• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

উম্মাহর নক্ষত্ররাজি (সাহাবাচরিত)

আবু বকর রা. সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য (২য় ভাগ)

  মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৫:৫৯
Hera_odhikar
ছবি : হেরা গুহা; যেখানে হিজরতের সময় আশ্রয় নিয়েছিলেন নবিজি, সঙ্গে ছিলেন আবু বকর।

মক্কায় থাকাকালীন নবিজির অভ্যাস ছিল প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আবু বকরের বাড়িতে যাওয়া। কোন বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হলে তার সাথে পরামর্শ করা। রাসুল (সা.) দাওয়াতের মিশন নিয়ে কোথাও গেলে আবু বকরও সাধারণত সঙ্গে থাকতেন।

নবিজির হিজরতের সেই কঠিন মুহূর্তে আবু বকরের আত্মত্যাগ, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য ও বন্ধুত্বের কথা ইতিহাসে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর সাহচর্যের কথা তো পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে। ইতিহাসবিদ ইবনু ইসহাক বলেছেন, ‘আবু বকর নবিজির কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলে নবিজি তাঁকে বলতেন, তুমি তাড়াহুড়া করো না। আল্লাহ হয়তো তোমাকে একজন সহযাত্রী জুটিয়ে দেবেন। আবু বকর একথা শুনে ভাবতেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. হয়তো নিজের কথাই বলছেন। তাই তিনি তখন থেকেই দুটো উট কিনে অত্যন্ত যত্ন সহকারে পুষতে থাকেন। এই আশায় যে, হিজরতের সময় হয়তো কাজে লাগতে পারে।’

উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) দিনে অন্ততঃ একবার আবু বকরের বাড়িতে আসতেন। যে দিন হিজরতের অনুমতি পেলেন সেদিন দুপুরে আমাদের বাড়িতে আসলেন, এমন সময় কখনো তিনি আসতেন না। তাঁকে দেখামাত্র আবু বকর বলে উঠলেন, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে। তা নাহলে এমন সময় নবিজি আসতেন না। তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলে আবু বকর তাঁর খাটের একধারে সরে বসলেন। আবু বকরের বাড়িতে তখন আমি আর আমার বোন আসমা ছাড়া আর কেউ ছিল না। আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কী হয়েছে? নবিজি বললেন, আল্লাহ আমাকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, আমিও কি সঙ্গে যেতে পারবো? নবিজি বললেন, হ্যাঁ, যেতে পারবে। আয়িশা বলেন, সেদিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যে এত কাঁদতে পারে। আবু বকর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এই দেখুন, আমি এই উট দুটো এই কাজের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছি।’

তাঁরা আবদুল্লাহ ইবন উরায়কাতকে পথ দেখিয়ে নেয়ার জন্য ভাড়া করে সাথে নিলেন। রাতের আঁধারে তারা আবু বকরের বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে বের হলেন এবং মক্কার নিম্নভূমিতে ‘সাওর’ পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। হাসান বসরি (রহ.) থেকে ইবন হিশাম বর্ণনা করেন, তাঁরা রাতে সাওর পর্বতের গুহায় পৌঁছেন। নবিজি প্রবেশের আগে আবু বকর গুহায় প্রবেশ করলেন। সেখানে কোন হিংস্র প্রাণী বা সাপ-বিচ্ছু আছে কিনা তা দেখে নিলেন। রাসুলুল্লাহকে বিপদমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি এরূপ ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

মক্কায় উম্মুল মুমিনিন খাদিজার ওফাতের পর রাসুলকে যখন আবু বকর রা. বিমূর্ষ দেখলেন, নিজ কন্যা আয়িশাকে নবিজির সাথে বিয়ে দেন। মোহরের অর্থও নিজেই পরিশোধ করেন।

হিজরতের পর সকল অভিযানেই তিনি নবিজির সাথে অংশগ্রহণ করেন। কোন একটি অভিযানেও অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হননি। তাবুক অভিযানে তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী। এ অভিযানের সময় নবিজির আবেদনে সাড়া দিয়ে বাড়িতে যা কিছু অর্থ-সম্পদ ছিল সবই তিনি নবিজির হাতে তুলে দেন। আল্লাহর রাসুল সা. জিজ্ঞেস করেন, ‘ছেলে-মেয়েদের জন্য বাড়িতে কিছু রেখেছো কি?’ জবাব দিলেন, ‘তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসুলই যথেষ্ট।’

মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরিতে প্রথম ইসলামি হজ আদায় উপলক্ষে নবিজি (সা.) আবু বকরকে ‘আমিরুল হজ’ তথা মুসলিমদের হজ কাফেলার নেতা হিসেবে নিয়োগ করেন। নবিজির অন্তিম মূহুর্তে তাঁরই নির্দেশে মসজিদে নববির নামাযের ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। 

নবিজির ওফাতের পর আবু বকর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। ‘খলিফাতু রাসুলিল্লাহ’ তথা ‘রাসুলের প্রতিনিধি’ এ লকবটি কেবল তাঁকেই দেওয়া হয়। পরবর্তী খলিফাদের ‘আমিরুল মুমিনিন’ বা ‘খলিফাতুল মুসলিমিন’ উপাধি দেওয়া হয়।

ব্যবসাই ছিল তাঁর পেশা। ইসলাম-পূর্ব যুগে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। ইসলাম গ্রহণের পরেও জীবিকার প্রয়োজনে এ পেশা চালিয়ে যেতে থাকেন। খলিফা হওয়ার পর খিলাফতের গুরু দায়িত্ব কাঁধে পড়ায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়াটা মুশকিল হয়ে পড়ে। উমর ও আবু উবাইদার পীড়াপীড়িতে মজলিসে শুরার সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রয়োজন অনুপাতে ‘বাইতুল মাল’ থেকে ন্যূনতম ভাতা গ্রহণ করতে স্বীকৃত হন। যার পরিমাণ ছিল বাৎসরিক আড়াই হাজার দিরহাম। তবে মৃত্যুর পূর্বে তাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ‘বাইতুল মাল’ থেকে গৃহীত সমুদয় অর্থ ফেরতদানের নির্দেশ দিয়ে যান।

নবিজির ওফাতের সংবাদে সাহাবাগণ যখন হতভম্ব, তাঁরা যখন চিন্তাই করতে পারছিলেন না, রাসুলের ওফাত হতে পারে, এমনকি হযরত উমর (রা.) কোষমুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে ঘোষণা করে বসেন, ‘যে বলবে নবিজির ওফাত হয়েছে, তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেবো।’ এমন এক ভাব-বিহ্বল পরিবেশেও আবু বকর রা. ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল। সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে তিনি ঘোষণা করেন, ‘যারা মুহাম্মাদের ইবাদাত করতে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মাদ (সা.) মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু যারা আল্লাহর ইবাদাত কর তারা জেনে রাখ আল্লাহ চিরঞ্জীব-তাঁর মৃত্যু নেই।’ 
তারপর এ আয়াত পাঠ করেন,

‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে বহু রাসুল অতিবাহিত হয়েছে। তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন তাহলে তোমরা কি পেছনে ফিরে যাবে? যারা পেছনে ফিরে যাবে তারা আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শিগগিরই আল্লাহ তাদের প্রতিদান দেবেন।’ [সুরা আলি ইমরান, ৩ : ১৪৪]

আবু বকরের মুখে এ আয়াত শোনার সাথে সাথে লোকেরা যেন সম্বিত ফিরে পেল। তাদের কাছে মনে হল এ আয়াত যেন তারা এই প্রথম শুনছে। এভাবে নবিজির ইন্তিকালের সাথে সাথে প্রথম যে মারাত্মক সমস্যাটি দেখা দেয়, আবু বকরের দৃঢ় হস্তক্ষেপে ব্যাপারটির পরিসমাপ্তি ঘটে।

নবিজির কাফন-দাফন তখনও সম্পন্ন হতে পারেনি। এরই মধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্তির বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করলো। মুসলিমরা নেতৃত্বশূন্য থাকতে পারে না। নেতাবিহীন একটি দিনও কাটাতে পারে না। বৈশ্বিক একক নেতৃত্বই তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখে সবসময়। কিন্তু নবিজির ওফাতের পর কে হবেন মুসলিমজাহানের নেতা, দ্বন্দ্ব শুরু হয় সেটা নিয়ে। মদিনার জনগণ, বিশেষত আনসাররা ‘সাকিফা বনু সায়দা’ নামক স্থানে সমবেত হয়। তারা দাবি করে, যেহেতু আমরা নবিজিকে আশ্রয় দিয়েছি, নিজেদের জান-মালের বিনিময়ে দুর্বল ইসলামকে সবল ও শক্তিশালী করেছি, আমাদের মধ্য থেকে কাউকে নবিজির স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। মুহাজিরদের কাছে এ দাবি গ্রহণযোগ্য হলো না। তারা বললো, ইসলামের বীজ আমরা বপন করেছি এবং আমরাই তাতে পানি সিঞ্চন করেছি। সুতরাং আমরাই নেতৃত্বের অধিক হকদার। পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নিল। আবু বকরকে ডাকা হল। তিনি তখনও নবিজির পবিত্র নিথর দেহের নিকট। তিনি উপস্থিত হয়ে ধীর-স্থিরভাবে কথা বললেন। তাঁর যুক্তি ও প্রমাণের কাছে আনসাররা নতি স্বীকার করলো। এভাবে নবিজির ইন্তিকালের পর দ্বিতীয় যে সমস্যাটি দেখা দেয়, আবু বকরের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় তারও সুন্দর সমাধান হয়ে যায়।

চলবে ইনশাআল্লাহ। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড