• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

সর্বশেষ :

sonargao

বিজ্ঞান কি সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে?

  উসমান হারুন সানি

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:২৩
science_odhikar
ছবি : প্রতীকী

আধুনিক বিজ্ঞান এই মহাবিশ্বের অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে পারলেও এমন অসংখ্য ফ্যাক্ট রয়েছে যা বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে না। অন্তত পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ জীবনের উৎপত্তির কথা বলা যায়। আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী চার বিলিয়ন বছর আগে নিজের অনুরূপ তৈরিকারী অণুর আবির্ভাব ঘটে। বিজ্ঞান এখনও বুঝতে পারেনি কী করে এই অণুর আবির্ভাব ঘটেছে। এই যে রসায়ন থেকে জীববিজ্ঞানে যে পরিবর্তন একে বলে এবায়োজেনেসিস। এই রূপান্তর ছাড়া জীববিজ্ঞানের অস্তিত্ব কল্পনা করা যেত না। এর মাধ্যমেই জীবজগৎ অনস্তিত্ব থেকে আরা অস্তিত্বে এসেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুনরুত্থানের সত্যতার প্রমাণে কুরআনে এই এবায়োজেনেসিসের দৃষ্টান্ত অসংখ্যবার এনেছেন। তিনি বলেন,

‘যেভাবে তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে (তোমাদের মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে) সেভাবেই তোমরা ফিরে আসবে।’ [সুরা আরাফ, ৭ : ২৯]
তারা বলবে, ‘কে আছে এমন যে আমাদেরকে পুনরায় জীবনে ফিরিয়ে আনবে?’ বলো, ‘তিনিই যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন।' [সুরা ইসরা, ১৭ : ৫১]

এ ব্যাপারে আরও অসংখ্য আয়াত রয়েছে।
জেমস ট্যুর নামক একজন আমেরিকার সিনথেটিক অরগানিক কেমিস্ট আছেন। ভদ্রলোক আমেরিকার রাইস ইউনিভার্সিটির কেমিস্ট্রির প্রফেসর। তার ৬৪০টারও বেশি রিসার্চ পেপার ও ১২০টারও বেশি পেটেন্ট রয়েছে। এই এবায়োজেনেসিস নিয়ে তার প্রায় দেড় ঘন্টার একটা লেকচার আছে।[1] সেখানে তিনি দেখিয়েছেন আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতেই এর জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করা কতটা কঠিন। তাহলে পৃথিবীর কালের এক এক বিবর্তনে ঘটনাটা ঘটে গেছে বলাটা কতটা অযৌক্তিক সহজেই অনুমেয়।

সবশেষে তিনি বলেন, যারা মনে করে বিজ্ঞানীরা প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে গেছে, তারা পুরোপুরি বেখবর। কেউই বুঝতে পারেনি। হয়ত আমরা একদিন জানতে পারব। কিন্তু সেইদিন আজ থেকে অনেক দূরে। যে ভিত্তির ওপর আমরা (বিজ্ঞানীরা) নির্ভর করে আছি, তা এতটাই নড়বড়ে যে এটাকে খোলাখুলিভাবে এর প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী বলাটাই ভালো, 'এটা একটা রহস্য'।

যাহোক, আমরা মূল টপিকে ফিরে আসি। এখানে আমরা ফিলোসফি অফ সায়ন্সের আলোকে ব্যাখ্যা করব।[2] সুতরাং এখানে দার্শনিকদের বক্তব্যও আসবে।[3] সুতরাং লেখাটাকে অবৈজ্ঞানিক ভাবার কোনো কারণ নেই।

বিজ্ঞান কি সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে পারে? আপনারা হয়ত নাস্তিকদের দাবি শুনে থাকবেন। হ্যাঁ, করতেই তো পারে। এমন অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিয়েছে যা কয়েক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল। এভাবে চলতে থাকলে একসময় সবকিছুর ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিবেই। আমরা আজকে এর উল্টো ন্যারেটিভটা নিয়ে আলোচনা করব। অর্থাৎ বিজ্ঞানের দ্বারা কোনেকিছুই পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। সতর্কতাস্বরূপ বলে রাখি, যেখানে কোনো যৌক্তিক মতবিরোধ দেখা দেয় সেখানে আপনি ভিন্নমতকে বাতিল বলতে পারেন না বা অবজ্ঞা করতে পারেন না। এই মতবিরোধটাও তেমনি। হালের নাস্তিকতা এতটাই প্রচার-প্রসার পেয়েছে যে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরাও বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান। কথা বললে এড হমিনেমের শিকার হন।[4] সেখানে এই ন্যারেটিভটাকে উড়িয়ে দেওয়া তো কিছুই না।

কতক দার্শনিকদের মতে, বিজ্ঞান কেন কোনকিছুকে কোনদিনই ব্যাখ্যা করতে পারবে না; তার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। কারণ ‘কোনকিছু’কে ব্যাখ্যা করতে গেলে আমাদের দ্বিতীয় আরেকটা কিছুকে নিয়ে আসতে হয়। কিন্তু সেই দ্বিতীয় জিনিসটার ব্যাখ্যা কি? উদাহরণস্বরূপ, নিউটন তার মহাকর্ষ তত্ত্বের দ্বারা একটা বিস্তর পরিসরের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু এই মহাকর্ষ তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করে কিসে? যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, কেন প্রত্যেক বস্তু একে অপরের উপর মহাকর্ষ বল প্রয়োগ করে? নিউটন সাহেবের কাছে এর কোনো উত্তর নেই। নিউটনিয়ান বলবিদ্যায় মহাকর্ষ তত্ত্ব একটি মৌলিক নীতি। এটা অন্যকে ব্যাখ্যা করে কিন্তু একে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞান যতদূরই অগ্রসর হোক না কেন তার অগ্রগতির জন্য এই মৌলিক নীতিসমূকে ব্যবহার করতে হবে। যেহেতু এগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায় না তাই বলা যায় সেকেন্ডারিলি সবকিছু অব্যাখ্য থেকে যাবে।

এ তো গেল নীতির কথা। তাছাড়া বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌছানোর ভিত্তি অর্থাৎ আরোহ (Induction) পদ্ধতির দ্বারা প্রাপ্ত ফলাফলের উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা যায় কিনা তা নিয়েও মতবিরোধ আছে। তাছাড়া আরও কিছু জিনিস আছে যা নীতি নয়, কিন্তু বিজ্ঞান সেগুলোও ব্যাখ্যা করতে পারে না। অনেক দার্শনিক বিশ্বাস করেন এগুলো বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারবেও না। প্রথমেই আমরা প্রাণের উৎপত্তির কথা আলোচনা করে এসেছি। আরও বলা যায় সংজ্ঞা (Consciousness)’র কথা। যদিও বলা হয় রেটিকুলার ফরমেশন নামক আমাদের স্নাযুতন্ত্রের একটা অংশ এটাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ ইত্যাদির প্রকৃতি কেমন তা জানার জন্য গবেষণা চলতে থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ দার্শনিকরাই বিশ্বাস করেন সংজ্ঞাকে কখনও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না।

অনেকে এই দাবির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন? তাদেরকে বলি, সংজ্ঞার অভিজ্ঞতা মৌলিকভাবে পৃথিবীর অন্য যে কোনো কিছু থেকে ভিন্ন। এর একটা সাবজেক্টিভ দিক আছে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি একটি ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে ভয় পেলেন। এটা এমন একটা অভিজ্ঞতা যার একটা সুনির্দিষ্ট অনুভূতি আছে। বর্তমান জার্গন অনুযায়ী, এমন একটা কিছু আছে যা এই অভিজ্ঞতার মত। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা হয়ত একটা সময়ে যে জটিল প্রক্রিয়ার দ্বারা আপনি ভয় পাচ্ছেন তা ব্যাখ্যা করে ফেলবেন, কিন্তু ভয়ংকর স্বপ্ন দেখার ফলে আপনি কেন ভয় পেলেন? কেন অন্য কোনো অনুভূতি সৃষ্টি হল না? এই প্রশ্নগুলো নিরুত্তরই থেকে যাবে।[5]

অর্থাৎ প্রত্যেক ক্ষেত্রে ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর আমরা পাচ্ছি না বা আরোও স্পষ্ট করে বললে বিজ্ঞান আমাদের সেই উত্তরটা দিতে পারছে না। কল্পনা করুন আপনি এমন একজন সত্ত্বায় বিশ্বাস করেন যিনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনেন। সবকিছুর উপর তিনি কর্তৃত্ববান। মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটে সবকিছু তার আওতাধীন। উত্তর পেয়েছেন প্রশ্নগুলোর?


[1] Youtube : The Origin of Life: An Inside Story (with James Tour)
[2] সহজ ভাষায় বললে ফিলোসোফি অফ সায়ন্স হচ্ছে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর এনালাইসিস।
[3] পুরো লেখায় দার্শনিক বলতে ফিলোসফি অফ সায়ন্স এর সাথে রিলেটেড দার্শনিকদের বুঝানো হয়েছে। অনেক বিজ্ঞানীও এদের অন্তর্ভুক্ত। যেমন: নিউটন, আইনস্টাইন প্রমুখ।
[4] উপরে প্রদত্ত লেকচারের প্রশ্নোত্তর পর্ব ও কনক্লুশন দেখুন।
[5] বিস্তারিত জানতে থমাস নাগেলের Mind & Cosmos পড়া যেতে পারে।

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড