• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

বিবর্তনবাদ কি ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

  ধর্ম ও জীবন ডেস্ক

২০ আগস্ট ২০১৯, ১৩:৪২
darwinism
ছবি : প্রতীকী

‘বিবর্তনবাদ কি ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?’ বর্তমান যুগের মুসলিমদের অনেকের মনের মধ্যেই খাবি খাওয়া প্রশ্ন এটি। অনেক মুসলিমই ইসলাম ত্যাগ করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন যখন তারা জানতে পেরেছেন যে, ‘বিবর্তনবাদ ইসলামি বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’। ইসলামের অনেক সমালোচকও এই কারণেই ইসলামের সমালোচনা করেন যে, ইসলাম বিবর্তনবাদকে সমর্থন করে না। মুসলিমরা এই চতুর্মুখী চাপের কারণেই স্বীয় বিশ্বাসের সাথে সৎ থেকে তাদের বিশ্বাসকে প্রতিরোধ করার মতো বিদঘুটে পরিস্থিতিতে পড়ে যান। ‘বিবর্তনবাদ বিশ্বাস করা কুফর’ এমন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক জবাব আমি দেব না। বরং আমার দাবি হচ্ছে, কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে যা এসেছে তা খোলা চোখে পড়ার পর এবং মুসলিমরা পরম্পরাগতভাবে এ সকল বিষয় যেভাবে বুঝে এসেছে তা জানার পর প্রকৃতিবাদ, বিশেষত বিবর্তনবাদের সাথে একে সাংঘর্ষিক বলেই মনে হয়।

প্রথম কথা হলো, সাধারণভাবে বিজ্ঞানের একটি তত্ত্ব কীভাবে ধর্মের বিরোধী হতে পারে? সাংঘর্ষিকতা তত্ত্বের মৌলিক ধারণা হলো কোনো কিছু থাকা বা না থাকা। যেমন- কোনো ব্যক্তি দাবি করল যে, আকাশ নীল; আবার আরেকজন দাবি করল আকাশ নীল নয়। তবে তা হবে পরিষ্কার সাংঘর্ষিক। তবে একজনের আকাশ নীল হওয়ার দাবিতে যদি আরেকজন আকাশ নীলাভ ধূসর হওয়ার দাবি করে তবে তাও সাংঘর্ষিকই হবে বটে, কিন্তু তা সরাসরি সাংঘর্ষিক নয়, বরং ‘শিথিল’ পর্যায়ের সাংঘর্ষিক হবে।

খ্রিস্টান, মুসলিম ও অন্যান্য সকল ধর্মেরই কিছু ধর্মতত্ত্ববিদরা দাবি করেন যে, ধর্ম কখনোই এমন কোনো দাবি করে না যা সরাসরি বিজ্ঞানের বিরোধী। তাদের কাছে ধর্ম হলো কেবল নীতিনৈতিকতায় ঠাসা কিছু একটা, আর বিজ্ঞান হলো ধর্মের সীমামুক্ত বাহ্যিক মহাবিশ্ব সম্পর্কে নিরপেক্ষ বয়ান (Non-Overlapping Magisterial)। আরো সহজভাবে বলতে গেলে ধর্ম বলে কী করতে হবে, কী করা উচিত এসব বিষয়; আর বিজ্ঞান স্রেফ কী আছে আর কী নেই তার খোঁজ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞান ও ধর্মের পরিধি ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে তা কখনোই পারস্পরিক সাংঘর্ষিক হবে না। একজন খৃস্টান বা মুসলিম যখন বিবর্তনবাদ সম্পর্কে কথা বলে তখন তারা বলে ‘বাইবেল/কুরআন বিজ্ঞানের কোনো টেক্সটবুক নয়, তাই ধর্মের কথাবার্তা কখনও বিজ্ঞানের নীতিমালা হিসেবে গৃহীত হতে পারে না’। বিবর্তনবাদ ও ওহির মধ্যে সংঘর্ষ হওয়ার বিষয়ে আমার দাবি হচ্ছে, আমরা যদি কুরআন মোটামুটিভাবেও পড়ি তবে আমরা অবশ্যই কুরআনকে বিজ্ঞানের তত্ত্বকথায় ভরপুর বিজ্ঞানের কোনো বই হিসেবে খুঁজে পাব না, এটা একেবারেই ঠিক কথা; তবে পাশাপাশি আমরা দেখতে পাব যে, কুরআন বিজ্ঞানের কোনো বই না হওয়া সত্ত্বেও বাহ্যিক মহাবিশ্ব সম্পর্কে কিছু দাবি করছে (যেভাবে বাইবেলও করে)। এই ভাসাভাসা অধ্যয়নেই কুরআনের অনেক আয়াতকে সরাসরি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। কোনো কোনো বৈপরীত্য আবার প্রত্যক্ষ ও কঠিন ধরনের। হয়তো ওহি বলছে কোনো একটা জিনিসের অস্তিত্ব আছে, আর বিজ্ঞান তাকে অস্বীকার করে বলছে ‘না, তার কোনো অস্তিত্বই নেই’। ওহি ও বিজ্ঞানের এমন সরাসরি ও স্পষ্ট বিরোধিতার একটি ক্ষেত্র হচ্ছে মানুষের উৎপত্তি। আলোচনার পূর্বেই কিছু পূর্বানুমান খেয়াল করুন―

১) আদমের কোনো জৈবিক পিতা-মাতা ছিল না, অর্থাৎ তার কোনো বাবা-মা ছিল না।
২) আদম একজন জলজ্যান্ত মানুষ ছিলেন, প্রাথমিক প্রাণ (Proto-Organism) জাতীয় কিছু ছিলেন না।
৩) জৈবিক পরম্পরা বা প্রত্যেক জীবের জৈবিক পূর্বপুরুষ আছে এই তত্ত্ব সত্য।

মানুষের উৎপত্তি বিষয়ে বিজ্ঞান ও কুরআনের বর্ণনার মাঝে আমরা সুস্পষ্ট বৈপরীত্য দেখতে পাচ্ছি। ৩ নং পূর্বানুমানটি বিবর্তনের মৌলিক ও অলঙ্ঘনীয় মূলনীতিগত ভিত্তি, যার সারকথা হলো, প্রত্যেক জীবই আরেকটি জীব হতে পরম্পরাক্রমে এসেছে। প্রাণ হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি, আর না বাতাসে ভেসে এসেছে; হ্যাঁ তবে প্রাণের প্রারম্ভিক বস্তু (Primordial Soup) এর আওতার বাহিরে থাকবে। তবে এর পরবর্তীতে কোনো জীবই―এমনকি প্রাথমিক প্রাণও―হঠাৎ করে উদ্ভাসিত হয়নি, বরং রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিবর্তিত হয়েছে, যা বর্তমানে ‘Abiogenesis’ নামক বিজ্ঞানের পৃথক শাখার আলোচনার বিষয়। অপরদিকে ওহির দাবি হচ্ছে প্রথম জীব হলেন আদম (আ.)। যিনি মানুষই ছিলেন। যাকে সৃষ্টিবাদ বলে অনেকে। কুরআনের ৩ : ৫৯; ৭ : ১৯-২৫, ৩৫-৩৭; ২ : ৩১-৩৩ আয়াত থেকে প্রাণের প্রথম মানবিক উৎস আদমের ব্যাপারে কুরআনের ধারণা লাভ করা যায়। প্রাক-আধুনিক সময়ে কোনো মুসলিমই এসব আয়াতকে বিজ্ঞানের প্রোটো-অরগানিজম ধারণা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেননি। তাই কাউকে তা করতে হলে অবশ্যই দীর্ঘদিন যাবত প্রচলিত এই ব্যাখ্যা থেকে সরে আসতে হবে। আর ৩ : ৫৯ নং আয়াতে তো আল্লাহ ঈসার জন্মকে আদমের জন্মের সাথে তুলনা করেছেন, যেভাবে আদমের কোনো বাবা-মা ছিল না, সেভাবে ঈসাও পিতা ছাড়াই জন্ম নিয়েছেন। যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 

إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ ۖ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُن فَيَكُونُ

‘আল্লাহর কাছে ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মতো৷ কেননা আল্লাহ তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন এবং হুকুম করেছেন, হয়ে যাও, আর তা হয়ে যায়৷ [কুরআন, ৩ : ৫৯]

যৌক্তিক বৈপরীত্য 
আমরা এখানে স্পষ্টতই বিরোধিতা দেখতে পেলাম। তাই তিনটি পূর্বানুমানকে পুনরায় দেখে নেওয়া যাক―

১) আদমের কোনো জৈবিক পিতা-মাতা ছিল না, অর্থাৎ তার কোনো বাবা-মা ছিলো না।
২) আদম একজন জলজ্যান্ত মানুষ ছিলেন, প্রাথমিক প্রাণ (Proto-Organism) জাতীয় কিছু ছিলেন না।
৩) জৈবিক পরম্পরা বা প্রত্যেক জীবের জৈবিক পূর্বপুরুষ আছে এই তত্ত্ব সত্য।

আমরা যদি ২ নং যুক্তিটিকে গ্রহণ করতে যাই তবে তা ১ ও ৩ নং যুক্তির বিরোধী হবে (সাধারণভাবে ১ ও ৩ নং যুক্তি পরস্পরবিরোধী)। শেষমেষ দুটি যুক্তিই পরস্পর বৈপরীত্য ছাড়া মেনে নেওয়া সম্ভবপর হয়। বিবর্তনবাদী জৈববিজ্ঞানের প্রয়োজন ৩ নং যুক্তি, আর কুরআনের―যদিও হোক তা অগভীর অধ্যয়ন―প্রয়োজন ১ ও ২ যুক্তি। তাহলে এই দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআনকে বিজ্ঞানের―কমপক্ষে বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞান তো অবশ্যই―সাথে সাংঘর্ষিক বলেই মনে হয়। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, আদমের কাহিনীর সাথে (যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে) বিবর্তনবাদকে মেলাতে গেলে মুসলিমদের হয় কুরআনকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে অথবা কমপক্ষে কুরআনকে মন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। তবে কিছু মুসলিমদের কুরআন থেকে সরে আসার বিন্দুমাত্র অভিপ্রায় নেই। তাদের জন্য তখন ব্যাপারটি হয়ে দাঁড়ায় অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তবে অধিকাংশ মুসলিমই সুনির্দেশিত, চিন্তিত ও ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে তাফসিরসহ কুরআন পড়তে অভ্যস্ত নয়। আবার বর্তমানে প্রত্যেক বুদ্ধিমানের উপরই কমসে কম বিজ্ঞানের কিছু না কিছু যাদু রয়েছেই, তাই যখনই তারা ধর্মীয় পুস্তাকাদিতে বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু দেখতে পান তখন তারা এক ধরনের বিশ্বাসের সংকটে ভোগেন। যেই বিশ্বাসের সংকট অন্যান্য ধর্মের লোকদের থেকে বেশ পরিষ্কারভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।

উপরের আলোচনা থেকে একটি প্রশ্ন অবশ্যম্ভাবীরূপে উঠে আসে তা হলো, কেউ কি মানুষের উৎপত্তি বিষয়টি বাদ দিয়ে বিবর্তনবাদে বিশ্বাস রাখতে পারে? সহজ করে বললে, বিবর্তনবাদ সকল স্থানেই ঠিকঠাক আছে শুধু মানবজাতির ক্ষেত্রেই তা ভুল এবং এই ক্ষেত্রে কুরআনের বর্ণনাই সঠিক এমন বিশ্বাস কি কোনো মুসলিম রাখতে পারে? যেমনটা অনেকেই দাবি করেছেন যে, আদম সম্পর্কে প্রোটো-অরগানিজম জাতীয় বিশ্বাস কুরআন সমর্থন করে না, তবে অন্যান্য প্রাণীদের বিবর্তনবাদে বিশ্বাস সম্পর্কে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে কোনো বাধা নেই। এটি একটি যুক্তিসম্মত ও বাস্তবসম্মত পথ। এতে করে অনেক মুসলিমরাই বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত সর্বসম্মতি ও ধর্মতত্ত্বকে সহজভাবে মেনে নিতে পারবে। এতে তারা বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে প্রাণ ও জীবের উৎপত্তি-উন্নতি বিষয়ে সঠিক বলে মেনে নিতে পারবে, যেভাবে তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানকে গ্রহ-নক্ষত্রের উৎপত্তি-উন্নতি বিষয়ে সঠিক বলে মেনে নিতে পারেন। তবে তাদের মনে সবসময়ই স্মরণ থাকবে যে, আল্লাহই হলেন এ সকল কিছুর পেছনের মূল চালিকাশক্তি, তিনিই হলেন প্রকৃত স্রষ্টা। তিনিই বিবর্তন ও জ্যোতির্বিদ্যা প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেন, তার হাতেই রয়েছে সকল ক্ষমতার চাবিকাঠি। তাই তিনি চাইলেই এসকল নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতে পারেন। সাধারণভাবে সাগর বিভক্ত হয় না, মৃতকে জীবিত করা যায় না, তবে আল্লাহ চাইলে এসকল প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে তিনি মুজিজা বা কারামাত ঘটাতে পারেন।

কিন্তু মানুষের উৎপত্তির বিষয়টিতেও আমরা বিবর্তনবাদে বিশ্বাস কেন রাখতে পারি না? বিবর্তনে দিনে দিনে উন্নতি হয়, আর যেহেতু মানুষের উৎপত্তির বিষয়টি ওহির মাধ্যমে প্রমাণিত, অদ্বিতীয় বিষয় তাই বিবর্তনীয় মানুষের উৎপত্তি বিষয়ে মুসলিমরা ইমান রাখতে পারে না। তবে মুসলিমরা অলৌকিকতায় বিশ্বাস করেই বিজ্ঞানে বিশ্বাস করতে পারেন। এতে করে বিবর্তনবাদ ও ইসলামের উভয়ের সামঞ্জস্যতা অটুট থাকল।

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, ‘বিবর্তনবাদ বনাম ধর্ম’ বিতর্কে এই যুক্তিটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত হওয়ার পরেও তাতে মৌলিকভাবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েই যায়। আমার মতে, বিবর্তনবাদ দুটি মৌলিক ভিত্তির কারণে সমস্যাপূর্ণ। এক. মানুষের উৎপত্তির বিষয়টিকে (যা বিবর্তবাদের প্রাণ বলতে গেলে) এই যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, দুই. বিবর্তনবাদ স্রষ্টার অস্তিত্বের বিষয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাথমিক প্রমাণকে গোঁড়াতেই বিনষ্ট করে দেয়। অনেক নব্য নাস্তিকই দাবি করে যে, যেহেতু বিজ্ঞান সবকিছুর সমাধান দেয় তাই বিজ্ঞান স্রষ্টার প্রতি আকর্ষণ ও ধর্মের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আসলে এর অর্থ কী? তারা এর দ্বারা মূলত কী বুঝাতে চায়? ইতিহাস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ধার্মিকরা সবসময়ই জীবন ও প্রকৃতির বড় বড় রহস্যকে সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞাতা স্রষ্টার অস্তিত্বের ক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য ও অখণ্ডনীয় নিদর্শন হিসেবে পেশ করে এসেছেন। জীবন ও জগতের ব্যাপারে গভীর উপলব্ধি মানুষের মনোজগতে সবসময়ই নাড়া দিয়ে এসেছে। যাতে তাদের উপলব্ধি হয় যে, আমরা নিঃসঙ্গ নই, চারপাশের সকল কিছুরই একটা উদ্দেশ্য আছে, আছে গূঢ় ও গভীর অর্থ। নব্য নাস্তিকরা ‘বিজ্ঞান সবকিছুকেই ব্যাখ্যা করে’ এর মাধ্যমেই মূলত সূক্ষ্ম উপলব্ধি ও মহত্ত্বের এই চেতনাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দিতে চায়। কেননা বিজ্ঞান যদি জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সবকিছুরই ব্যাখ্যা করতে পারে তবে মানুষের মনে তা-ই সত্যের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে যায় অজান্তেই। যা কিনা প্রত্যাদেশ নির্ভর ধর্মের জন্য ক্ষতিকর। কেননা তাদের বিশ্বাস হচ্ছে, শ্বাশ্বত সত্য একমাত্র প্রত্যাদেশের মাধ্যমেই তাদের কাছে পৌছায়। এটা তো অনস্বীকার্য যে, বর্তমানে স্রষ্টায় বিশ্বাসীরা তাদের স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যম হিসেবেই বিজ্ঞানকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তাদের কাছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব কিংবা আপেক্ষিক পদার্থবিদ্যা স্রষ্টার সুমহান গাণিতিক কুশলতারই নিদর্শন। যদি এসকল তত্ত্ব আসলেই কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে তবে তা শুধুমাত্র স্রষ্টার অনন্য কুশলতা, কারুকার্যতার উপলব্ধিকেই কেবল আরো গভীর ও শক্তিশালী করতে পারে। আইনস্টাইনের মত নাস্তিক ও তত্ত্বীয় পদার্থবিদ ও এর মাধ্যমেই ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র সন্ধান পেয়েছেন। তার ভাষ্য হলো,

“To know that what is impenetrable to us really exists, manifesting itself as the highest wisdom and the most radiant beauty which our dull faculties can comprehend only in their most primitive forms—this knowledge, this feeling, is at the center of true religiousness. In this sense, and in this sense only, I belong in the ranks of devoutly religious men.”
“জেনে রাখা দরকার, আমাদের জন্য দুর্বোধ্য কিছু বিষয়ের সত্যিই অস্তিত্ব আছে, যাকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও জাজ্জল্যমান সৌন্দর্য বলা যেতে পারে, যার কেবল প্রাথমিক দিকটুকুই আমাদের দুর্বল বোধশক্তি উপলব্ধি করতে পারে। এই জ্ঞান, উপলব্ধি, অনুভূতিই ধর্মীয় অভিব্যক্তির কেন্দ্রীয় কারণ। এই দিক থেকে, শুধুমাত্র এই দিক থেকেই, আমি একেবারে সর্বোচ্চ ধার্মিকদের কাতারে আছি।”

তবে বিবর্তনবাদ তত্ত্বে প্রকৃতির ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি অযৌক্তিক ও অপ্রসাঙ্গিক। বিবর্তনবাদ―বিশেষত ডারউইনবাদ―প্রকৃতির বিবিধ জটিলতা, দুর্বোধ্যতা ও মহত্ত্বকে অস্বীকার করে। যা বর্তমানে চিরন্তন সত্যের রূপ গ্রহণ করেছে বলা যায়। যার ফলে চারপাশের পরিবেশ থেকে গভীর অর্থ বের করে নিয়ে আসার মানসিকতা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। কেননা ডারউইনবাদের দাবি হচ্ছে সকল কিছুই দুর্ঘটনা ও সমাপতনের ফলাফল। যা কিছু অস্তিত্বে ছিল, আছে এবং সামনেও যা অস্তিত্বে আসবে তার সকল কিছুই অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন ও দুর্ঘটনা প্রক্রিয়ার ফল। আমরা চারিদিকে যে অসংখ্য জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা লক্ষ্য করি তা আদতে মোটেই জটিল-কঠিন কিছু নয়। এগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার কিছুই নেই। সবকিছু এমনিতেই ঘটে, বিবর্তিত হয়, আরেকটু বেশি বিবর্তিত হয়, এই আরকি। চমৎকার সোনারঙা পাখিটাও নাকি দূর্ঘটনার শিকার। এর অপরূপ কারুকার্যে কোনো শক্তিশালী স্রষ্টার হাত নেই, আর না আছে এর অস্তিত্বের গভীর কোনো উদ্দেশ্য, গুরুত্ববহতা, না নিদর্শন। এগুলো এমনিতেই অস্তিত্বশীল, যেভাবে আরো কোটি কোটি অস্তিত্ব অস্তিত্বশীল হয়ে আছে। মনে করুন, একজন গোয়েন্দা আপাতদৃষ্টিতে অবাধ্য, অধরা কোনো কেইসে জড়িত হয়েছেন, তা নিয়ে কাজ করছেন। শেষমেষ সেই গোয়েন্দার হাতে দুটি অপশন থাকবে―সে ভাববে এই কেইসের আগে পরের সকল ঘটনাটাই যেন অনেকগুলো ধারাবাহিক ও ক্রমপরিক্রমায় ঘটে যাওয়া ঘটনার নিপুণ সংযোজন, যার ফলে কেইসের রহস্যময়তার উদ্ভব ঘটেছে। অথবা এতসব ঘটনা আসলে কেবলই দুর্ঘটনা, এছাড়া আর কিছুই নয়।

অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও ডারউইনবাদের মাঝে এখানেই পার্থক্য। যেখানে অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আমাদেরকে বিস্ময়ে হতবাক করে দেয়, নতুন করে কিছু ভাবতে প্ররোচিত করে; সেখানে ডারউইনবাদী তত্ত্ব আমাদের প্রবোধ দেয় সকল কিছুই উদ্দেশ্যহীন ও খাপছাড়া। কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই, কোনো অর্থ নেই। অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব স্বাধীনভাবে আমাদের স্রষ্টার ব্যাপারে ভাবায়, সেখানে ডারউইনীয় তত্ত্ব এই ভাবনা-তরীর তলায় ফুটো করে দেয়। ঠিক এ কারণেই ডারউইনীয় তত্ত্ব নব্য নাস্তিক ও সেক্যুলার চিন্তাবিদদের এত পছন্দের, তাদের নয়নের মনি। রহস্যের গোলককে সমতল বানানোতে আর মহাবিশ্বের রহস্যকে বাহ্যিকতার চাদর পরাতে ডারউইনীয় তত্ত্বের জুড়ি মেলা ভার। এই কারণে আদমের সৃষ্টিতত্ত্বের কথা বাদ দিলেও মুসলিমদের বিবর্তনবাদের বিরোধিতার পৃথক পটভূমি আছে। বিবর্তনবাদ যে শুধু ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তাই নয়, বরং বিবর্তনবাদ স্বাধীনভাবে ও নিরপেক্ষভাবে স্রষ্টার নিদর্শন সন্ধানের সকল রাস্তা বন্ধ করে দেয়।

মূল : ড্যানিয়েল হাকিকাতজু গ্রাজুয়েট (ফিজিক্স ও ফিলোসফি), হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। 

অনুবাদ : হোসাইন শাকিল; শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড