• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল বাদশাহ আবরাহার বিশাল হস্তিবাহিনী

  ধর্ম ও জীবন ডেস্ক

০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:২০
হস্তিবাহিনী
ছবি : প্রতীকী

আজকের ইয়েমেন, ৫৭০ সালে অক্সাম সাম্রাজ্য বা ইথিওপিয়ান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। ইয়েমেন ছিল গভর্নর শাসিত। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের পছন্দের লোকদেরকে ভাইসরয় নিয়োগ দিত। ইয়েমেনের তেমন একজন ভাইসরয়ের নাম আবরাহা আল-আশরাম। অসহিষ্ণু, উগ্র এবং প্রচণ্ড জেদি। আর এমন দোষে দুষ্টু শাসকেরা নিজেকেই একমাত্র মান্যবর মনে করে থাকে।

মক্কার বাইতুল্লাহর প্রতি মানুষের অত্যধিক টান তার কিছুতেই ভালো লাগত না। সে মনেপ্রাণে চাইতো, মানুষ দলেদলে তার সিংহাসনের চারদিকে জড়ো হয়ে তাকেই প্রণাম করুক। সে বাইতুল্লাহ থেকে আরও বড়, সাজানো গোছানো এবং নান্দনিক একটি চার্চ ইয়েমেনের প্রাণকেন্দ্র সানাতে প্রতিষ্ঠা করল। নির্মাণ শৈলিতে তৎকালীন যুগে আলোড়ন সৃষ্টি করার মতোই স্থাপনা ছিল সেটি। সব ঠিকঠাক করে মক্কাবাসীকে বলা হল, তারা যেন পুরাতন ঘরে (কাবা ঘর) ইবাদত বাদ দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ নতুন চার্চে এসে ধর্মকর্ম করে।

এসব ঘোষণা কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। যেইসেই। মক্কার অধিবাসীরা বাইতুল্লাহকে তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়ই রেখে দিল। আবরাহা তা দেখে বেশ ক্ষিপ্ত হয়। বাইতুল্লাহকে চূর্ণবিচূর্ণ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে অগ্রগামী দল পাঠিয়ে মক্কার যুবক এবং উট কব্জা করে ফেলে। যাতে প্রতিরোধের কোন পথ মক্কাবাসীদের না থাকে। সাথে যুদ্ধ প্রস্তুতি সংক্রান্ত একটি প্রস্তুতিপত্র পাঠায়। তাতে এমন ভয়াবহ যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়, যা সামাল দেয়া মক্কাবাসীর পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এমনকি পুরো আরবের অস্ত্রও যদি এক করা হয় তবুও আবরাহার অস্ত্রশস্ত্রের অর্ধেক হবে না।

আবরাহা সৈন্যবাহিনীর বিশাল বহর নিয়ে বায়তুল্লাহ অভিমুখে রওয়ানা হয়। চারদিকে রণঝংকার। তার বহরের আকর্ষণ ছিল বিশাল দেহী হাতি। সে নিজেও এমন হাতির পিঠে চড়ে যা মক্কার লোকেরা ইতোপূর্বে দেখেনি। আধুনিক যুগের ট্যাঙ্কের মতো ছিল হাতিগুলো। মক্কার লোকেরা বাধা দেয়নি। আব্দুল মুত্তালিব শুধু বলেছিলেন, ‘এই ঘরের মালিকই তাঁর ঘর শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবেন।’

আবারাহা দলবল নিয়ে মক্কার প্রাণকেন্দ্রে উপস্থিত। স্থানীয়রা পাহাড়ের আড়ালে লুকায়িত। শুধু নেতৃস্থানীয় কিছু লোক উপস্থিত ছিলেন। পবিত্র কাবাকে ধূলায় পরিণত করতে আবরাহা প্রস্তুত। হঠাৎ পশ্চিমাকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। ক্ষণিকের মধ্যেই মেঘের মতো কিছু এসে আবরাহার পুরো বাহিনীকে ঘিরে ফেলে। আসলে তা মেঘ ছিল না। অগণিত ছোট ছোট পাখি একসাথে দলবেঁধে ডানা মেলে উড়ে আসায় মেঘের মতো মনে হয়েছে।

পাখিগুলো দেখতে চড়ুইয়ের মতো। নাম আবাবিল। প্রতিটি আবাবিলের সাথে তিনটি করে নুড়ি পাথর ছিল। দুটো দুই পায়ের নখে, আরেকটি ঠোঁটে। সেই পাথর কণার সাইজ ছিল ছোলা বুটের মতো। আবরাহার দল যখন কাবা ধ্বংসের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় তখনই আকাশ থেকে আবাবিল নুড়ি ফেলতে থাকে। একসাথে পুরো বাহিনীর উপর। যেন পাথরের বৃষ্টি। পাথর কণা যার উপরই পড়েছে সেই লুটিয়ে পড়ছে। একটু নাড়াচাড়া দেয়ার হিম্মতও তাদের ছিল না। স্পট ডেড। এক একটি পাথর ছিল এ যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী মিসাইল। পুরো দলের সব শেষ। আবরাহা হয় রক্তাক্ত। আল্লাহ হয়ত তাকে কিছুক্ষণের জন্য জীবিত রেখেছিলেন অপমানের গ্লানি বয়ে বেড়ানোর জন্য। যুদ্ধে ভয়াবহ পরাজয়ের পর বুক ফুলিয়ে আসা লোকটি রক্তাক্ত দেহ এবং ছেঁড়া কাপড় নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে প্রস্থান করে। তার এমন লজ্জাকর প্রস্থান দেখে মক্কাবাসী বেশ আনন্দ উপভোগ করে। হাত তালি দিয়ে ফূর্তি করে। তবে আবরাহা আর নিজ দেশে যেতে পারেনি। পথিমধ্যেই মারা যায়।

সেই বছরটাকে ইতিহাসে আমুল ফিল বা হস্তির বছর বলা হয়ে থাকে। আর ঐ বছরই প্রিয় রাসুল (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। কুরআনে এই হস্তিবাহিনীর এই ঘটনাকে চিত্রায়ন করা হয়েছে এভাবে : 

‘আপনি কি দেখেননি, আপনার পালনকর্তা হাতিওয়ালাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? তিনি তাদের উপর প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, যারা তাদের উপর পাথরের কাঁকর নিক্ষেপ করেছিল। অতঃপর তিনি তাদেরকে করে দেন ভক্ষিত তৃণসদৃশ।’ [সুরা ফিল] 

পৃথিবীর যত দাম্ভিক রাজা বাদশাহ ছিল আল্লাহ সবগুলোকে শায়েস্তা করেছেন একদম দুর্বল এবং ক্ষুদ্র বস্তু দিয়ে, যা তারা কখনো কল্পনা করেনি। নমরুদ, ফেরাউন থেকে আবরাহা কেউ কিন্তু খুব বড় কোন আক্রমণে নিহত হয়নি। মশার কামড়ে, পানিতে ডুবে বা পাখির মুখ থেকে ফেলা পাথরের আঘাতে নাস্তানাবুদ হয়েছে। আল্লাহ দেখিয়ে দিয়েছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাদশাহকে মারতে তাঁর জন্য একটি মশা বা একটি পাথর কণাই যথেষ্ট। 

সুতরাং আল্লাহর ক্ষমতার বিপরীতে যারা ক্ষমতা দেখায় তাদের পরিণতি যুগে যুগে এমনই হয়ে আসছে।

লিখেছেন, মাওলানা নজরুল ইসলাম, ধানমন্ডি। 

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড