• সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ইসলামের আলোকে বিপদ-মুসিবত : প্রসঙ্গ করোনা ভাইরাস

  প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

২১ মার্চ ২০২০, ২২:৪২
ইসলাম
ছবি : প্রতীকী

মহান আল্লাহর কাছে দুয়া করছি তিনি যেন আমাদেরকে এই মহামারি থেকে রক্ষা করেন। মহান আল্লাহ যেন তার শাফি (আরোগ্যদানকারী) নামের ওসিলায় সমগ্র মানবতাকে শিফা দান করেন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের হৃদয়ে মহান আল্লাহ যেন এই রোগের নিরাময়ের ইলহাম দেন। তার অশেষ রহমত ও নিয়ামতের মাধ্যমে আমাদের মত দুর্বল বান্দাদের হৃদয় থেকে যেন সকল ভয় ও দুঃশ্চিন্তা দূরে করে।

আজকে আমি ইসলামে বিপদ-মুসিবত বুঝার পন্থা নিয়ে আলোচনা করব। একজন মুমিন হিসেবে এই ধরনের মুসিবতসমূহ কিভাবে বুঝা প্রয়োজন? যেমনটা ধারণা করা হচ্ছে, সত্যি কি এটি একটি ইলাহি আজাব? নাকি কোন রহমত যা আমরা জানি না? কেউ কেউ মাঝে মধ্যে নিজেদের সীমানাকে অতিক্রম করে একে কিয়ামতের পূর্বক্ষণ বলে আখ্যায়িত করছেন। সত্যি কি তাই, নাকি কোন ইলাহি নিদর্শন বা শিক্ষা? আমাদের চিরন্তন ও শাশ্বত গ্রন্থ আল-কুরআন এই ব্যাপারে কী বলে? এসব ব্যাপারে রাসুলে আকরাম (সা.) এর উপদেশ কী?

আমার স্বল্প জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে এই বিষয়সমূহের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করব।

হ্যাঁ, বিশ্ব মানবতা এমন এক সমস্যার সম্মুখীন তা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। সমগ্র মানবতা খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন একটি জগতে প্রবেশ করেছে। হয়তবা এর পরের ইতিহাস করোনা ভাইরাসের আগে ও করোনা ভাইরাসের পরে এইভাবে লেখা হবে। তিন মাসের মত অল্প সময় আগে চীনের উহান শহরে উৎপত্তি হওয়া এই ভাইরাসটি সমগ্র মানবতাকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে। মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। দেশসমূহ তাদের সীমানাকে বন্ধ করে দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি জামায়াতে ইবাদতেও বিরতি দেওয়া হয়েছে। হয়তবা ইতিহাসে এই প্রথম কাবা শরিফ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তাওয়াফ ও সায়ি সকল কিছুই বন্ধ। মদিনা ও মসজিদে আকসাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সমগ্র মসজিদসমূহ আবিদ বান্দাদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! রাস্তা-ঘাট, শহর-নগর ফাঁকা, সকল মানুষ আজ গৃহবন্দী!

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বিশ্ব মানবতা প্রথমবারের মত এমন একটি মহামারিতে আক্রান্ত হয়নি। মানব জাতির ইতিহাস এ ধরনের মুসিবতে পরিপূর্ণ। এক অর্থে বলতে গেলে মানব জাতির ইতিহাস একই সাথে বালা-মুসিবত, বিপদাপদ, খরা, বন্যা ও দুর্যোগের ইতিহাস। কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, SARS, এইচআইভি, টিফু ইত্যাদি ছোঁয়াচে রোগে এর পূর্বেও অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।

ইসলামের ইতিহাসের শুরুতে খলিফা উমর (রা.) এর শাসনামলে طاعون عمواس‎ বা Plague of Emmaus এ ২৫ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এদের মধ্যে অনেক বড় বড় সাহাবিও ছিলেন। গত শতাব্দির শুরুতেও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই ইউরোপের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

আজকের এই ভাইরাসের সাথে আগের ঐ সকল মহামারির পার্থক্য কি?

প্রিয় ভাইয়েরা, আগের ঐ সকল প্লেগ বা মহামারির কোনটাই আজকের বা বর্তমানের এই ভাইরাসের সাথে মিলে না। ইতিহাসের কোন মহামারিও এই করোনা ভাইরাসের মত গ্লোবাল একটি মহামারিতে রূপ নেয়নি। হ্যাঁ, সমগ্র মানবতা আজ গ্লোবাল একটি মহামারির মুখোমুখি। সমগ্র মানবতা আজ একটি ভয় ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। এই মহামারির সামনে সমগ্র বিশ্ব-মানবতা আজ নিরুপায়।

আর এই মহামারি এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যে সময়ে মানুষ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই মহামারি সমগ্র মানবতাকে এমন এক সময়ে গ্রাস করেছে, যে সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষ বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং সমগ্র দুনিয়াকে ধ্বংস করতে সক্ষম এত বেশি পরিমাণে রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদন করেছে। ন্যানো টেকনোলজির মাধ্যমে যখন মানুষের জন্য নতুন এক যুগের সূচনা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে সেই সময়ে এই মহামারি দেখা দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ্যা ও ঔষধ সেক্টর যখন সর্বোচ্চ শৃঙ্গে অবস্থান করছে, মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার জন্য গবেষণা করছে, মহাকাশে জীবনের সন্ধান করছে সেই সময়ে এই মহামারি এসেছে। মানুষ যখন তার আবিষ্কার নিয়ে অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও হিংসায় লিপ্ত এই সময়ে এমন একটি ভাইরাস তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে যা মাইক্রস্কোপ ছাড়া দেখাও যায় না। আমরা সকলেই আজ গৃহবন্দি, অজানা এক পরিণতির জন্য সকলেই প্রহর গুনছি।

এই মুহূর্তে আমাদের ডাক্তার ও নার্সদের জন্য দুয়া করি, এই সময়ে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করছেন তারা। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাদেরকে ধৈর্যের সাথে সেবাদান করার তওফিক দান করুন।

গণমাধ্যম ও ডিজিটাল মিডিয়াসমূহ চীন থেকে ইতালি, ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত কি হচ্ছে না হচ্ছে তা মুহূর্তের মধ্যে সবার সাথে শেয়ার করে জানিয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু একটি বিষয়কে সবাই ভুলে যাচ্ছে! আর এটাই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়ের মানবিক, সামাজিক দিক নিয়ে এখনো কেউ কথা বলছে না। এর পেছনের আধ্যাত্মিক ও মেটাফিজিক্যাল দিক নিয়ে এখনো চিন্তা গবেষণা ও লেখালেখি শুরু হয়নি। অথচ এই বিষয়টি আর শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, স্বাস্থ্যগত বিষয় থেকে অনেক আগেই বের হয়ে গেছে।

অন্যান্য সকল বিষয়ের মত এই বিষয়েও মানুষজন মতভেদ করবে। বিজ্ঞানীগণ, দার্শনিকগণ, আলেম-উলামাগণ সকলেই তাদের নিজেদের অবস্থান থেকে এই বিষয়ে ব্যাখা দাঁড় করাবেন। এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র একটি দৃষ্টিকোণ থেকে নয় সামগ্রিক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে একটি ফলাফলে পৌঁছাতে পারব।

বিজ্ঞান এই বিষয়টি ব্যাখা করে তুলে ধরবে, দর্শন আমাদেরকে এই বিষয়ে চিন্তা করাবে আর দীন এটাকে অর্থবহ করে তুলবে। দীন বা ধর্মের দেওয়া অর্থ, বিজ্ঞানের ব্যাখা এবং দর্শনের দেওয়া চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে যাবে না। কারণ বিজ্ঞান মহান প্রভু কর্তৃক এই পৃথিবীতে স্থাপিত আয়াতসমূহের ব্যাখা দেয়। আর আকল ও চিন্তা হল মহান প্রভু কর্তৃক মানুষকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ইহসান।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, দীনের দেওয়া উচ্চ অর্থবহতার বদৌলতেই মানুষ সকল প্রকার ভয়ভীতিকে পরাভূত করেছে, সকল সন্দেহ ও সংশয়কে দূরীভূত করেছে, মৃত্যুর ভয়কে পাশ কাটিয়েছে, এমনকি কবির ভাষায় বলতে গেলে মৃত্যুকে হত্যা করেছে। আজকেও আমরা ইসলামের দেওয়া অর্থের মাধ্যমে আমরা যে সংকটময় সময় অতিক্রম করছি এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পারব। তবে এই ক্ষেত্রে আকল ও বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে নয়।

প্রিয় ভাইয়েরা, মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র নিজেদের চিন্তা ভাবনার আলোকে চলত তখন কোন বিপদ মুসিবত আসলে মাঝে মধ্য শুধুমাত্র কুসংস্কার, মাঝে মধ্যে শুধুমাত্র জ্যোতির্বিদ্যা দ্বারা ব্যাখা করার চেষ্টা করত। অধিকাংশ সময় এই সকল বিপদ-আপদকে স্রষ্টাদের মধ্যকার যুদ্ধ বলে অভিহিত করত, কিংবা মাঝে মধ্যে গজবের সাথে সম্পৃক্ত করত। মাঝে মধ্যে অসৎ লোকদের কারণে এই সব বিষয় হচ্ছে বলে চালিয়ে দিত। তাকবিন ও তানযিলকে একত্রকারী ওহি তথা ইসলাম, মানুষকে সকল প্রকার কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত করে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছে।

ইলাহি ওহি তথা মানুষ, মহাবিশ্ব ও ওহিকে যদি আমরা সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে, সব কিছুর পূর্বে এই সকল বালা-মুসিবত ইলাহি আদত বা অভ্যাস নয়, এগুলো এক একটি হল ইলাহি আয়াত বা নিদর্শন।

অনেক সময় ক্রোধ ও রাগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই এগুলোকে আজাব বলে অভিহিত করে থাকেন। এগুলো আসলে সেই অর্থে আজাব নয়। মহান আল্লাহ সুরা ফাতিরের ৪৫ নম্বর আয়াতে বলেন,

﴿وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَىٰ ظَهْرِهَا مِن دَابَّةٍ وَلَٰكِن يُؤَخِّرُهُمْ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۖ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِعِبَادِهِ بَصِيرًا﴾

‘যদি কখনো তিনি লোকদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করতেন তাহলে পৃথিবীতে কোন প্রাণসত্তাকে জীবিত ছাড়তেন না, কিন্তু একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তিনি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন৷ তারপর যখন তাদের সময় পুরা হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দেখে নেবেন৷’

সূরা ফুসসিলাতের ৪৬ নম্বর আয়াতে বলেন,

وَمَا رَبُّكَ بِظَلامٍ لِلْعَبِيدِ
‘তোমার রব তার বান্দাদের উপর মোটেই জুলুম করেন না।’

অনেকেই নিজেদের লিমিটকে ক্রস করে একে কিয়ামত বলে অভিহিত করছে। এটা মোটেই কিয়ামত নয়। কেননা কিয়ামত কখন হবে কোন নবিকে পর্যন্ত বলা হয়নি। আলামতসমূহ জানিয়ে দেওয়া আর কিয়ামতের সময় বলে দেওয়া এক কথা নয়।

প্রিয় ভাইয়েরা! হ্যাঁ, আমাদের উপর যে মুসিবত এসেছে, কুরআনের আলোকে এটি একটি আয়াত বা নিদর্শন। এই নিদর্শন বা আয়াত থেকে সকল মুমিনই ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা বের করবে। নিদর্শনসমূহ শিক্ষাসমূহের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং শিক্ষা বা ইবরতের উপর পড়তে হয় বা বুঝতে হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,

فَاعْتَبِرُوا يَاأُولِي الأبْصَارِ
‘হে দৃষ্টিশক্তির অধিকারীরা, শিক্ষা গ্রহণ করো।’

এই আয়াতটির আদেশ একদম এই সকল বিষয়েই। কুরআন নুহের তুফানের মত একটি ঘটনাকেও মুসিবত হিসেবে নয়, মানুষের জন্য একটি আয়াত বা নিদর্শন বলে ঘোষণা করেছে।
আল্লাহ বলেছেন,

وَجَعَلْنَاهُمْ لِلنَّاسِ آيَةً
‘সারা দুনিয়ার লোকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়ে পরিণত করলাম।’ [সুরা ফুরকান : ৩৭]

এই মুসিবতকে যখন একটি ইলাহি আয়াত হিসেবে পড়বে কেউ কেউ এর কারণকে মানুষ কর্তৃক দুনিয়াকে যথেচ্ছাভাবে ব্যবহার করার সাথে সম্পৃক্ত করবে। কেউ কেউ বলবে দুনিয়ার পক্ষে আর এত মানুষকে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না বলেই এমন হচ্ছে। কেউ কেউ একে কাশ্মীর, আরাকান, ফিলিস্তিন, উইঘুর, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের ট্রাজেডির সাথে সম্পৃক্ত করবে। বিভিন্ন দেশের সীমানা বন্ধ করাকে কেউ কেউ সিরিয়ান মুহাজিরগণ যেন ঐ সকল দেশে প্রবেশ করতে না পারে এর সাথে সম্পৃক্ত করবে। কেউ কেউ ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা মাসুম শিশুদের লাশের মধ্যে এর কারণ খুঁজে দেখবে। কেউ কেউ এর কারণকে এই ডিজিটাল ও ভোগ বিলাসের যুগে মানুষ কর্তৃক তার রুহকে, কালবকে, পরিবারকে এবং সর্বোপরি তার রবকে ভুলে যাওয়ার মধ্যে খুঁজবে। কেউ কেউ এই বন্দিদশার কারণকে মানুষ কর্তৃক তার পরিবার, সন্তান-সন্তুতিকে সময় না দেওয়ার মধ্যে খুঁজবে। কাবা, মসজিদে নববি, মসজিদে আকসা এবং অন্যান্য মসজিদসমূহ বন্ধ করে দেওয়ার কারণকে আমরা মসজিদে যাই না বলে এবং এগুলোকে আবাদ করি না বলে আমাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বন্ধ করা দেওয়া হচ্ছে এই কথা বলবে। কেউ কেউ এই কথা বলবে যে, দেখো তোমরা যারা এক হজ থেকে আরেক হজ, এক উমরা থেকে আরেক উমরা এবং এক জুমা থেকে অপর জুমাকে নিজেদের গুনাহ মাফের ওসিলা হিসেবে গ্রহণ করেছিলে এখান থেকে শিক্ষা নাও। কেউ কেউ একে আফ্রিকায় বছরের পর বছর ধরে খাবারের অভাবে মৃত শিশুদের অভিশাপের সাথে সম্পৃক্ত করবে। কেউ কেউ বলবে গাজার মানুষ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ, অবরুদ্ধ থাকলে কেমন লাগে এই শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে এই শিক্ষা দিচ্ছেন। কেউ কেউ আল্লাহ প্রদত্ত হালাল রিজিককে পরিত্যাগ করার মধ্যে এর কারণকে খুঁজে বের করবেন।

আমরা যদি আমাদের উপর আগত বিষয়সমূহকে একটি আয়াত বা নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে উপরের সবগুলো বিশ্লেষণই সঠিক। উপরে বর্ণিত বিষয়সমূহের উপর যদি মানুষ চিন্তা ভাবনা করে শিক্ষা গ্রহণ করে তাহলে মানুষ নতুন একটি রহমত পাবে।

মানুষ যখন এইভাবে চিন্তা ভাবনা করবে তখন সে নিজের আত্মসমালোচনা করতে পারবে। মানুষ দুনিয়ার সাথে তার সম্পর্ককে নতুন করে চিন্তা করবে। স্ত্রী, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার পরিজনের সাথে সম্পর্ককে নতুন করে বিন্যাস করবে।

যদি এই সকল বড় বড় অর্থবহ বিষয়কে পরিত্যাগ করে এই সকল বিপদ-মুসিবতকে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করে এগুলোকে ইলাহি আজাব ও কিয়ামত বলে চালিয়ে দেওয়া হয় তাহলে বুঝতে হবে যে কুরআনের আয়াতসমূহকে ভালোভাবে বুঝা যায়নি। এবং আমাদেরকে ইবরত বা শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে ইবারত তথা লেখার মধ্যে মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলবে। এই সকল মুসিবত থেকে শিক্ষা না নিলে আমাদের সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং আমাদের সংকট আরও গভীর থেকে গভীরতর হবে।

এ ধরনের মুসিবতসমূহকে ওহির আলোকে সঠিকভাবে না বুঝতে পারার অন্তরায়সমূহ হল :

প্রথমতঃ এসকল ঘটনাকে মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহকে পাশ কাটিয়ে যাবে এমনভাবে ব্যাখা করা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে বলেন,

﴿ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ﴾

‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যার ফলে তাদেরকে তাদের কিছু কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করানো যায়, হয়তো তারা ফিরে আসবে।

দ্বিতীয়তঃ এ ধরনের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করার সময় এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে বাদ দিয়ে ব্যাখা করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে বাদ দিয়ে, সুন্নাতুল্লাহকে বিবেচনায় না নিয়ে এসকল ঘটনাকে ব্যাখা করা হবে সবচেয়ে বড় ভুল।

তৃতীয়তঃ মানুষকে আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত করা (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহর নামে কথা বলা। যেমন এরূপ কথা বলা ‘এই অপরাধের কারণে আল্লাহ এই সমাজকে এই ধরনের শাস্তি দিয়েছেন।’ এরকম করে কথা বলা সঠিক নয়।

চতুর্থতঃ আল্লাহ যে সকল কারণ সৃষ্টি করেছেন সেগুলোকে বিবেচনা না করা। তদবিরকে বাদ দেওয়া। বিশেষ করে এধরনের মহামারির সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগের আদেশ, নিষেধ ও উপদেশসমূহ দীনেরই আদেশ, নিষেধ ও উপদেশ। ইসলাম একজন মানুষের জীবন রক্ষা ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধানকে সবচেয়ে বড় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

আমাদের প্রিয় রাসুল ১৪০০ বছর পূর্বে তার নিজের সময়ের জন্য মহামারি বা এ ধরনের রোগের বিপরীতে কোয়ারান্টাইনের মূলনীতিসমূহকে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ মানুষের কাছে নিয়ে যাবে না।’ ‘যদি কোথাও মহামারি দেখা দেয় তাহলে সেখানে প্রবেশ করবে না। তোমরা যেখানে অবস্থান করছ সেখানে যদি কোন ধরনের মহামারি দেখা দেয় তাহলে সেখান থেকে বেরও হবে না।’ প্লেগ রোগের কারণে হযরত উমর (রা.) শামে প্রবেশ না করলে শামের গভর্নর ও শাম বিজেতা রাসুলের অন্যতম সাহাবি উবাইদা ইবনুল জাররাহ তাকে বলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আল্লাহর তাকদির থেকে কি পালিয়ে যাচ্ছেন? জবাবে উমর (রা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর এক তাকদির থেকে পালিয়ে অন্য তাকদিরের দিকে যাচ্ছি।’

এই মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা যে সকল তদবিরকে গ্রহণ করতে পারি তাকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

১। আমি একটু আগেও বলেছি এই ভাইরাস যেন আমাদেরকে স্পর্শ করতে না পারে এই জন্য সতর্ক থাকা আমাদের দীনেরও নির্দেশ। আমাদের ঘরে অবস্থান করে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ও ভালোবাসাকে পুনরায় জাগ্রত করে পারি। মসজিদসমূহে যেতে না পারার কারণে আমাদের ঘর-বাড়িকে ইবাদতগাহে পরিণত করতে পারি।

২। যারা বিজ্ঞানী ও গবেষক তাদের উচিত হবে এই রোগের প্রতিষেধক ও চিকিৎসা বের করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো। এরকম একটি রোগের ঔষধ কিংবা প্রতিষেধক আবিষ্কার করা অনেক বড় একটি মর্যাদার বিষয়। মানুষকে ধ্বংস করার জন্য অস্ত্র উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে মানুষকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করা প্রয়োজন।

৩। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিষয় হল দুয়া, দুয়া এবং দুয়া। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা আল-আনয়ামের ৪২ ও ৪৩ নম্বর আয়াতে বলেন,

﴿وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَىٰ أُمَمٍ مِّن قَبْلِكَ فَأَخَذْنَاهُم بِالْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ لَعَلَّهُمْ يَتَضَرَّعُونَ﴾

‘তোমার পূর্বে অনেক মানবগোষ্ঠীর কাছে আমি রাসুল পাঠিয়েছি এবং তাদেরকে বিপদ ও কষ্টের মুখে নিক্ষেপ করেছি, যাতে তারা বিনীতভাবে আমার সামনে মাথা নত করে৷’

﴿فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُم بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا وَلَٰكِن قَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾

‘কাজেই যখন আমার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কঠোরতা আরোপিত হলো তখন তারা বিনম্র হলো না কেন? বরং তাদের মন আরো বেশি কঠিন হয়ে গেছে এবং শয়তান তাদেরকে এ মর্মে নিশ্চয়তা বিধান করেছে যে, তোমরা যা কিছু করছো ভালোই করছো৷’

প্রিয় বন্ধুগণ, আমরা আমাদের হাত তুলে মহান প্রভুর কাছে এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য দুয়া করব এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের যেন এমন একটি সময় বরাদ্দ থাকে যখন আমরা আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাত তুলে মহান রবের কাছে দুয়া করব।

তবে সবচেয়ে বড় দুয়া হল ফি’লি দুয়া বা প্রাক্টিক্যাল দুয়া। আজ থেকে আমাদের দুয়াকে ভালো কাজে রূপান্তর করার চেষ্টা করি। আসুন সকলেই মানুষের কল্যাণে নামি। যারা তাদের বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে পারছেন না তাদেরকে বাসা ভাড়া ব্যবস্থা করে দেওয়া সবচেয়ে বড় দুয়া। যে সকল কর্মচারীগণ এই কঠিন সময়ে কাজে যেতে পারছেন তাদের বস কিংবা মালিকের উচিত হবে তাদের বেতনে কোন ধরনের কমতি না করে তাদের বেতন দিয়ে দেওয়া। এটাই হবে তাদের জন্য বড় দুয়া। যারা কোন কারণে বাজার করতে পারেন না তাদেরকে বাজার করতে সাহায্য করাই হবে বড় দুয়া। আল্লাহর রহমত নিয়ে আসবে এবং মুসিবত দুরীভূত করবে এমন দুয়া হল এই কঠিন সময়ে মানুষের কল্যাণের জন্য আন্দোলন শুরু করা। একে অপরের কল্যাণে এগিয়ে আসা এখন সবচেয়ে বড় দুয়া। আমরা হয়তো মুসাফাহা কিংবা কোলাকুলি করতে পারছি না, কিন্তু একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে এসে মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারব। আল্লাহ আমাদের দুয়াকে কবুল করুন, আল্লাহ আমাদের দুয়া কবুল করুন।

আমি আমার আজকের এই আলোচনা অসুস্থতা ও নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন নবি আইয়ুব (আ.) এর দুয়া দিয়ে শেষ করতে চাই,

أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
‘আমি রোগগ্রস্ত হয়ে গেছি, আর তুমি করুণাকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাকারী।’

অনুবাদক, মুহাম্মদ বুরহান উদ্দিন

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড