• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হাদিসের আলোকে নবিজিকে গালমন্দ করার শাস্তি

  ধর্ম ও জীবন ডেস্ক

২১ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:০২
মুহাম্মাদ (সা.)
ছবি : প্রতীকী

প্রথম হাদিস

ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে,

أَنَّ يَهُودِيَّة كَانَتْ تَشْتِمُ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- وَتَقَعُ فِيهِ فَخَنَقَهَا رَجُلٌ حَتَّى مَاتَتْ فَأَبْطَلَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- دَمَهَا

‘এক অভিশপ্ত ইহুদি মহিলা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত। ফলে একলোক অভিশপ্ত মহিলাটাকে গলা টিপে হত্যা করে ফেলে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন।’ [আবু দাউদ, আসসুনান : ৪৩৬৪]

হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ, ইবনু বাত্তাহ। ইমাম আহমাদ হাদিসটি দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। আরেক বর্ণনায় এসেছে, হত্যাকারী লোকটি অন্ধ ছিলেন। হাদিসটির সনদ জাইয়িদ ও মুত্তাসিল। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। আর যদি মুরসালও হয়, তবুও হাদিসটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রমাণযোগ্য হবে। কেননা ইমাম শাবি বর্ণিত মুরসাল বর্ণনাগুলোও মুহাদ্দিসগণের নিকটে সহিহ। কারণ তার যত মুরসাল বর্ণনা আছে, সবই সহিহ হিসেবে প্রমাণিত।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করার কারণে অভিশপ্ত ইহুদি নারীকে কতল করার ব্যাপারে হাদিসটি একেবারেই দ্ব্যর্থহীন। আর এই হাদিসটি আরও স্পষ্টভাবে ঐ সকল জিম্মি ও মুসলিম নারী-পুরুষের রক্ত হালাল বানানোর দলিল, যারা নবি  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে।

দ্বিতীয় হাদিস

ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ‘এক অন্ধ লোকের একটি উম্মু ওয়ালাদ দাসী—যে দাসীর গর্ভে মালিকের সন্তান থাকে—ছিল। সে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত, তাকে নিয়ে কটূক্তি করত। এক রাতে দাসীটি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে কটু মন্তব্য করছিল। তো অন্ধ লোকটি ধারালো একটি ছুরি নিয়ে দাসীর পেটে বিঁধিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চেপে রেখে মৃত্যু নিশ্চিত করল। এই ঘটনা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনানো হলে তিনি ওই দাসীর রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন।’ [আবু দাউদ, আসসুনান : ৪৩৬৩]

আবু দাউদ ও নাসায়ি রাহিমাহুমাল্লাহ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। হতে পারে এই ঘটনাটা হুবহু প্রথম ঘটনা। তাহলে এই ঘটনার বাঁদিটাও ইহুদি হবে। কাযি আবু ইয়ালাসহ অন্যান্য আলিমদের অভিমত এটাই। তারা উভয় হাদিসের ঘটনাকে একই ঘটনা মনে করেন। অথবা হতে পারে এটা ভিন্ন আরেকটা ঘটনা।

ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 

وفيه بيان ان ساب النبي ﷺ مقتول وذلك أن السب منها لرسول الله ﷺ ارتداد عن الدين

‘এ হাদিস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহর নবির গালমন্দকারীকে হত্যা করা হবে। কারণ, গালমন্দ বা অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করা ইরতিদাদ আদদীন (ইসলাম পরিত্যাগ)।’ [খাত্তাবি, মায়ালিমুস সুনান : ৩/২৯৬]

এ দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম খাত্তাবি মহিলাটি মুসলিম ছিল বলে মনে করতেন। কেননা ‘ইরতিদাদ’ হলো ইসলাম ত্যাগের নাম। অথচ হাদিসের মধ্যে এমন বুঝার কোন দলিল নেই। বরং হাদিসের বাহ্য দিক হলো মহিলাটা কাফির ছিল। কেননা হাদিসের মধ্যে উল্লেখ আছে, দাসীটার মনিব তাকে এমন ঘৃণ্য কাজ থেকে বেশ কয়েকবার নিষেধ করেছিলেন। সুতরাং দাসীটা যদি মুরতাদই হতো তাহলে তার সাথে সহবাস করা ও দীর্ঘ সময় ধরে নিজের অধিনে রাখা কোনোমতেই মুসলিম মনিবের জন্য বৈধ ছিল না।

তৃতীয় হাদিস

হাদিসটি হলো ইহুদি কবি ও গোত্রনেতা কাব ইবনু আশরাফের ঘটনা সম্বলিত বর্ণনা। এটি একটি প্রসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ ঘটনা। একবার নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,

«مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الأَشْرَفِ فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ»

‘কে আছো কাব ইবনু আশরাফের জন্য (যে তার গর্দান ওড়িয়ে দেবে)? কেননা সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে।’

তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি চান আমি তাকে হত্যার দায়িত্ব নিই?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তখন সাহাবি বললেন, ‘তাহলে আমাকে কিছু কৌশলী কথা বলার সুযোগ দিন।’ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা অভিশপ্ত ইহুদি কাবের কাছে এসে বললেন, এই লোকটা (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো এখন আমাদের কাছে সাদাকাহ চাচ্ছে। লোকটা আমাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে।’ কাব এই কথা শুনে তাল মিলিয়ে বলল, শুধু কি তাই, তোমরা তার ব্যাপারে আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।’ (এভাবে তারা কাবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।) পরিশেষে তারা তাকে হত্যা করেন। [বুখারি, আসসাহিহ : ৩৮১১, মুসলিম, আসসাহিহ : ৪৭৬৫]

এ হাদিস থেকে ইমাম শাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ দলিল পেশ করেছেন যে, কোন যিম্মি যখন নবিজিকে গালমন্দের মতো অমার্জনীয় কাজে জড়িয়ে পড়বে তার শাস্তি হবে হত্যা।

ইহুদি কাব ইবনু আশরাফ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিন্দা গাইত আর নোংরা নোংরা অপবাদ দিত ফলে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার আহ্বান জানান। তার দলবল নবিজির কাছে এসে বলল, ‘আমাদের নেতা কাবকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে।’ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘অন্যদের মতো সেও যদি সংযত থাকত তাহলে এমন ক্ষতির মুখোমুখি হত না। সে আমাদেরকে কষ্ট দিয়েছে, আমাদের ব্যাপারে কটূ মন্তব্য করেছে। তোমাদের কেউ যদি এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তাহলে তরবারিই তার ফায়সালা করবে।’ 

এ পর্যায়ে ইহুদিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কাব ইবনুল আশরাফের হত্যার পর থেক তারা পুরোপুরি সাবধানী হয়ে উঠে। এমন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে শুরু করে।

কাব ইবনুল আশরাফ তো ‘মুয়াহিদ’ বা নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। যখন গালমন্দের মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ল, নোংরা- অশালীন ও মানহানিকর মিথ্যা-বানোয়াট কথা ছড়াতে লাগল তখন তার নিরাপত্তা বিধান সে নিজেই ভেঙে দিল। এর কারণ হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ»
‘কেননা সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে।’

সুতরাং যে কেউই আল্লাহ ও তার রাসুলকে কষ্ট দেয় তার শাস্তি হলো তাকে হত্যা করা হবে। আর মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে গালমন্দ করা আল্লাহ ও তার রাসুলকে কষ্ট দেয়। সুতরাং এমন জঘন্য কর্মকান্ডে কেউ জড়ালে সে হত্যার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে।

চতুর্থ হাদিস

আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ سَبَّ الأَنْبِيَاءَ قُتِلَ، وَمَنْ سَبَّ أَصْحَابِي جُلِدَ

‘যে ব্যক্তি কোন নবিকে গালি দেয় তার শাস্তি হলো তাকে হত্যা করা হবে, আর যে ব্যক্তি আমার কোনো সাহাবিকে গালমন্দ করে তার শাস্তি হলো তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।’ [তাবারানি, মুজামুস সাগির : ৬৫৯]

হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আলখাল্লাল, আলআযাজিয়্যি ও আলহারাওয়ি। হাদিসের বাহ্য থেকে এটাই বোঝা যায় যে, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে হবে, তাওবার সুযোগ দেয়া হবে না। শাইখুল ইসলাম বলেন, এ হাদিসের একজন বর্ণনাকারী হলো আবদুল আযিয ইবনু হাসান ইবনু যাবালাহ, তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী।

পঞ্চম হাদিস

আবদুল্লাহ ইবনু কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ আবু বারযাহ আসলামি থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি বিশ্রী ভাষা ব্যবহার করেন। আমি আবু বকরকে বললাম, আমি কি তাকে হত্যা করে ফেলব? তখন আবু বকর আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘এমন হুকুম তো নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারী ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়।’ [নাসায়ি, সুনানুল কুবরা : ৩৫৩৪]

আরেক বর্ণনায় আছে, এক লোক আবু বকর রাযিয়াল্লাহ আনহুকে গালমন্দ করলে তিনি উক্ত কথাটি বলেন। আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ সহিহ সনদে তার সুনানগ্রন্থে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।[আবু দাউদ, আসসুনান : ৪৩৬৫]

আলিমদের বিরাট একটি জামায়াত এ হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করেছেন যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারীর শাস্তি নিশ্চিত হত্যা। এই অভিমত পোষণকারীদের মধ্যে আছেন ইমাম আবু দাউদ, ইসমাইল ইবনু ইসহাক, আবু বকর আবদুল আযিয এবং কাযি আবু ইয়ালাসহ বহু উলামা কিরাম। এই হাদিসটির ফায়দা হলো, যে ব্যক্তি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে তাকে হত্যা করা বৈধ। কাফির-মুসলিম এক্ষেত্রে সমান।

মূল (আরবি) : শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.)
সংক্ষেপায়ন : ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আলি ইবনু মুহাম্মাদ আলবা’লি (রহ.)
বাংলা রূপান্তর : আবু তালহা ও ইবনু যাকির। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড