ইসলামে সাক্ষরতা, শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:০৬

 অধিকার ডেস্ক   

ইসলামে ঈমানের পর “ইলম” বা সাক্ষরতা, শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এই জ্ঞানার্জন সকল মুমিন (বিশ্বাসী) নর-নারীর জন্য ব্যক্তিগতভাবে ফরজ করা হয়েছে। এজন্য “কলম” কে অক্ষর জ্ঞানকে জ্ঞানের মূল বাহন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে লটকে থাকা বস্তু থেকে। পাঠ করো, তোমার প্রতিপালক মহা-মহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। (সূরা আলাক-১-৪)

অতএব উপরের আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, শিক্ষা গ্রহণের মূলনীতি হবে “প্রতিপালকের নামে” অর্থাৎ জ্ঞানের সকল শাখার জ্ঞানই মহান প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস ও সৃষ্টির কল্যাণের জন্য হতে হবে। এজন্য জ্ঞানের সকল শাখার মধ্যে ধর্মীয় শাখায় পারদর্শিতা অর্জনকে ইসলামে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ যার মঙ্গলের ইচ্ছা করেন তাকেই দীনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করেন। ( সহীহ মুসলিম- ২/৭১৮-৭১৯)

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাক্ষরতা ও শিক্ষার অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন, বদরের যুদ্ধে কিছু কাফির যোদ্ধা বন্দি হন, যারা শিক্ষিত ছিলেন। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু সংখ্যক মুসলিম শিশু কিশোরদের লেখাপড়া শেখানোর বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। (মুসনাদে আহমদ- ৪/৪৭)

এ জ্ঞান মানুষকে যেমন বিশ্বাস ও কর্মে পূর্ণতা দেয়, তেমনি সমাজের মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, কর্ম, সততা, ও মানবিমুখতা সৃষ্টির যোগ্যতা প্রদান করেন। সেজন্য আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের “ইলম” বা জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা আল্লাহ বাড়িয়ে দিবেন। তোমরা বিবর্ণকর তা আল্লাহ তাআলা সম্যক অবগত আছেন।” (সূরা মুজাদালা- ১১)

অতএব অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে “ইলম” শিক্ষার নেকী ও মর্যাদা অনেক বেশি। আর সেজন্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “ইবাদতের ফজিলতের চেয়ে ইলমের বা জ্ঞানার্জনের ফজিলত অধিক উত্তম।“ (সহীহুত তারগীব-১/১৬, হাদীসটি সহীহ)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি কেউ “ইলম” বা জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো পথে চলে, তবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আলিমের (জ্ঞানীর) জন্যে আসমান এবং জমিনের সকলেই ক্ষমা প্রার্থনা করে। এমনকি পানির মধ্যে থাকা মাছও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারকারাজির উপরে চাঁদের যেমন মর্যাদা ইবাদত-বন্ধেগীতে লিপ্ত আবিদের উপরে “আলিমে”র (জ্ঞানীর) মর্যাদা তেমনই।

আলিমরাই (জ্ঞানীরাই) হচ্ছেন নবীর উত্তরাধীকারী। নবীগণ (আ.) কোনো টাকা পয়সা দীনার-দিরহাম উত্তরাধিকার রেখে যাননি। তাঁরা শুধু “ইলম” এর উত্তরাধিকার রেখে যান। কাজেই যে ব্যক্তি “ইলম” (জ্ঞান) গ্রহণ করল, সে নবীদের উত্তরাধিকার থেকে একটি বড় অংশ গ্রহণ করল। (সহীহ বুখারী- ১/৩৭, সুনানে তিরমিযী-৫/২৮)

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবী আবুযার রা. কে বলেন, হে আবুযার! তুমি যদি কুরআনের একটি আয়াত শিক্ষা কর, তবে তা তোমার জন্য ১০০ রাকআত নফল নামাজ আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর যদি তুমি “ইলমের” একটি অধ্যায় শিক্ষা কর, আমলকৃত অথবা আমলকৃত নয়-তবে তা তোমার জন্য ১০০০ রাকআত নামাজ আদায় করার চেয়েও উত্তম। (সহীহ আত-তারগবি-১/৫৪, ২/২৩২)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি কেউ কোন “ইলম” (জ্ঞান) শিক্ষা দেয়, তবে শিক্ষা অনুসারে যত মানুষ কর্ম করবে সকলের সমপরিমাণ নেকি ঐ ব্যক্তি লাভ করবে, কিন্তু এতে তাদের নেকির কোনো ঘাটতি হবে না। (সুনানে ইবনু মাজাহ-১/৮৮, সহহিুত তারগীব-১/১৯)

অতএব জ্ঞানের সকর শাখার জ্ঞানই মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও সৃষ্টির কল্যাণের জন্য হতে হবে। আধুনিক শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীগণ একমত যে, শিক্ষিত মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাস সঞ্জীবিত করতে না পারলে কখনোই দুর্নীতি, স্বার্থপরতা ও হানাহানিমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।

এজন্য সকল শাখার মধ্যে ধর্মীয় শাখায় পারদর্শিতা অর্জনকে ইসলামে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি সকাল সকাল বা দ্বিপ্রহরে মসজিদে যেয়ে (ইমামের খুতবার পূর্বে) কোনো ভালো কিছু শিক্ষা লাভ করে অথবা শিক্ষা দেয়, তবে সেই ব্যক্তি একটি পরিপূর্ণ হজের নেকি লাভ করবে। (সহীহুত তারগীব-১/২০)

সাহাবি আবুযার রা. কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “হে আবুযার! তুমি যদি (মসজিদে) কুরআনের একটি আয়াত শিক্ষা করো, তবে তা তোমার জন্য ১০০ রাকআত নফল নামাজ আদায় করার থেকেও উত্তম। আর যদি তুমি জ্ঞানের এমন একটি অধ্যায় শিক্ষা করো উহা আমলকৃত বা আমলকৃত নয় তবে তা ১০০০ রাকআত নফল নামাজ আদায় করা থেকেও উত্তম। (ইমাম মুনযিরী, আত-তারগীব-১/৫৪, ২/২৩২)

অতএব সাধারণ জ্ঞান বা জাগতিক জ্ঞান অর্জন করা মোটেও নিষিদ্ধ নয়, তবে দ্বীনি ইলম বা কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানের মধ্যে নিজে ও নিজের সন্তানের অধিক মর্যাদা ও মুক্তির নিশ্চয়তা রয়েছে। আর যদি সন্তানকে জাগতিক শিক্ষায় পড়াতে চান তবে অবশ্যই তাদের প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান প্রথমে শেখাতে হবে। এটা আপনার আমার জন্য সার্বজনিন ফরজ। এজন্যে প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো, কুরআন কারিম পাঠ করা। আর অর্থসহ বুঝে পড়াকেই পাঠ বলে। কুরআন কারিম অর্থসহ বুঝে পাঠ করুন। দেখবেন আপনার জীবনকেই পাল্টে দিবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক : মাওলানা আখতারুজ্জামান খালেদ, ইমাম ও খতীব