• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মহাকালের শপথ [পর্ব-০৩]

ঈমানের মূল ভিত্তিসমূহ

  মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির

১২ অক্টোবর ২০১৯, ১২:২১
Al-asr03
ছবি : প্রতীকী

ঈমানের রুকন বা মৌলিক ভিত্তি হলো ৬টি—১. আল্লাহর প্রতি ঈমান, ২. ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান, ৩. কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, ৪. রাসুলগণের প্রতি ঈমান, ৫. পরকালের প্রতি ঈমান, ৬. তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান। 

•    আল্লাহর প্রতি ঈমান

আল্লাহর প্রতি ঈমানের মূলকথা হচ্ছে আল্লাহর তাওহিদের প্রতি ঈমান আনা। তাওহিদ অর্থ এককত্ব। তাওহিদকে আলিমগণ বোঝানোর সুবিধার্থে ৩ ভাগে বিন্যস্ত করেছেন। ক. রুবুবিয়্যাহ, খ. উলুহিয়্যাহ, গ. আসমা ওয়াস সিফাত। এই তিন ক্ষেত্রেই আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। এত্থেকে কোনো অংশ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য নির্ধারণ করাটাই হলো শিরক। 

১. রুবুবিয়্যাহ : এই প্রকার তাওহিদকে আবার দু’ভাগে বিন্যস্ত করা হয়। ক. তাকবিনি তথা সৃষ্টি ও প্রতিপালন, রিযিক প্রদান, সুস্থতা কিংবা জীবন ও মৃত্যু দানসহ মহাজাগতিক যেসমস্ত ব্যাপারাদি রয়েছে, যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ক্ষমতা নেই। না কোনো নবি-রাসুল, না কোনো ওলি-আওলিয়া। খ. তাশরিয়ি তথা আইন প্রণয়ন, শরিয়াহ বা জীবনবিধান প্রদান, শাসন-কর্তৃত্ব, হাকিমিয়্যাহ, সার্বভৌমত্ব এসবই আল্লাহর অধিকার। এটাকে অনেকে তাওহিদ ফিত-তাশরি বা তাওহিদুল হাকিমিয়্যাহও বলে থাকেন। 

২. উলুহিয়্যাহ : ইবাদাত ও আনুগত্য সংক্রান্ত যত ব্যাপারাদি রয়েছে এসবেরই একচ্ছত্র অধিকার মহান আল্লাহর। যেমন ক. আল-ইসলাম তথা আত্মসমর্পণ করা। খ. আল-ইহসান তথা নিষ্ঠার সাথে কাজ করা। দয়া-দাক্ষিণ্য ও সহানুভূতি প্রদর্শন, উপকার সাধন করা। ঘ. আদ-দুয়া তথা প্রার্থনা, আহ্বান করা। ঙ. আল-খাওফ তথা ভয়-ভীতি। চ. আর-রাজা তথা আশা-আকাঙ্ক্ষা। ছ. আত-তাওয়াক্কুল তথা নির্ভরশীলতা, ভরসা করা। জ. আর-রাগবাহ তথা অনুরাগ, আগ্রহ। ঝ. আর-রাহবাহ তথা ভয় ভীতি। ঞ. আল-খুশু তথা বিনয়-নম্রতা। ট. আল-খাশিয়াত তথা অমঙ্গলের আশংকা। ঠ. আল-ইনাবাহ তথা আল্লাহর অভিমুখী হওয়া, তাঁর দিকে ফিরে আসা। ড. আল-ইস্তিয়ানাহ তথা সাহায্য প্রার্থনা করা। ঢ. আল-ইস্তিয়াযাহ তথা আশ্রয় প্রার্থনা করা। ণ. আল-ইস্তিগাসাহ তথা বিপদ উদ্ধারের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা। ত. আয-যাবাহ তথা কুরবানি বা উৎসর্গ করা। থ. আন-নাযর তথা মান্নত করা ইত্যাদি। 

৩. আসমা ওয়াস সিফাত : তথা নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে আল্লাহ এক। এ প্রকার তাওহিদের মূল কথা হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহয় আল্লাহ তায়ালার যেসমস্ত নাম ও গুণের বর্ণনা এসেছে, সেগুলো কোনো প্রকার বিকৃতিকরণ, বাতিলকরণ, ধরণ বর্ণনা, আকৃতি নির্ধারণ, সাদৃশ্য প্রদান ব্যতীত ঈমান আনা। এ সমস্ত নাম ও গুণের ওসিলায় দুয়া করা। 

•    ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান

ফিরিশতারা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। তাদের সৃষ্টি উপাদান হলো নুর। তারা মানবীয় সমস্ত দুর্বলতার ঊর্ধ্বে। তাদের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তারা আল্লাহর ক্ষমতায় অংশীদার নন, বরং তাঁর হুকুমের অনুসরণকারী মাত্র। 

•    কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান

আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে মানুষের পথপ্রদর্শনের লক্ষ্যে নবি-রাসুলদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তাতে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের আকিদাহ-ইবাদাত সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াবলির পথনির্দেশনা ছিল। সমস্ত কিতাব ও সহিফার প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। বিশেষ করে চারখানা প্রধান কিতাব ও সহিফার প্রতি। তবে মনে রাখতে হবে যে, সেগুলো ছিল নিতান্তই কোনো জাতি-গোষ্ঠী কেন্দ্রীক, সামগ্রিক নয়। আল্লাহ তায়ালা শেষনবি মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কুরআনকেই একমাত্র সার্বজনীন, সামগ্রিক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। 

•    রাসুলগণের প্রতি ঈমান

রাসুলগণের প্রতি ঈমানের অর্থ হলো, সুদৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য তাদের মধ্য হতে একজনকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন। সকল রাসুল সত্যবাদী, সত্যায়নকারী, পুণ্যবান, সঠিক পথের দিশারী, তাকওয়াবান ও বিশ্বস্ত। আল্লাহ তাঁদেরকে যা কিছু দিয়ে প্রেরণ করেছেন তারা তা পরিপূর্ণভাবে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। কোন অংশ গোপন করেননি বা পরিবর্তন করেননি। নিজে থেকে কোন সংযোজন বা বিয়োজন করেননি।  সমস্ত নবি-রাসুলদের দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল একটাই—তাওহিদ।  কিন্তু শরিয়াহ তথা ইবাদাত-বন্দেগি ও আইন-কানুনে পার্থক্য ছিল।  রাসুলদের মধ্যে যাদের নাম আমরা জানতে পেরেছি তাদের নামসমূহের প্রতি ঈমান আনা। যেমন মুহাম্মদ, ইবরাহিম, মুসা, ঈসা, নুহ (আলাইহিমুস সালাম)। আর যাদের নাম জানা যায়নি তাদের প্রতি এজমালিভাবে ঈমান আনা।  আর সর্বশেষ রাসুল হচ্ছেন আমাদের নবি মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর পরে আর কোন নবি বা রাসুল নেই।  আমরা পূর্বেকার নবি-রাসুলদের স্বীকৃতি দেবো, কাউকেই অস্বীকার করব না। কিন্তু আমরা আমল করব আমাদের নিকট প্রেরিত রাসুলের শরিয়তের আলোকে। 

•    পরকালের প্রতি ঈমান

পরকালের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হলো, মৃত্যু ও এর পরবর্তী জীবন, কবরের শাস্তি ও শান্তি, পূনরুত্থান, হাশর, মিযান, হিসাব-নিকাশ, শাফায়াত, হাওযে কাওসার, পুলসিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ও মহান রবের দিদারসহ কুরআন ও সুন্নাহয় বিধৃত পরকাল সংক্রান্ত বিষয়াবলির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। শুধু বিশ্বাসই নয়, বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলনও জরুরি। বস্তুত পরকালে বিশ্বাস এমন একটি ব্যাপার যা ব্যক্তিকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। এই বিশ্বাসের অনুপস্থিতিতে সমাজ কতটা জঘন্য হতে পারে আজকের পশ্চিমাবিশ্ব তার বাস্তব উদাহরণ। বস্তুবাদ আমাদেরকে উন্নয়নের মোড়কে আবৃত নতুন এক জাহিলি সমাজ উপহার দিয়েছে। এর বিপরীতে পরকালে বিশ্বাসের চেতনাই পারে টেকসই উন্নয়নশীল সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণ করতে। 

•    তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান

তাকদির মহান রবের এক রহস্য। আল্লাহ তায়ালার আদল ও ইনসাফের দিকে খেয়াল রেখে আমাদের উচিত তাকদিরের প্রতি অকুন্ঠ বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা, সমস্ত সৃষ্টির কর্মেরও স্রষ্টা। তিনি মানুষকে সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই তার তাকদির নির্ধারণ করেছেন। দুনিয়াতে মানুষকে প্রাথমিক ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, ভালো-মন্দ উভয়টি বান্দাকে জানিয়ে দিয়েছেন, এরপরও চূড়ান্তভাবে কোনো কিছুই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয়। মানুষ সসীম, মানুষের চিন্তাশক্তিও সসীম, আর আল্লাহ হলেন অসীম। সসীম কিছু দিয়ে অসীম কোনো কিছুকে পুরোপুরি আয়ত্ব করা যায় না।

চলবে ইনশাআল্লাহ। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড