• রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

কেন মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসরণ করতে হবে?

  ধর্ম ও জীবন ডেস্ক

২১ আগস্ট ২০১৯, ১৬:২৭
Old_Makkah
ইবরাহিম আ. নির্মিত তাওহিদের কেন্দ্র কাবাকে এভাবেই পৌত্তলিকতায় ঘিরে রেখেছিল মক্কার মুশরিকরা; অথচ তারা দাবি করতো তারাই ইবরাহিমের প্রকৃত অনুসারী। ছবি : প্রতীকী

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

وَلَقَدْ ءَاتَيْنَآ إِبْرٰهِيمَ رُشْدَهُۥ مِن قَبْلُ وَكُنَّا بِهِۦ عٰلِمِينَ  

‘আর আমি তো এর আগে ইবরাহিমকে তার শুভবুদ্ধি ও সত্যজ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তার সম্বন্ধে ছিলাম সম্যক পরিজ্ঞাত।’ [সুরা আম্বিয়া, ২১ : ৫১]

‘রুশদ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করে সঠিক কথা বা পথ অবলম্বন করা এবং বেঠিক কথা ও পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া। যাকে আরবিতে صلاح বলা যায়। এ অর্থের প্রেক্ষিতে ‘রুশদ’ শব্দের অনুবাদ ‘সত্যনিষ্ঠা’ও হতে পারে। কিন্তু যেহেতু রুশদ শব্দটি কেবলমাত্র সত্যনিষ্ঠ নয়, বরং এমন সত্যজ্ঞানের ভাব প্রকাশ করে যা সঠিক চিন্তা ও ভারসাম্যপূর্ণ সুষ্ঠু বুদ্ধি ব্যবহারের প্রতিফল, তাই ‘শুভবুদ্ধি’ ও ‘সত্যজ্ঞান’ এই দুটি শব্দ একত্রে এর অর্থের কাছাকাছি। তাই অনুবাদ করা হয়েছে, ‘ইবরাহিমকে তার শুভবুদ্ধি ও সত্যজ্ঞান দান করেছিলাম।’ এখানে ‘তার’ বলার অর্থ যতটুকু তার জন্য এবং তার মত অন্যান্য রাসুলদের জন্য উপযুক্ত ততটুকু আমি তাকে দান করেছিলাম। সুতরাং সে যে সত্যের জ্ঞান ও শুভবুদ্ধি লাভ করেছিল তা আমিই তাকে দান করেছিলাম। এটা তার জন্য আমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ছিল। যা ছিল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ। ‘এর পূর্বে’ কথাটির একটি অর্থ ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে শুভবুদ্ধি ও সত্যজ্ঞান দান করার ঘটনা মুসা আলাইহিস সালামকে তাওরাত দেওয়ার আগের। অথবা এর অর্থ ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে নবুয়ত দান করার পূর্বে সৎপথের জ্ঞান দান করা হয়েছিল।

সাথে সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এ কথাও বলে দিলেন, আমি জানতাম যে, সে এই জ্ঞানের যোগ্য এবং সে তার সঠিক প্রয়োগ করবে। এছাড়াও অন্যত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন যে, আমি তাকে মনোনীত করেছি সে আমার মনোনীত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন,

وَلَقَدِ اصْطَفَيْنٰهُ فِى الدُّنْيَا ۖ وَإِنَّهُۥ فِى الْءَاخِرَةِ لَمِنَ الصّٰلِحِينَ

‘পৃথিবীতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; পরকালেও সে সৎ কর্মপরায়ণদের অন্যতম।’ [সুরা বাকারা, ২ : ১৩০] 

আর এ জন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও মিল্লাতে ইবরাহিমের প্রতি পথনির্দেশ করেছেন এবং মিল্লাতে ইবরাহিমের প্রতি পথ দেখিয়েছেন। আর মিল্লাতে ইবরাহিম হল সু-প্রতিষ্ঠিত দীন। ইবরাহিমি আদর্শের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তা অন্য সমস্ত বাতিল আদর্শ থেকে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলে। আর এটা করা ছাড়া কোন ব্যক্তি মিল্লাতে ইবরাহিম তথা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আদর্শের উপর আসতে পারবে না এবং তার আদর্শের প্রকৃত অনুসারী হতে পারবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

قُلْ إِنَّنِى هَدٰىنِى رَبِّىٓ إِلٰى صِرٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِّلَّةَ إِبْرٰهِيمَ حَنِيفًا ۚ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

বলো, ‘নিশ্চয় আমার রব আমাকে সোজা পথের হিদায়াত দিয়েছেন। তা সুপ্রতিষ্ঠিত দীন, ইবরাহিমের আদর্শ। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।’ [সুরা আনআম, ৬ : ১৬১] 

অর্থাৎ এ দীন সুদৃঢ়, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত মজবুত ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত; কারো ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণা নয় এবং যাতে সন্দেহ হতে পারে এমন কোন নতুন দীনও নয়, বরং এটিই ছিল পূর্ববতী নবীগণের দীন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নাম উচ্চারণ করার কারণ এই যে, জগতের প্রত্যেক দীনি ব্যক্তিরাই তার মাহাত্ম্যে ও নেতৃত্বে বিশ্বাসী। বর্তমান সম্প্রদায়সমূহের মধ্যে ইহুদি, নাসারা ও আরবের মুশরিকরা যতই ভিন্ন মতাবলম্বী হোক না কেন, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মাহাত্ম্যে ও নেতৃত্বে সবাই একমত। নেতৃত্বের এ মহান পদমর্যাদা আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাকে দান করেছেন। তাছাড়া ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যেভাবে এ দীনকে সঠিকভাবে নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন সেটা পরবর্তীদের জন্য আদর্শ হয়ে আছে। সুতরাং বিশেষ করে তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আমরা আরও দেখতে পাই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সে সকল মানুষদেরকে সর্বোত্তম আদর্শধারী ও আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত বলেছেন, যারা মিল্লাতে ইবরাহিমের আদর্শকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُۥ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرٰهِيمَ حَنِيفًا ۗ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرٰهِيمَ خَلِيلًا

‘আর তার অপেক্ষা ধর্মে কে উত্তম, যে বিশুদ্ধ (তাওহিদবাদী) হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহিমের আদর্শ অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইবাহিমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। [সুরা নিসা, ৪ : ১২৫] 

এখানে সফলতার একটি মান-নির্ণায়ক এবং আদর্শ পেশ করা হচ্ছে। মান-নির্ণায়ক হল, নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা, সৎকাজে নিরত থাকা এবং ইবরাহিমি আদর্শের অনুসরণ করা। আর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম; যাকে আল্লাহ তায়ালা নিজের খলিল বানিয়ে ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মনে রেখো, আমি প্রত্যেক অন্তরঙ্গ বন্ধুর অন্তরঙ্গতা থেকে বিমুক্ত ঘোষণা করছি, যদি আমি কাউকে খলিল বা অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম। তোমাদের সঙ্গী (অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সা. নিজেই) আল্লাহর খলিল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু। [মুসলিম, আসসাহিহ : ২৩৮৩]

মূলত খলিল বলা হয়, এমন বন্ধুত্বকে যার বন্ধুত্ব অন্তরের অন্তঃস্থলে জায়গা করে নিয়েছে। হৃদয়ের গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করেছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যেভাবে আল্লাহর খলিল, তেমনিভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আল্লাহর খলিল। আবার কেউ কেউ বলেন, খলিলের অর্থ হল, যার অন্তরে মহান আল্লাহর ভালোবাসা এমনভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, তাতে আর কারো জন্য স্থান থাকে না। খলিল শব্দটি فَعِيل এর ওজনে; যার অর্থ فاعل কর্তৃপদ। যেমন, ‘আলীম’ শব্দটি ‘আলিম’ অর্থে ব্যবহার হয়। কেউ বলেছেন, এর অর্থ مفعول (কর্মপদ)-এর। যেমন, ‘হাবীব’ শব্দটি ‘মাহবুব’ অর্থে ব্যবহার হয়। আর ইবরাহিম (আ.) অবশ্যই আল্লাহর ‘মুহিব্ব’ (আল্লাহপ্রিয়) এবং তাঁর ‘মাহবুব’ (আল্লাহর প্রিয়) দুই-ই ছিলেন।

 

লেখক : মুফতি আবদুল্লাহ আল-মামুন খতিব, বাইতুল ফালাহ জামে মসজিদ, খুলনা। 

আরও পড়ুন : ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আদর্শ

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড