• সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

উম্মাহর নক্ষত্ররাজি [পর্ব-১]

আবু বকর রা. সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য (১ম ভাগ)

  মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:০৩
sahara_odhikar
ছবি : প্রতীকী

নাম আবদুল্লাহ, উপাধি সিদ্দিক ও আতিক। কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু বকর। পিতা আবু কুহাফা। মাতা সালমা উম্মুল খায়র। কুরাইশ বংশের উপর দিকে ষষ্ঠ পুরুষ ‘মুররা’ পর্যন্ত গিয়ে নবিজির বংশধারার সাথে তাঁর বংশধারা মিলিত হয়েছে। নবিজির জন্মের দু’বছরের কিছু বেশি সময় পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আর প্রায় অনুরূপ সময়ের ব্যবধানেই তিনি ইন্তিকাল করেন। তাই মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল নবিজির বয়সের সমান।

তিনি ছিলেন উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, পাতলা ছিপছিপে ও প্রশস্ত ললাট বিশিষ্ট। শেষ বয়সে চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মেহেদি লাগাতেন। অত্যন্ত দয়ালু ও সহনশীল ছিলেন। তিনি ছিলেন সম্মানিত কুরাইশ ব্যক্তিবর্গের অন্যতম। জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সচ্চরিত্রতার জন্য আপামর মক্কাবাসীর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। জাহিলি যুগে মক্কাবাসীদের দিয়াত বা রক্তের ক্ষতিপূরণের সমুদয় অর্থ তাঁর কাছে জমা হতো। আরববাসীর বংশধারা সংক্রান্ত জ্ঞানে তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ। কাব্য প্রতিভাও ছিল। অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল-ভাষী ছিলেন। বক্তৃতা ও বাগ্মিতার ক্ষেত্রে পরম যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন।

তিনি ছিলেন তাঁর গোত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয়, বন্ধুবৎসল ও অমায়িক ব্যক্তি। ছিলেন বড় ব্যবসায়ী, দানশীল ও চরিত্রবান। জাহিলি যুগেও কখনো শরাব পান করেননি। তাঁর অমায়িক মেলামেশা, পাণ্ডিত্য ও ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে অনেকেই তাঁর সাথে বন্ধুত্ব ও সখ্যতা স্থাপন করতো। তাঁর বাড়িতে বসতো মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত বৈঠক। পিতা আবু কুহাফাও কুরাইশদের মধ্যে যথেষ্ট মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন বয়োঃবৃদ্ধ ও সচ্ছল। কেবল ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল না, সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর মতামত অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা হতো। মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলামের প্রতি তিনি আকৃষ্ট না হলেও পুত্র আবু বকরকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন- এমন কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। অবশ্য আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রা দেখলে মাঝে মধ্যে বলতেন, ‘এই ছোকরারাই আমার ছেলেটিকে বিগড়ে দিয়েছে।’ 

মা উম্মুল খায়র স্বামীর বহু পূর্বে ইসলামের প্রথম পর্যায়ে মক্কায়ই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কার ‘দারুল আরকামে’ ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। প্রায় ৯০ বছর বয়সে নিজ সন্তান আবু বকরের খিলাফতকালীন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 

আবু বকর ছিলেন পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান। অত্যন্ত আদর-যত্ন ও বিলাসিতার মধ্য দিয়ে পালিত হন তিনি। শৈশব থেকে যৌবনের সূচনা পর্যন্ত পিতার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বিশ বছর বয়সে পিতার ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন।

শৈশব থেকেই নবিজির সঙ্গে ছিল আবু বকরের বন্ধুত্ব। তিনি নবিজির অধিকাংশ বাণিজ্য সফরের সঙ্গী ছিলেন। একবার রাসূলুল্লাহর সা. সংগে ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া যান। তখন তাঁর বয়স প্রায় আঠারো এবং নবিজির বয়স বিশ। তাঁরা যখন সিরিয়া সীমান্তে, বিশ্রামের জন্য নবিজি (সা.) একটি গাছের নীচে বসেন। আবু বকর একটু সামনে এগিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। এক খৃস্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর দেখা হয় এবং ধর্ম বিষয়ে কিছু কথাবার্তা হয়। আলাপের মাঝখানে পাদ্রী জিজ্ঞেস করে, ওখানে গাছের নীচে কে? আবু বকর বললেন, এক কুরাইশ যুবক, নাম মুহাম্মাদ বিন আবদিল্লাহ। পাদ্রী বলে উঠলো, এ ব্যক্তি আরবদের নবি হবেন। কথাটি আবু বকরের অন্তরে গেঁথে যায়। তখন থেকেই তাঁর অন্তরে নবিজির প্রকৃত নবি হওয়া সম্পর্কে প্রত্যয় দৃঢ় হতে থাকে। ইতিহাসে এ পাদ্রীর নাম ‘বুহাইরা’ বা ‘নাসতুরা’ বলে উল্লেখিত হয়েছে।

মক্কায় হৈ চৈ পড়ে গেল। মুহাম্মাদ (সা.) নবুয়ত লাভ করেছেন। মক্কার প্রভাবশালী ধনী নেতৃবৃন্দ তাঁর বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে গেল। কেউ তাঁকে মাথা খারাপ, কেউবা জীনে ধরা বলতে লাগল। নেতৃবৃন্দের ইংগিতে ও তাদের দেখাদেখি সাধারণ লোকেরাও ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকে। কুরাইশদের ধনবান ও সম্মানী ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আবু বকরই নবিজিকে সঙ্গ দেন। তাঁকে সাহস যোগান এবং বিনা দ্বিধায় তাঁর নবুওয়তের প্রতি ঈমান আনেন। এ প্রসংগে রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া প্রত্যেকের মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করেছি।’ এভাবে আবু বকর হলেন বয়স্ক আযাদ লোকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান।

মুসলমান হওয়ার পর ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনি নবিজির সাথে দাওয়াতি কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মক্কার আশপাশের গোত্রসমূহে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। হজের মওসুমে বিভিন্ন তাঁবুতে গিয়ে লোকদের দাওয়াত দিতেন। বহিরাগত লোকদের কাছে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরতেন। তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও চেষ্টায় তৎকালীন কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট যুবক উসমান, যুবাইর, আবদুর রহমান, সাদ ও তালহার মত ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

নবিজি (সা.) যখন নবুওয়তের প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন, আবু বকরের নিকট তখন ছিল চল্লিশ হাজার দিরহাম। ইসলামের জন্য তিনি তাঁর সকল সম্পদ ওয়াক্‌ফ করে দেন। কুরাইশদের যেসব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণের কারণে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হচ্ছিল, এ অর্থ দ্বারা তিনি সেই সব দাস-দাসী খরিদ করে আযাদ করেন। তেরো বছর পর হিজরতের সময় তখন তাঁর কাছে এ অর্থের মাত্র আড়াই হাজার দিরহাম অবশিষ্ট ছিল। অল্পদিনের মধ্যে অবশিষ্ট দিরহামগুলিও ইসলামের জন্য ব্যয়িত হয়। বিলাল, খাব্বাব, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়্যা, সুহাইব, আবু ফুকাইহ প্রমুখ দাস-দাসী তাঁরই অর্থের বিনিময়ে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করেন। তাই পরবর্তীকালে নবিজি (সা.) বলেছেন, ‘আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি। কিন্তু আবু বকরের ইহসানসমূহ এমন যে, তা পরিশোধ করতে আমি অক্ষম। তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন। তার অর্থ আমার যে উপকারে এসেছে, অন্য কারও অর্থ তেমন আসেনি।

নবিজির পবিত্র মিরাজের কথা শুনে অনেকেই যখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে দোল খাচ্ছিল, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন।  তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শপথ! যদি নবিজি বলে থাকেন তাহলে সত্য কথাই বলেছেন।’ এ ঘটনার পর নবি (সা.) তাকে ‘সিদ্দিক’ তথা পরম সত্যবাদি হিসেবে ঘোষণা দেন। 

চলবে ইনশাআল্লাহ। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড