়া জানান, সে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়েই গবেষণা করতো। অনেক মেধা খাটিয়ে আমার ছেলে এই প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছে। সারাদিন যখন আমিনুলকে গবেষণা করতে দেখতাম আমি প্রথম প্রথম তাকে বাধা দিয়েছিলাম। কারণ এগুলো করে কোনো কাজ হবে না। শুধু শুধু সময় নষ্ট হবে। কেউতো তার কাজের সঠিক মূল্যায়ন করবে না। কিন্তু তার গবেষণা প্রতি অনড় মনোভাব দেখে পরবর্তীতে আর বাধা না দিয়ে তাকে এইসব কাজে আরো উৎসাহ দেই। সে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র হয়ে গাছপালা নিয়ে গবেষণা করতো। অনেকেই নিজের বাড়ির ছাদে গাছ লাগানোর পরও সঠিক পরিচর্যার অভাবে এগুলো মারা যায়। আমার ছেলের উদ্ভাবিত পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করার মাধ্যমে সে সেবা করার সুযোগ পাবে। এই দোয়া আমিও পাবো।

আমিনুলের প্রতিবেশী মো. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, আমিনুল ইসলাম একজন তরুণ গবেষক। তার উদ্ভাবনী নিয়ে আমরা অনেক আশাবাদী। এইসব উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে যাবে। এই এলাকার মানুষ তাকে তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবেই চিনে থাকে। প্রযুক্তির মাধ্যমে গাছের ফলন বৃদ্ধি পাওয়ার মতো এইসব নতুন নতুন আইডিয়া সৃষ্টি করার মাধ্যমে আমিনুল আমাদের সবার কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এভাবে যদি বাংলাদেশের গবেষকদের সরকারী অথবা বেসরকারীভাবে সঠিক পৃষ্ঠপোষক করা হয় তাহলে দেশ আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। প্রকৃতির প্রতি আমাদের যে আগ্রহ আমিনুলের আবিষ্কারের মাধ্যমে সেটার কারণে আরো বৃদ্ধি পাবে। গোলাম মোস্তফা নামের আরেক প্রতিবেশী জানান, ছোটবেলা থেকেই আমিনুল খুব মেধাবী। গাছপালার প্রতি ওর যে ঝোঁক এখনকার প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের গাছপালার প্রতি সে আগ্রহ দেখা যায় না। তার দেখাদেখি অনেকেই গাছপালার প্রতি আগ্রহ জন্মাবে বলে আমি মনে করি।

নারায়ণগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. আব্দুল মাজেদ জানান, আমিনুল ইসলাম গাছের খাদ্য নিয়ন্ত্রণে আসলেই এক সুন্দর অভিনব কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। যার মাধ্যমে খাদ্য দ্রুত গ্রহণ করে একটি গাছ থেকে দ্রুত ফল আসে এবং ফলটা পুষ্ট ও রসালো হয়। তিনি প্রায় ১০ বছর এই বিষয়টির উপর গবেষণা করেছেন। আমরা সেজন্য তার প্রশংসা করেছি। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন যে গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে আমিনুলের এই গবেষণার বিষয়টি আমরা অবহিত করেছি। যেনো তারা এই প্রযুক্তিটা গ্রহণ করার মাধ্যমে গবেষণা করে দেশে আরো সম্প্রসারিত করতে পারে। তাছাড়া সরকার থেকে আমাদের কোনো প্রণোদনা দেওয়া হলে প্রণোদনার একটি অংশ আমিনুলকে দেওয়া হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড