• শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আল-আকসা থেকে বাবরি মসজিদ : আগ্রাসনের একই সূত্র

  ধর্ম ও জীবন ডেস্ক

০৯ নভেম্বর ২০১৯, ২০:৫৪
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ
ছবি : সংগৃহীত

বাবরি মসজিদকে যে মিথ্যা উদ্ভট অভিযোগে ভেঙে ফেলা হয়েছে ঠিক একই অভিযোগের খড়গ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে মসজিদে আকসার উপরেও। জায়োনিস্টদের দাবি—হাইকালে সুলাইমানির জায়গায় আল-আকসা মসজিদ বানানো হয়েছে। এই দাবির পেছনে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ জোগাড় করার জন্য তারা মসজিদে আকসার তলদেশে খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। মসজিদে আকসা একরকম ভাসমান ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। বড় ধরনের যেকোন ভূকম্পন মসজিদকে যে কোনো সময় ধসিয়ে দিতে পারে। কুদসবাসী বারবার মুসলিম বিশ্বের কাছে জায়োনিস্টদের এই চক্রান্তের কথা তুলে ধরে সাহায্য চেয়েও হতাশ হয়েছে। আল-আকসার জায়গায় নতুন হাইকালে সুলাইমানি বানানোর নকশা জায়োনিস্টরা অনেক পূর্বেই বানিয়ে রেখেছে। নিজেরা আকসাকে ভাঙার মতো রিস্ক না নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে আকসার ভেঙে পড়ার জন্য অপেক্ষা করছে মাত্র। কোনোদিন আকসা ভেঙে পড়লে ইহুদিরা কোনোদিনই সেই জায়গায় নতুন করে মসজিদে আকসা নির্মাণ করতে দিবে না। বরং সেখানে হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণ করবে। এটা নিছক দুশ্চিন্তা নয়; বরং এমনটাই ঘটবে, যদি অপ্রত্যাশিত কোনো পরিবর্তন না ঘটে।

সবকিছু কেমন জানি গা-সওয়া হয়ে গেছে। বাবরি মসজিদকে যে দিন ভাঙা হয় সে দিনের চেয়ে আজকের দিনটা কোনোভাবেই কম বেদনাদায়ক নয়। তারপরেও সে দিনের প্রতিক্রিয়ার সাথে আজকের প্রতিক্রিয়ার আকাশ-পাতাল তফাৎ। আজ যেমন কোন কোন মুসলিম এই রায়কে মেনে নিয়ে শান্তি বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছে, ঠিক অদূর ভবিষ্যতে আকসার জায়গায় হাইকালে সুলাইমানি দেখেও এভাবেই শান্তি বজায় রাখার পরামর্শ দেবে।

বাবরি মসজিদ ইস্যু উপমহাদেশে মোটামুটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। নতুবা মসজিদ বিলুপ্ত করার ঘটনা একদমই কম নয়। আমাদের কাছে তার সংবাদ পৌঁছায় না কেবল। ‘ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা’ নামে আরবের একটি সংস্থা এমন ২০০০ মসজিদের বিবরণ নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছে, যেগুলোকে নিকট অতীতে গির্জা, মিউজিয়াম, নাট্যশালা এবং নাইট ক্লাব ইত্যাদিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগ ঘটেছে পূর্ব ইউরোপের সাবেক অটোমান শাসিত দেশে। যেমন গ্রিস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ইত্যাদিতে। অধিকৃত ফিলিস্তিনেও আছে প্রচুর। সম্ভবত এই তালিকায় স্পেনের মসজিদগুলোকে ধরা হয়নি, যেগুলোকে খ্রিস্টানরা গির্জায় রুপান্তরিত করেছিল। মিসরের প্রসিদ্ধ গবেষক ডক্টর আব্দুস সালাম বাসয়ুনি 'যেসব মসজিদের ওপর ক্রুশ ঝুলানো হয়েছে' শিরোনামে একটি সচিত্র প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই কিতাবেও তিনি ছবিসহ সেসব মসজিদের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন যেগুলোকে পরবর্তীতে গির্জা, মিউজিয়াম ইত্যাদিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। গুগলে এই কিতাবের একটি সংক্ষিপ্ত অংশ পাওয়া যায়।

মসজিদ নিছক একটি ইবাদাতের স্থান নয় যে, এটা ভেবে নিশ্চুপ থাকা যাবে যে, এক জায়গায় ভাঙা হয়েছে তো কী হয়েছে? আমরা অন্যত্র বানিয়ে নেব। বরং মসজিদ ইসলামের রুহ, প্রতীক। এর সাথে গোটা ইসলামই জড়িত রয়েছে। মসজিদ সরানোর প্রচেষ্টাকে কোনোভাবেই খাট করে দেখার সুযোগ নেই। এটাকে দেখতে হবে ইসলামের ওপর বহুমাত্রিক আগ্রাসনের একটি রূপ হিসেবে। এটা ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সমাজের আচরণ দেখলেও স্পষ্ট বোঝা যায়। হিন্দুরা চাইলেই বাবরি মসজিদের পাশেই একটি মন্দির বানাতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। বরং বাবরি মসজিদকেই ভেঙে তার স্থানেই মন্দির নির্মাণ করার জন্য গো ধরে বসেছিল দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে। একটুও পিছ পা হয়নি। 'মন্দির ওয়াহাঁ বনেগা' স্লোগানই বিজেপির রাজনীতির মূল রসদে পরিণত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতের আইন বিভাগও মৌলবাদী হিন্দুদের কাছে মাথা নত করল। ভারতের সবকিছুই যে হিন্দুত্ববাদী স্বৈরাচারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এই রায় তার একটি বড় প্রমাণ। কিন্তু আফসোস তখনই লাগে, যখন মুসলমানরা উদার-লিবারেল সাজতে গিয়ে এসবকে স্বাভাবিক এবং সহনীয় করে তোলার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়।

এভাবে মসজিদ ভেঙে ফেলা কিংবা রূপান্তরিত করার ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা ইসলামকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করার বৈশ্বিক লড়াইয়ের অংশ। পশ্চিমে হিজাব নিষিদ্ধকরণ, মসজিদে গুলিবর্ষণ, ভাঙচুর, ইসলামিক কালচারাল সেন্টারগুলোকে হয়রানিসহ যাবতীয় ইসলামোফোবিক আচরণ একই সূত্রে গাঁথা। ভারতে নরেন্দ্র মোদী যা করছে ফ্রান্সে ম্যাক্রোঁও সেই ধরনের কাজই করছে। তবে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে গিয়ে একটু আইনের লেভেল লাগাচ্ছে। এই কারণে বাবরি মসজিদের বিরুদ্ধে আজকের রায় লিবারেল পশ্চিমা জগতে কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেনি। কিন্তু তুরস্ক, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে যদি একটি মন্দির কিংবা গির্জার স্থানে মসজিদ বানানো হতো তাহলে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হতো তা সহজেই অনুমেয়।

লিখেছেন, নুসায়ের তানজিম চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড