• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

ইসলামে জাকাতের বিধান

  ধর্ম ডেস্ক

৩১ মে ২০১৯, ০৮:৩৬
জাকাত
ছবি : প্রতীকী

আরবী الزكاة ‘জাকাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বৃদ্ধি ও উন্নতি। জাকাত শব্দের আভিধানিক আরেকটি অর্থ হয় التطهير (তাতহির), যার বাংলা অনুবাদ পবিত্র করা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন :
﴿قَدۡ أَفۡلَحَ مَن زَكَّىٰهَا ٩﴾ [الشمس: ৯]

“সে নিশ্চিত সফল হয়েছে যে তাকে (নফসকে) পবিত্র করেছে”। [সূরা আশ-শামস, আয়াত: ৯]

জাকাতের কারণে সম্পদ বৃদ্ধি পায়, তাই জাকাতকে জাকাত বলা হয়। জাকাতের কারণে নেকিও বর্ধিত হয়। আরেকটি কারণ হলো, জাকাত নফসকে কৃপণতার ন্যায় বদ অভ্যাস থেকে পবিত্র করে, তাই অভিধানের দ্বিতীয় অর্থও শরঈ‘ জাকাতে পাওয়া যায়।

ইসলামী পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সম্পদের ভেতর শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণকে জাকাত বলা হয়, যা বিশেষ শ্রেণি ও নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হয়। জ্ঞাতব্য যে, কুরআন, সুন্নাহ ও মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যে জাকাত ফরয, এতে কারও দ্বিমত নেই।

১. আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيۡهِمۡۖ إِنَّ صَلَوٰتَكَ سَكَنٞ لَّهُمۡۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ١٠٣﴾ [التوبة: ১০৩]

“তাদের সম্পদ থেকে সদকা নাও, এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদের জন্য দো‘আ কর, নিশ্চয় তোমার দো‘আ তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩] অপর আয়াতে তিনি বলেন :
﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي جَنَّٰتٖ وَعُيُونٍ ١٥ ءَاخِذِينَ مَآ ءَاتَىٰهُمۡ رَبُّهُمۡۚ إِنَّهُمۡ كَانُواْ قَبۡلَ ذَٰلِكَ مُحۡسِنِينَ ١٦ كَانُواْ قَلِيلٗا مِّنَ ٱلَّيۡلِ مَا يَهۡجَعُونَ ١٧ وَبِٱلۡأَسۡحَارِ هُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ ١٨ وَفِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ لِّلسَّآئِلِوَٱلۡمَحۡرُومِ 

“নিশ্চয় মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতসমূহে ও ঝর্ণাধারায়, তাদের রব তাদের যা দিবেন তা তারা খুশীতে গ্রহণকারী হবে। ইতোপূর্বে এরাই ছিল সৎকর্মশীল। রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাতো। আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত। আর তাদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ১৫-১৯]অপর আয়াতে তিনি বলেন :

﴿وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ ٣٤﴾ [التوبة:34]

“যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদেরকে বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৪]

অপর আয়াতে তিনি বলেন :

﴿وَلَا يَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَبۡخَلُونَ بِمَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ هُوَ خَيۡرٗا لَّهُمۖ بَلۡ هُوَ شَرّٞ لَّهُمۡۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِۦ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ ١٨٠﴾ [آل عمران:১৮০]

“আল্লাহ যাদেরকে তার অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর, বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর, যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮]

২. ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামান পাঠানোর সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন :

“তুমি কিতাবিদের এক কওমের নিকট যাচ্ছ, অতএব, তাদেরকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আমি আল্লাহর রাসূল’ সাক্ষীর দিকে আহ্বান কর, যদি তারা এতে আনুগত্য প্রকাশ করে, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, প্রত্যেক দিন ও রাতে আল্লাহ তাদের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। 

যদি তারা এতে আনুগত্য প্রকাশ করে, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তাদের ওপর সদকা ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করে তাদেরই গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হবে, যদি তারা এতে আনুগত্য প্রকাশ করে, তুমি তাদের দামী সম্পদ গ্রহণ করা পরিহার কর, (অর্থাৎ যে সম্পদ তাদের নিকট অতি উত্তম ও অধিক পছন্দনীয় জাকাত হিসেবে সেখান থেকে তুমি গ্রহণ করবে না, সামনে এ সম্পর্কে আলোচনা আসছে), আর মজলুমের দো‘আ থেকে বাঁচ। কারণ, তার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই”।(সহীয়াইন)

মহিলাদের স্বর্ণ রৌপ্য অলন্কারে জাকাতের বিধান- 

টাকার সাথে সংযোগ করা হবে, মহিলাদের ব্যবহারিক স্বর্ণ ও রূপা, যদিও তা ব্যবহারের জন্য হয়ে থাকে। আলেমদের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী মহিলাদের ব্যবহারিক স্বর্ণ বা চাঁদি যদি নিসাব পরিমাণ পৌঁছে থাকে এবং তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়, তাতে জাকাত দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর ব্যাপকতাই এর প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ، لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا، إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ،ِ»

“সোনা রূপার মালিক যদি এর জাকাত আদায় না করে, তবে কিয়ামতের দিন এ ধন সম্পদকে তার শাস্তির জন্য আগুনের পাত বানানো হবে”

এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণিত, একজন মহিলার হাতে স্বর্ণের দু’টি চুড়ি দেখে তিনি বললেন,

«أَتُعْطِينَ زَكَاةَ هَذَا؟» ، قَالَتْ: لَا، قَالَ: «أَيَسُرُّكِ أَنْ يُسَوِّرَكِ اللَّهُ بِهِمَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ سِوَارَيْنِ مِنْ نَارٍ؟» ، قَالَ: فَخَلَعَتْهُمَا، فَأَلْقَتْهُمَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَالَتْ: هُمَا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَلِرَسُولِهِ

“তুমি কি এর জাকাত আদায় কর? সে বলল, না, তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, তুমি কি পছন্দ কর যে, কিয়ামতের দিন আগুনের দু’টি চুড়ি তোমাকে পরিয়ে দেওয়া হোক? এরপর তিনি চুড়ি দু’টি খুলে ফেললেন এবং রাসূলের দরবারে ফেলে দিয়ে বললেন, এ দু’টি চুড়ি আল্লাহ জন্য এবং তার রাসূলের জন্য।উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, স্বর্ণের কিছু অলংকার তিনি ব্যবহার করতেন।

তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এগুলো কি গচ্ছিত সম্পদ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, «مَا بَلَغَ أَنْ تُؤَدَّى زَكَاتُهُ، فَزُكِّيَ فَلَيْسَ بِكَنْزٍ» “যে সম্পদ জাকাতের নিসাব পরিমাণ পৌঁছার পর তার জাকাত আদায় করা হয়, তা গচ্ছিত সম্পদ নয়”।একই অর্থে আরও একাধিক হাদীস বর্ণিত রয়েছে।

জাকাত পাওয়ার হকদার কারা?

আল্লাহ তা‘আলা বলেন- 

“নিশ্চয় সদকা হচ্ছে ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, (তা আরও বণ্টন করা যায়) দাস আজাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়”।[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত : ৬] এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা জাকাতের হকদার আট প্রকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।

চলবে... 

লেখক : মুরাদ বিন আমজাদ, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুসলিম উম্মাহ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

ওডি/এনএম

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড