• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

হিউম্যানিজম : মুসলমান নাকি মানুষ?

  ধর্ম ও জীবন ডেস্ক

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:০০
humanism_odhikar
ছবি : প্রতীকী

আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের অন্যতম একটি আইটেম হলো ‘হিউম্যানিজম’। যাকে বাংলায় মানবতাবাদ বলা হয়। তবে ‘মানবতাবাদ পূজা’ শব্দটাই এই ক্ষেত্রে যথার্থ হয়। হিউম্যানিজম মূলত সামাজিক জীবন থেকে ধর্মকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার মৌলিক ধারণা। পুরো পশ্চিমা সভ্যতা ও পুঁজিবাদ দাঁড়িয়ে আছে এই একটা চিন্তার ওপর। পুঁজিবাদের সমস্ত আয়োজন একটা ব্যক্তিসত্তাকে নিয়ে। যাকে human being বলে।

হিউম্যানিজমের ধারণা অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত অবস্থান বান্দা নয়; বরং স্বাধীন (autonomous) এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা (self- determined)। সেক্যুলারিজম খুব জোরেশোরে দাবি করে যে, ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ গঠনের জন্য আমাদের ‘ইনসানিয়াত’ তথা মানবতার ভিত্তিতে ভাবা শিখতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ, বংশের ভিত্তিতে নয়। অর্থাৎ সমাজব্যবস্থার ভিত্তি এমন কোনো বিষয় হতে হবে, যেটা আমাদের সবার মাঝেই আছে। আর সেটা হলো ‘ইনসানিয়াত’। পশ্চিমা বিশ্ব এই ধারণাকে ‘হিউম্যান রাইটস’ নাম দিয়ে একটি পৃথক ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে। আর পুরো পৃথিবীকে তারা নিজেদের বানানো এই মাপকাঠি দিয়েই বিচার করে। যাই হোক, হিউম্যানিজমের বিভিন্ন দিক রয়েছে। লম্বা আলোচনা আছে। সেগুলোর বয়ান এখানে মাকসাদ না। শিরোনামে প্রদত্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এই লেখার উদ্দেশ্য। যদিও প্রশ্নটা খুবই অদ্ভুত। অনেকটা ‘মানুষ নাকি পুলিশ?’―টাইপের। কিন্তু উত্তরটা আমাদের সমাজে খুবই জটিল হয়ে আছে।

সেক্যুলাররা তাদের ‘হিউম্যানিজম’ ধারণার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য একটি কমন প্রশ্ন তুলে। আমাদের আসল পরিচয় মানুষ নাকি মুসলিম। এই প্রশ্নের বহুল প্রচলিত উত্তর হলো, আমাদের আসল পরিচয় ‘আমরা মানুষ’। আমাদের নিজেদের প্রথমে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখা লাগবে। মুসলিম হিসেবে চিন্তা করলে মাত্র কয়েক কোটি মানুষ নিয়ে ভাবা যায়। কিন্তু মানুষের জায়গা থেকে চিন্তা করলে পুরো পৃথিবীর সকলেই এসে যাবে। মূলত এই ধারণার মাধ্যমেই সেক্যুলারিজম ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয়ে রূপান্তরিত করেছে। কারণ হিউম্যানিজমকে মাপকাঠি হিসেবে মেনে নেয়ার পর এটাই যৌক্তিক মনে হবে যে, সামাজিক জীবনের ভিত্তি এমন কোনো বিষয় হওয়া চাই, যেটা সবার জন্যই মূল এবং সবার মাঝেই আছে। যেন একটি সামগ্রিক জীবনাচার অস্তিত্ব লাভ করতে পারে। যদি ধর্মের ভিত্তিতে সমাজ কায়েম হওয়া সঠিক হয় তাহলে বংশ, বর্ণ ইত্যাদি বিষয়ের ভিত্তিতে সমাজ কায়েম হওয়াকেও সঠিক মনে করতে হবে। মানুষের মূল অবস্থান ‘ইনসানিয়াত’ এই তত্ত্ব মেনে নিলে ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে যায়। এটা এর আবশ্যিক ফলাফল। আর এটাই সেক্যুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। (সেটা লিবারেলিজম হোক কিংবা সমাজতন্ত্র)। সেক্যুলারিজম দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য হলো এমন জীবনব্যবস্থা যেটা ওহির পরিবর্তে মানবীয় বিবেকের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে।

বড় পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের অনেক ইসলামি বুদ্ধিজীবী ভাইয়েরা যখন সেক্যুলারদের সাথে কথা বলেন, তখন তারা হিউম্যানিজমের ভিত্তিতে কথা বলেন। ফলে দেখা যায়, হয়তো তারা পরাজিত হয় আলোচনায় কিংবা দুর্বল এবং অত্যন্ত ঠুনকো দলিলের আশ্রয় নেয়। হিউম্যানিজমকে প্রত্যাখ্যান করা ব্যতীত ধর্মকে সামাজিক জীবনে শামিল করার পলিসি বানানো অসম্ভব। আমাদের আলোচিত প্রশ্ন আমরা মানুষ নাকি মুসলমান―এর সুস্পষ্ট এবং অকাট্য উত্তর হবে ‘আমি মুসলিম’ (বান্দা অর্থে)। মানুষ হওয়া তো একটি ঘটনা এবং আমার মুসলমানিত্ব প্রকাশের একটি মাধ্যম। আমাদের মূল সত্ত্বা হলো, আমরা গোলাম তথা আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ হওয়ার পূর্বের কথা হল আমরা মাখলুক (সৃষ্ট)। আমাদের একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। এখন মানুষ হওয়াটা একটা ঘটে যাওয়া বিষয়ের মত।

বিষয়টি ভালো করে বুঝার জন্য এভাবে চিন্তা করা যেতে পারে যে, যদি আমরা মানুষ না হতাম তাহলে কী হতাম? এর দুটি সুরত রয়েছে। হয়তো ফেরেশতা হতাম নতুবা কোনো প্রাণী, উদ্ভিদ, জড় পদার্থ টাইপের কিছু হতাম। কিন্তু আমরা যেটাই হই না কেন সর্বাবস্থায় আমাদের মৌলিকত্ব হলো আমরা মাখলুক। অর্থাৎ নিজেদের অস্তিত্বের সম্ভাব্য প্রতিটি অবস্থাতেই আমাদের মৌলিক অবস্থান একজন আবদ, বান্দা বা গোলামের। এখন আমার গোলামির প্রকাশ বিভিন্ন আকৃতিতে হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ যদি আমি পোকা হই, তাহলে আমার ‘আবদিয়ত’ বা গোলামির প্রকাশ পোকার সুরতেই হবে। আবার আমি যদি ফেরেশতা হই, তো ফেরেশতার সুরতেই আমার আবদিয়তের বহিঃপ্রকাশ হবে। এবার আমি যদি মানুষ হই তবে এটা আমার আবদিয়ত প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। মোটকথা, আমার সুরত তো পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু আমার অবস্থান সর্বদা মাখলুক, আবদ, বান্দাই থাকবে। কোনো অবস্থাতেই এটা পরিবর্তনযোগ্য নয়। আমার সর্বাবস্থা এই অর্থে contingent (ঘটনাক্রমে) যে, আমার অস্তিত্বের কোন অবস্থাই আমি নিজে সৃষ্টি করতে পারি না। আল্লাহ যেই সুরতে চেয়েছেন আমার কোন ইচ্ছা ছাড়াই সেই অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করার ব্যাপারে বাধ্য ছিলেন না।

সুতরাং প্রমাণিত হলো, আমার মূল সত্তাগত অবস্থান মুসলমান (আবদিয়ত)। ইনসানিয়ত আমার আবদিয়ত প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। আবদিয়ত ছাড়া আমার ইনসানিয়তের কোনো মূল্য নেই। মুসলমানিত্বকে আবদিয়ত দ্বারা ব্যাখ্যা করার কারণ হলো, মূলত প্রত্যেক বান্দা মুসলমানই হয়। চাই সে স্বীকার করুক কিংবা না করুক। প্রতিটি মানুষই গোলাম। এখন সে যদি অন্তর ও জবান দিয়ে এর স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সে মুমিন ও মুসলিম (স্বীয় মৌলিক অবস্থানকে স্বীকারকারী)। আর যদি এটা মেনে নিতে অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফির (স্বীয় মৌলিক অবস্থানকে অস্বীকারকারী)। অন্যভাবে বললে, কাফির কোন নতুন কিংবা ভিন্ন অবস্থান নয়; বরং মূল অবস্থানকে অস্বীকারকারী মাত্র।

যখন প্রমাণিত হল আমাদের মৌলিক অবস্থান বান্দা হওয়া এবং ইনসানিয়ত কেবল আমাদের আবদিয়ত প্রকাশ করার মাধ্যম মাত্র, তখন এটা বুঝা অত্যন্ত সহজ হয়ে গেল যে, আমাদের ইনসানিয়তের সেই বহিঃপ্রকাশই সঠিক ও গ্রহণযোগ্য হবে যেটাতে আবদিয়ত রয়েছে। সেখানে নিজের কুপ্রবৃত্তি ও নফসপূজা থাকলে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ আল্লাহর কাছে আমাদের আবদিয়ত প্রকাশের একমাত্র পন্থা হল ইসলাম। এজন্য আমাদের ইনসানিয়াত তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ইসলাম অনুযায়ী হবে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন,

‘যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না।’ [সুরা আলি ইমরান, ৩ : ৮৫] 
‘আল্লাহর কাছে (আবদিয়ত প্রকাশের) একমাত্র দীন হল ইসলাম।’ [সুরা আলি ইমরান, ৩ : ১৯] 

কেউ কেউ বলতে পারেন, মানুষ হওয়ার নিশ্চয় আলাদা একটা মর্যাদা রয়েছে। কারণ আল্লাহ মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই কথার জবাব উপরের আলোচনার ভিতরেই রয়েছে। ইনসানিয়ত মূলত আবদিয়ত প্রকাশের উত্তম সুরত। আবদিয়তের জন্যই ইনসানকে আল্লাহ আশরাফুল মাখলুকাত বলেছেন। কারণ আবদিয়তের সবচেয়ে কঠিন এবং ব্যাপক বিষয়াদি ইনসানের সাথে সংশ্লিষ্ট। পুরো শরিয়ত তাদের সাথেই ব্যাপক সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে, যেটা অন্য কোন মাখলুকের সাথে নয়। এখন যেই আবদিয়তের খাতিরে আশরাফুল মাখলুকাত হল, সেটাই যদি না থাকে তাহলে আশাররুল মাখলুকাত (সর্বনিকৃষ্ট জীব) হবে। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রাণীর সাথে তুলনা করে আরো নিকৃষ্ট বলেছেন। [সুরা আরাফ, ৭ : ১৭৯]

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আরেকটি ভুল ধারণা দূর হওয়া চাই। সেটা হল, ধর্ম শিক্ষা দেয়ার আগে বাচ্চাদের মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়ার ধারণা। অর্থাৎ প্রথমে তাকে শিখাবে মানুষ কী? এরপর ধর্মের কথাবার্তা। বাস্তবে এটাই হিউম্যানিজম তথা মানবতাবাদকে সঠিক প্রমাণের একটি চিত্র। কারণ ধর্মের বাইরে নিজের অস্তিত্বকে জানার অর্থই হল মানুষ তার অস্তিত্বের ক্ষমতা এবং পরিচিতি নিজের মাঝেই সংরক্ষণ করে। এটার অথরিটি তার আছে এবং সেটা নবিদের শিক্ষা ব্যতীতই সম্ভব। অর্থাৎ মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি অবস্থান, being without God। প্রশ্ন হল, নিজেকে ধর্মের বাহিরে শুধু মানুষ হিসেবে পরিচয় দেয়ার কী উদ্দেশ্য? আমি নিজের ইনসানিয়তকে কী ভাবি? আবদিয়ত প্রকাশের মাধ্যম, নাকি মৌলিক সত্তা? যদি ইনসানিয়তকে মৌলিক অবস্থান ও সত্তা মেনে নেয়া হয়, তবে এটাই মানবতাবাদ পূজা। আর যদি আবদিয়ত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে ধর্মের বাইরে নিজেকে পরিচিত করা একটা হাস্যকর বিষয়।

মূল (উর্দু) :  ড. মুহাম্মাদ যাহিদ সিদ্দিক মোঘল (লেকচারার, কায়েদে আজম ইউনিভার্সিটি, পাকিস্তান)

ভাবানুবাদ : ইফতেখার সিফাত 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড