• সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

রমাজানে চলমান শেষ দশ দিনে করণীয় ও একটি মাসায়েল

  ধর্ম ডেস্ক

৩০ মে ২০১৯, ১০:২৫

রমজান মাসে দিনের বেলায় যে যৌনমিলন করে সে মুকিম তথা অবস্থানকারী রোজাদার হলে তার ওপর বড়-কাফফারাহ (আল কাফফারাতুল মুগাল্লাযাহ) ওয়াজিব হয়, আর তা হলো একজন দাস মুক্ত করা, যদি তা না পায় তাহলে দুই মাস পরপর একাধারে সিয়াম পালন করা, আর যদি তাও না পারে তবে ৬০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো।

একজন নারীর ব্যাপারেও তা ওয়াজিব হয় যদি সে রাজি থাকে। আর যদি সে এ ব্যাপারে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাধ্য হয়, তাহলে তার ওপর কিছু ওয়াজিব হয় না।

আর তারা যদি উভয়েই মুসাফির হয়, তবে তাদের কোনো গুনাহ হয় না, তাদের উপর কোনো কাফফারাহও ওয়াজিব হয় না এবং দিনের বাকি অংশ তাদের পানাহার এবং যৌনমিলন থেকে বিরত থাকতে হবে না, বরং তাদের উভয়কেই ঐদিনের সাওম কাযা করতে হবে। তাদের উভয়ের জন্য এক্ষেত্রে (মুসাফির অবস্থায়) সাওম পালন করা বাধ্যতামূলক নয়।

একইভাবে যে ব্যক্তি কোনো প্রয়োজনে সাওম ভঙ্গ করেছে, যেমন-শারী‘আত সম্মতভাবে যার জানমাল নিরাপদ এমন কাউকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য, এমন ব্যক্তি যদি সেই দিন যৌনমিলন করে, যেই দিনে প্রয়োজনবশত সাওম ভঙ্গ করেছিল তবে তার উপর কিছু ওয়াজিব হয় না, কারণ, এক্ষেত্রে সে কোনো ওয়াজিব সাওম ভঙ্গ করে নি।

মুকিম তথা অবস্থানকারী রোজাদার যদি যৌনমিলন করে যার উপর সাওম বাধ্যতামূলক, তার উপর পাঁচটি জিনিস বর্তায় :

১। পাপ
২। সেই দিনের সাওম ফাসিদ (বিনষ্ট) হওয়া
৩। সেই দিনের বাকি অংশ পানাহার ও যৌনমিলন থেকে বিরত থাকা।
৪। সেই দিনের কাযা ওয়াজিব হওয়া।
৫। (বড়) কাফফারাহ আদায় ওয়াজিব হওয়া।

আর কাফফারাহ আদায় করার দলীল হল সেই হাদীসটি যা আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি রমযানের দিনের বেলায় তাঁর স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন করেছিলেন। আর এই ব্যক্তি একাধারে দুইমাস সাওম পালন করতে বা ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে অক্ষম ছিলেন, এক্ষেত্রে তাঁর কাফফারাহ ওয়াজিব হয় নি, কারণ, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা দেন না [আল-বাকারাহ : ১৮৬] আর অপারগতার ক্ষেত্রে কোনো ওয়াজিব নেই।

আর মুকিম (অবস্থানকারী) কোনো রোজাদার যদি রমজান মাসের দিনের বেলায় স্ত্রীর সাথে যৌনমিলন করে- বীর্য নির্গত করুক বা নাই করুক- তার উপর বড় কাফফারাহ ওয়াজিব হয়।

তবে যৌনমিলন ছাড়া বীর্য নির্গত করার ব্যাপারে মতভেদ আছে। এক্ষেত্রে তাকে কাফফারাহ আদায় করতে হবে না বরং তার গুনাহ হবে, তাকে (দিনের বাকি অংশ) যৌনমিলন ও পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং কাযা করতে হবে।

আল-ফাত্‌ওয়া আল-জামি‘আহ লিল-মার’আহ আল-মুসলিমাহ (খন্ড-১, পৃঃ ৩৪৮)

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ العَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ».

“যখন রমযানের শেষ দশ দিন আসতো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন বা স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতেন) এবং রাত্রে জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।”[১]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন,

«كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجْتَهِدُ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، مَا لَا يَجْتَهِدُ فِي غَيْرِهِ».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমযানের শেষ দিকে অধিক পরিমাণে এমনভাবে সচেষ্ট থাকতেন যা অন্য সময়ে থাকতেন না।”[২]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিনে এত পরিমাণ আমল করতেন যা তিনি অন্য কোনো মাসে করতেন না। তাঁর আমলসমূহের মধ্যে অন্যতম আমল হলো- 

রাত্রি জাগরণ:

তাঁর আমলসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল রাত জাগরণ।

রাত্রি জাগরণের আরেক অর্থ হতে পারে রাতের অধিকাংশ সময় জেগে ইবাদত করতেন। এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি অর্ধরাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করল সে যেন পুরো রাত জেগে ইবাদত করল। সহীহ মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«وَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ لَيْلَةً حَتَّى الصَّبَاحِ».

“আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সকাল পর্যন্ত জেগে ইবাদত করতে দেখি নি”। [৩]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কেউ জামা‘আতের সাথে ইশার সালাত আদায় করে ফজরের সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে তার সারারাত জাগরণের সাওয়াব অর্জিত হবে।

ইমাম শাফে‘ঈ রহ. বলেন, কেউ ইশা ও ফজরের সালাতের জামা‘আতে উপস্থিত হলে সে লাইলাতুল কদরের অংশ প্রাপ্ত হবে। ইবন মুসাইয়্যেব থেকে ইমাম মালিকের থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইশার সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করবে সে লাইলাতুল কদর প্রাপ্ত হবে। [৪] 

আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবন আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সুত্রে বর্ণনা করেন,

«مَنْ أَتَى عَلَيْهِ شَهْرُ رَمَضَانَ صَحِيحًا مُسْلِمًا، صَامَ نَهَارَهُ، وَصَلَّى وِرْدًا مِنْ لَيْلِهِ، وَغَضَّ بَصَرَهُ، وَحَفِظَ فَرْجَهُ وَلِسَانَهُ وَيَدَهُ، وَحَافَظَ عَلَى صَلَاتِهِ مَجْمُوعَةً، وَبَكَّرَ إِلَى جُمَعِهِ، فَقَدْ صَامَ الشَّهْرَ، وَاسْتَكْمَلَ الْأَجْرَ، وَأَدْرَكَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، وَفَازَ بِجَائِزَةِ الرَّبِّ».

“যে ব্যক্তি সুস্থ ও মুসলিম অবস্থায় রমজান পেয়ে দিনের বেলায় সাওম পালন করল, রাতের বেলায় সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করল, চক্ষু অবনমিত রাখল, নিজের লজ্জাস্থান, যবান ও হাত হিফাযত করল, জামা‘আতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করল ও খুব তাড়াতাড়ি জুম‘আত সালাতে গেল, তাহলে সে যথাযথভাবে সাওম পালন করল, পুরোপুরি সাওয়াব প্রাপ্ত হবে, লাইলাতুল কদর লাভ করবে এবং তার রবের পুরস্কার প্রাপ্ত হয়ে সফলকাম হবে। [৫] ইমাম আবু জা‘ফর রহ. বলেন, এ পুরস্কার দুনিয়ার রাজা-বাদশার পুরস্কারের সাথে সদৃশ নয় (বরং এটি মহান রবের বিশেষ পুরস্কার)। 

পরিবারের লোকদেরকে জাগানো:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিনে তাঁর পরিবার-পরিজনকে সালাতের জন্য জাগাতেন, যা তিনি অন্য মাসে করতেন না। আবু যার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, “রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেইশ, পঁচিশ ও সাতাশ রমজান তার পরিবারকে সালাতের জন্য জাগাতেন। আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি বিশেষ করে সাতাশ রমজান তাঁর পরিবার-পরিজনকে সালাতের জন্য আহ্বান করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, যে সময় লাইলাতুল কদর হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তিনি সেসময় তাদেরকে জাগিয়ে দিতেন। 

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُوقِظُ أَهْلَهُ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ».

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিন তার পরিবারের লোকদেরকে জাগাতেন”। [৬] 

সুফইয়ান সাওরী রহ. বলেন, আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ হলো রমযানের শেষ দশ দিন আসলে রাতে বেশি পরিমাণ তাহাজ্জুদ পড়া, এতে কঠোর অধ্যবসায়ী হওয়া, পরিবার-পরিজন ও সন্তানদেরকে সম্ভব হলে জাগিয়ে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমা ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার দরজায় কড়া নাড়তেন এবং বলতেন, তোমরা কি উঠেছ ও সালাত আদায় করেছ? [৭] 

তিনি রাতের বেলায় তাহাজ্জুদ সালাত শেষে বিতরের সালাত আদায় করার সময় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে জাগাতেন। তারগীবে বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর এক স্ত্রীকে সালাতের জন্য জাগিয়েছেন এবং তার চেহারায় পানির ছিটা দিয়েছেন।

মুয়াত্তায় বর্ণিত আছে,

أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ مَا شَاءَ اللهُ. حَتَّى إِذَا كَانَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ، أَيْقَظَ أَهْلَهُ لِلصَّلاَةِ. يَقُولُ لَهُمُ: الصَّلاَةَ، الصَّلاَةَ. ثُمَّ يَتْلُو هذِهِ الآيَةَ: ﴿وَأۡمُرۡ أَهۡلَكَ بِٱلصَّلَوٰةِ وَٱصۡطَبِرۡ عَلَيۡهَا١٣٢﴾ [طه: ١٣٢] 

“উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাতে যতটুকু সম্ভব সালাত আদায় করতেন। রাতের শেষাংশ হলে তিনি তার পরিবারের লোকদেরকে সালাতের জন্য জাগাতেন এবং বলতেন, সালাত, সালাত। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করতেন:

﴿وَأۡمُرۡ أَهۡلَكَ بِٱلصَّلَوٰةِ وَٱصۡطَبِرۡ عَلَيۡهَا١٣٢﴾ [طه: ١٣٢]

“আর তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত আদায়ের আদেশ দাও এবং নিজেও তার ওপর অবিচল থাক”। [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১৩২] [৮] 

শক্ত করো কোমর বাঁধা: তিনি রমযানের শেষ দশ দিনে লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন (অর্থাৎ খুব বেশি ইবাদত করতেন) এবং স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকতেন (অর্থাৎ তাদের বিছানায়া যেতেন না), এভাবে রমজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত করতেন।

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশদিন যেহেতু ই‘তিকাফ করতেন তাই ই‘তিকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের নিকটবর্তী হওয়া তাদের সাথে মেলামেশা করা কুরআন, হাদীস ও ইজমা‘ দ্বারা যেহেতু নিষিদ্ধ তাই তিনি সে সময় স্ত্রীদের কাছে যেতেন না। কোনো কোনো সৎপূর্বসূরী নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে,

﴿فَٱلۡـَٰٔنَ بَٰشِرُوهُنَّ وَٱبۡتَغُواْ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡ١٨٧﴾ [البقرة: ١٨٧]

“অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭]  অর্থাৎ লাইলাতুল কদর তালাশ করো। এ আয়াতের ব্যাখ্যা এরূপ, সাওমের রাতে আল্লাহ স্ত্রী সহবাস হালাল করেছেন যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। তবে সাথে সাথে তিনি লাইলাতুল কদরও তালাশ করার আদেশ দিয়েছেন যাতে রমযানের সারারাত স্ত্রী উপভোগে কেটে না যায়। আর সারারাত স্ত্রী উপভোগে মত্ত থাকলে লাইলাতুল কদর ছুটে যাবে। এ কারণে রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে লাইলাতুল কদর অন্বেষণের নির্দেশ দিয়েছেন, বিশেষ করে সে সব রাতে যাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের প্রথম বিশ দিন তার স্ত্রীগণের কাছে গমন করতেন অতঃপর শেষ দশকে স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকে লাইলাতুল কদরের তালাশে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন।

রাতের খাবার বিলম্ব করে সেহরিতে গ্রহণ:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশ দিনে রাতের খাবার বিলম্ব করে সেহরিতে একসাথে গ্রহণ করতেন। আবু সা‘ঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে,

«لاَ تُوَاصِلُوا، فَأَيُّكُمْ إِذَا أَرَادَ أَنْ يُوَاصِلَ، فَلْيُوَاصِلْ حَتَّى السَّحَرِ، قَالُوا: فَإِنَّكَ تُوَاصِلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ إِنِّي أَبِيتُ لِي مُطْعِمٌ يُطْعِمُنِي، وَسَاقٍ يَسْقِينِ».

“তোমরা সাওমে বেসাল পালন করবে না। তোমাদের কেউ সাওমে বেসাল পালন করতে চাইলে সে যেন সাহরীর সময় পর্যন্ত করে। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যে সাওমে বেসাল পালন করেন? তিনি বললেন, আমি তোমাদের মতো নই, আমি রাত্রি যাপন করি এরূপ অবস্থায় যে, আমার জন্য একজন খাদ্য পরিবেশনকারী থাকেন যিনি আমাকে আহার করান এবং একজন পানীয় পরিবেশনকারী আমাকে পান করান”।[9]

এ হাদীসে রাসূলের সাওম, রবের উদ্দেশ্যে নির্জনে থাকা, তাঁর মুনাজাত ও যিকিরে মশগুল থাকার জন্য আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্য তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর পবিত্র ফুৎকার ইত্যাদি যা কিছু নি‘আমত দান করেছেন সে সবের ইঙ্গিত বহন করে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অন্তরে আল্লাহর পরিচয় অনুভব করতেন, রবের প্রদত্ত খাবার গ্রহণ করতেন এবং মানবীয় পানাহার মুক্ত থাকতেন।

আল্লাহর জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে তাঁর যিকির হলো তাদের অন্তরের খাদ্য, যা তাদেরকে পানাহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে রাখে। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনে নিবেদিত কঠোর পরিশ্রমীগণ ক্ষুধা অনুভব করলে মুনাজাতের খাদ্য দ্বারা তৃপ্তি লাভ করে। অতএব, তাদের জন্য অত্যন্ত পরিতাপ যারা অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে রবের মোনাজাতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত।

মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময় গোসল করা: 

ইবন জারীর রহ. বলেন, আলিমগণ রমযানের প্রতি রাতে গোসল করতেন, কেউ আবার রমযানের শেষ দশকে যেসব রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সে সব রাতে গোসল করে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।

হাম্মাদ ইবন সালামাহ রহ. বলেন, সাবেত ও হুমাইদ রহ. রমযানের শেষ দশকে যে রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সে সব রাতে সুন্দর পোশাক পরিধান করে সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যেতেন এবং মসজিদ সুগন্ধি ও ধোঁয়া দিয়ে সুগন্ধময় করতেন। অতএব, রমযানের শেষ দশকে যে রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সে সব রাতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া, সুগন্ধি ব্যবহার করা, গোসল করে সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করা ভালো, যেভাবে অন্যান্য ঈদের দিনগুলোতে করা হয়। এছাড়া সব সালাতে পোশাকের দ্বারা সুসজ্জিত হওয়া শরী‘আতসম্মত। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿خُذُواْ زِينَتَكُمۡ عِندَ كُلِّ مَسۡجِدٖ٣١﴾ [الاعراف: ٣١]    

“তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ করো”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৩১] ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আল্লাহর জন্য বেশ-ভূষা গ্রহণ করা অধিক হকদার। তবে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সাজ-সজ্জা ব্যতীত বাহ্যিক সাজ-সজ্জা পরিপূর্ণ হয় না। আর আল্লাহর কাছে নিবেদিত হওয়া, তাওবা করা, সমস্ত গুনাহ থেকে পবিত্রতা অর্জন করা ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ও সাজ-সজ্জা অর্জিত হয়। কেননা বাতেনী সৌন্দর্য ব্যতীত বাহ্যিক সৌন্দর্য কোনো কাজে আসে না। কবি বলেছেন:

কেউ যদি তাকওয়ার পোশাক পরিধান না করে, তবে সে সাধারণ পোশাক পরিধান করলেও উলঙ্গই হয়ে থাকে।

আল্লাহ কারো বাহ্যিক অবস্থা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তাদের অন্তর ও আমলের দিকে লক্ষ্য করেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর সন্মুখে সালাতে দাঁড়াবে সে যেন উত্তম পোশাকে বাহ্যিক সুসজ্জিত হয়ে এবং তাকওয়ার পোশাকে বাতেনী সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكُمۡ لِبَاسٗا يُوَٰرِي سَوۡءَٰتِكُمۡ وَرِيشٗاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ٢٦﴾ [الاعراف: ٢٦]   

“হে বনী আদম, আমি তো তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাকওয়ার পোশাক, তা উত্তম”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ২৬]

তথ্যসূত্র- [১] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০২৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৭৪। [২] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৭৫। [৩] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৪৬। [৪] ইতহাফুল মাহারা, ইবন হাজার আসকালানী, ১৫/৪১৪। [৫] ফাদায়েলু রমজান, ইবন আবীদ দুনিয়া, পৃ. ৪৮। [৬] তিরমিযী, হাদীস নং ৭৯৫, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [৭] মাশীখাতু ইবন বুখারী, জামালুদ্দীন ইবনুয যাহিরী আল-হানাফী, ১/৫৭২, তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [৮] মুয়াত্তা মালিক, ২/১৬২, হাদীস নং ৩৮৯; জামে‘উল উসূল, ৬/৬৮, হাদীস নং ৪১৭৯, মুহাক্কিক আব্দুল কাদির আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। [৯] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৬৩।

লেখক : মুরাদ বিন আমজাদ, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুসলিম উম্মাহ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

ওডি/এনএম
 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড