• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন

সুরা ফাতিহার তাফসির [শেষ পর্ব]

  মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির

০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:২২
কুরআন
ছবি : সংগৃহীত

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
‘তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাজিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।’ [সুরা ফাতিহা, ১ : ৭]

ব্যাখ্যা :

কুরআন হলো ফুরকান বা সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী। তাই কুরআনে যেসমস্ত ভালো দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার বিপরীত মন্দ দিকগুলোর ব্যাপারেও সচেতন করা হয়েছে। ইমানের বিপরীতে কুফর, তাওহিদের বিপরীতে শিরক, জান্নাতের বিপরীতে জাহান্নাম, আলোর বিপরীতে অন্ধকার, হিদায়াতের বিপরীতে গোমরাহি কুরআন স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। কারণ প্রত্যেক ভালোর বিপরীত মন্দটারও ধারণা থাকা দরকার। তাহলেই ভালো-মন্দের পার্থক্য করা সম্ভব।

পূর্ববর্তী আয়াতে সত্য ও সঠিক সঠিক পথের পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য আলোচনার পর এবার আল্লাহ তায়ালা এর বিপরীত পথের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। আর তা হলো গজবপ্রাপ্ত ও পথভ্রষ্টদের পথ। আয়াতে الْمَغْضُوب বা ‘গজবপ্রাপ্ত’ হলো ইহুদি সম্প্রদায়, আর الضَّالِّين বা ‘পথভ্রষ্ট’ হলো খৃস্টান সম্প্রদায়। কুরআনে বহু জায়গায় ‘মাগদুব’ বিশেষণটি আল্লাহ তায়ালা ইহুদিদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। 

بِئْسَمَا اشْتَرَوْا بِهِ أَنفُسَهُمْ أَن يَكْفُرُوا بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ بَغْيًا أَن يُنَزِّلَ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۖ فَبَاءُوا بِغَضَبٍ عَلَىٰ غَضَبٍ ۚ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ مُّهِينٌ

‘যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিক্রি করেছে, তা খুবই মন্দ; যেহেতু তারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তা অস্বীকার করেছে এই হঠকারিতার দরুন যে, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অনুগ্রহ নাজিল করেন। অতএব, তারা গজবের পর গজব অর্জন করেছে। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।’ [সুরা বাকারা, ২ : ৯০]

قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُم بِشَرٍّ مِّن ذَٰلِكَ مَثُوبَةً عِندَ اللَّهِ ۚ مَن لَّعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوتَ ۚ أُولَٰئِكَ شَرٌّ مَّكَانًا وَأَضَلُّ عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ

বলুন, আমি কি তোমাদেরকে বলব না যে, তাদের মধ্যে কার মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, যাদের কতককে বানর ও শুকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন। আর যারা তাগুতের উপাসনা করেছে, তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে। [সুরা মায়িদা, ৫ : ৬০]

إِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَذِلَّةٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُفْتَرِينَ

‘যারা গোবৎসকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে, অবশ্যই তাদের উপর তাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে পার্থিব এ জীবনেই গজব ও লাঞ্ছনা এসে পড়বে। এমনি আমি অপবাদ আরোপকারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।’ [সুরা আরাফ, ৭ : ১৫২]

আর খৃস্টানদের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে ضَالّ বা ‘পথভ্রষ্ট’ বিশেষণটি। যেমন : 

وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِن قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ

‘ঐ সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বেই পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। আর তারা সুনিশ্চিতই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।’ [সুরা মায়িদা, ৫ : ৭৭]

যদিও সাধারণভাবে ইহুদি-খৃস্টান উভয় সম্প্রদায়ই গজবপ্রাপ্ত ও গোমরাহ, কিন্তু সুরা ফাতিহার উপরোক্ত আয়াতে ইহুদিদেরকে গজবপ্রাপ্ত ও খৃস্টানদেরকে গোমরাহ বিশেষণে বিশেষিত করার সূক্ষ্ম কারণ হলো, ইহুদিরা সত্যকে চিনতে পেরেছিল, তাদের ইলম ছিল, কিন্তু এরপরও তারা ইচ্ছাকৃত সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, এমনকি সত্যকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন করেছিল, আর তাই তাদেরকে আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। এটাই তাদের উপযুক্ত বিশেষণ। আল্লাহ বলেছেন, 

لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُواْ مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَّكَانُواْ يَعْتَدُونَ

‘বনি ইসলাইলের মধ্যে যারা কাফির, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়মতনয় ইসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত।’ [সুরা মায়িদা, ৫ : ৭৮]

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ ۖ وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

‘আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা (ইহুদিরা) তাকে (নবিকে বা সত্যকে) চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদেরকে। আর নিশ্চয়ই তাদের একটি সম্প্রদায় জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে।’ [সুরা বাকারা, ২ : ১৪৬]

আর খৃস্টানরা ছিল সত্যের ব্যাপারে অজ্ঞ, মূর্খ। এ ব্যাপারে তাদের কোনো ইলম ছিল না। তারা ছিল উদ্ভ্রান্ত, দিশাহীন। সুতরাং ‘পথভ্রষ্ট’ই হলো তাদের উপযুক্ত বিশেষণ। 

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সমস্ত বাতিল, গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট দল, মত, পথ থেকে হিফাজত করুন এবং সিরাতুম মুসতাকিম তথা সরল, সঠিক ও সোজা পথে অটল-অবিচল রাখুন। সুরা ফাতিহার শিক্ষাকে জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন। 

আল্লাহর অনুগ্রহে সুরা ফাতিহার তাফসির সমাপ্ত। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড