• মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক (পর্ব-২)

  মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির

১০ জুলাই ২০১৯, ১৩:৩৬

বিশ্বব্যাপী হজের ঘোষণা

পবিত্র কাবা নির্মাণের পর ইবরাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে বেশ কিছু দুয়া করেন। আল্লাহ তায়ালা সেগুলো কবুল করে নেন। এরপরই আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আদেশ করেন বিশ্বব্যাপী হজের ঘোষণা দিতে। কুরআন সেই ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিচ্ছে তার উচ্চাঙ্গিক বাচনভঙ্গিতে― 
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ - فِيهِ آَيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَقَامُ إِبْرَاهِيمَ وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ آَمِنًا
‘মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর নির্দিষ্ট করা হয়েছিল তা মক্কার ঘর তাতে সন্দেহ নেই। এটা অত্যন্ত পবিত্র, বরকতপূর্ণ এবং সারা দুনিয়ার জন্য হিদায়াতের কেন্দ্রস্থল। এতে আল্লাহর প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ বর্তমান রয়েছে, এখানে রয়েছে ‘মাকামে ইবরাহিম’। আর যে-ই এখানে প্রবেশ করবে সে নিরাপদে থাকবে।’ [সুরা আলি ইমরান, ৯৬-৯৭] 
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا حَرَمًا آَمِنًا وَيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ
‘আমি মানুষের জন্য কীরূপে বিপদশূন্য ও শান্তিপূর্ণ হেরেম তৈরি করেছি তা কি তারা দেখতে পায়নি? অথচ তার চারপাশে লোকজন লুণ্ঠিত ও ছিনতাই হয়ে যেত।’ [সুরা আল-আনকাবুত, ৬৭] 
এ জন্যই আমরা দেখি, আরবের চারিদিকে যখন হানাহানি আর যুদ্ধ-বিগ্রহের দাবানল জ্বলতো, তখনও বাইতুল্লায় বিরাজ করতো শান্তির ফল্গুধারা। দুর্ধর্ষ মরু বেদুঈন যদি এর সীমার মধ্যে তার পিতার হত্যাকারীকেও দেখতে পেত, তবুও এর সীমার মধ্যে তাকে স্পর্শমাত্র করতে সাহস পেত না।
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ - وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آَمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آَمَنَ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِر
‘স্মরণ কর, যখন আমি এ ঘরকে মানবজাতির জন্য কেন্দ্র ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানিয়েছিলাম এবং ইবরাহিমের ইবাদাতের স্থানকে ‘মুসাল্লা’ (জায়নামায) বানাবার নির্দেশ দিয়েছিলাম আর তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং নামাজিদের জন্য আমার ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। পরে যখন ইবরাহিম দুয়া করলো, হে আমার রব! আপনি এ শহরকে শান্তিপূর্ণ জনপদে পরিণত করুন এবং এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী তাদের জন্য ফল-মূল দ্বারা জীবিকার সংস্থান করে দিন।’ [সুরা আল-বাকারা, ১২৫-১২৬] 
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ - رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ - رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آَيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

‘স্মরণ কর, ইবরাহিম ও ইসমাঈল যখন এ ঘরের ভিত্তি স্থাপনকালে দোয়া করছিল―হে আমাদের রব! আমাদের এ চেষ্টা কবুল করো, তুমি তো সর্বজ্ঞ ও সর্বশ্রোতা। হে রব! তুমি আমাদের দু’জনকেই মুসলিম তথা তোমার পূর্ণ অনুগত বানাও এবং আমাদের বংশ থেকে এমন একটি জাতি তৈরি কর যারা একান্তভাবে, তোমারই অনুগত হবে। আমাদের তোমার ইবাদাত করার পন্থা বলে দাও, আমাদের প্রতি ক্ষমার দৃষ্টি নিক্ষেপ কর, তুমি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াময়। হে আমাদের রব! তুমি সেই জাতির প্রতি তাদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসুল পাঠাও যিনি তাদের তোমার বাণী পড়ে শোনাবে, তাদের কিতাব ও হিকমার শিক্ষা দেবে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবে। নিশ্চয় তুমি সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন এবং বিজ্ঞ।’ [সুরা আল-বাকারা, ১২৭-১২৯] 
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آَمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَصْنَامَ - رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَحِيمٌ - رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ
‘স্মরণ কর, যখন ইবরাহিম দুয়া করেছিল―হে আমার রব! এ শহরকে তুমি শান্তিপূর্ণ বানিয়ে দাও, আমাকে এবং আমার সন্তানকে মূর্তিপূজার শিরক থেকে বাঁচাও। হে আমার রব! এ মূর্তিগুলো অসংখ্য লোককে গোমরাহ করেছে। অতএব, যে আমার পন্থা অনুসরণ করবে সে আমার, আর যে আমার পন্থার বিপরীত চলবে তখন তুমি নিশ্চয়ই বড় ক্ষমাশীল ও দয়াময়। হে আমার রব! আমি আমার বংশধরদের একটি অংশ তোমার এ পবিত্র ঘরের নিকট, এ ধূসর মরুভূমিতে পুনর্বাসিত করেছি―এ উদ্দেশ্যে যে, তারা সালাত কায়েম করবে। অতএব, তুমি লোকদের মনে এতদূর উৎসাহ দাও যেন তারা এদের জীবিকার ব্যবস্থা করে। হয়ত এরা তোমার কৃতজ্ঞ বান্দা হবে।’ [সুরা ইবরাহিম, ৩৫-৩৭]
وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَنْ لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ - وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ - لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ
‘স্মরণ করো, যখন ইবরাহিমের জন্য এ ঘরের স্থান ঠিক করেছিলাম―এ মর্মে যে, এখানে কোনো প্রকার শিরক কোরো না এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী ও নামাজিদের জন্য পরিচ্ছন্ন রাখো। আর মানবজাতির মাঝে হজের ঘোষণা দাও। তারা যেন তোমার কাছে আসে, পায়ে হেঁটে আসুক কিংবা দূরবর্তী স্থান থেকে কৃশ উটের পিঠে চড়ে আসুক। এখানে এসে তারা যেন দেখতে পায় তাদের জন্য কল্যাণের কত সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর দেয়া জন্তুগুলোকে আল্লাহর নামে কুরবানি করবে, তা থেকে নিজেরাও খাবে এবং দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোকদেরও খেতে দেবে।’ [সুরা আল-হজ, ২৬-২৮] 

‘মানবজাতির মাঝে হজের ঘোষণা দাও’ এ আদেশের প্রেক্ষিতে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহকে প্রশ্ন করেন, ‘কীভাবে আমি গোটা মানবজাতির কাছে হজের ঘোষণা পৌঁছাবো, আমার আওয়াজ ক্ষীণ।’ আল্লাহ বললেন, ‘তুমি ঘোষণা দাও। পৌঁছানোর দায়িত্ব তো আমার।’ এরপর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সাফা পর্বত বা আবু কুবাইস পর্বতে ওঠে সুউচ্চ কণ্ঠে হজের আহ্বান করেন। আজও পর্যন্ত সমস্ত হাজি সাহেবগণ ‘লাব্বাইক’ (আমি হাজির) বলে সে আহ্বানে সাড়া দেন। [তাফসির ইবনু কাসির, ৫/৪১৪]এই হলো হজের গোড়ার কথা।

এ থেকে জানা গেল যে, ইবরাহিম (আ.) যে বিশ্বব্যাপী তাওহিদের দাওয়াহ পরিচালনার জন্য আদিষ্ট হয়েছিলেন, মক্কাই ছিল তাঁর প্রধান কার্যালয়। পবিত্র কাবাই ছিল এর প্রধান কেন্দ্র। আর দুনিয়ায় যারাই তাওহিদে বিশ্বাসী হবে এবং জীবনের প্রতিটি পর্বে তার বাস্তবায়ন ঘটাবে―তাঁরা যে ভূখণ্ড, সমাজ বা সম্প্রদায়েরই অন্তর্ভুক্ত হোক না কেন, সকলেই একটি নির্দিষ্ট সময়ে সমবেত হবে, এক মহামিলনের সম্মিলনে। চাকা যেমন নিজ অক্ষের চতুর্দিকে ঘোরে, বিশ্ব মুসলিমের জীবনও তেমনি আপন কেন্দ্রেরই চতুর্দিকে আবর্তিত হবে। এই উম্মাহ যে এক উম্মাহ, এক দেহ এক প্রাণ―এ তত্ত্বেরই বাস্তবরূপ হচ্ছে হজ। 

চলবে, ইনশাআল্লাহ।

প্রথম পর্ব পড়ুন- লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক (পর্ব-১)
 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড