• শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০ ফাল্গুন ১৪২৫  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন

দায় এড়াতে পারে না দূতাবাস

হজরত আলীসহ ২১৫ কুয়েত প্রবাসীকে ফিরতে হবে  

  রাশিম মোল্লা ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৩

কুয়েত প্রবাসী
ছবি : সংগৃহীত

প্রবাসী হজরত আলী। কুয়েতের লেসকো কোম্পানিতে চাকরি করেন। ৮ লাখ টাকা খরচ করে পরিবারের সুখের স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমান। কুয়েত যাওয়ার পর বিপত্তির বেড়াজালে পড়ে হজরত আলি। গত চার মাস ধরে তার বেতন হয় না। ফলে দেশে থাকা পরিবারের জন্য পাঠাতে পারছেন না কোনো অর্থ। তার স্বপ্ন যেন প্রতিনিয়তই দূর থেকে দূরে আরও দূরে… 

শুধু কি তাই। হজরত আলী যেখানে থাকেন সেই ব্যারাকে নেই পানি, রুমে নেই বিদ্যুৎ, খাদ্য নেই। ফলে অনেকটা অনাহারেই দিন কাটছে তার। গত ১৭ই জানুয়ারি সকালে এমন দুর্দশার কথা জানাতে অন্যদের সঙ্গে যান বাংলাদেশ অ্যাম্বাসিতে। কিন্তু অ্যাম্বাসি কর্মকর্তাদের তাদের দুর্দশার কথা শোনার সময় নেই। নামকাওয়াস্তে তাদের কথা শুনে চলে যেতে বলেন। ফলে উত্তেজিত হন প্রবাসীরা। 

কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাও করার আগে হজরত আলীর মতো আরও অনেকেই ফেসবুকে লাইভে তাদের এমন দুর্দশার কথা জানান। এসব লাইভে তারা জানান, সাত থেকে আট লাখ টাকা খরচ করে কুয়েতে এসেও আমরা ভালো নেই। বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির ব্যবহার আমাদের ঘাড় ধাক্কা মেরে বাইরে ফেলে দিচ্ছে। দয়া করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি আমাদের সুব্যবস্থা করেন। 

তারা বলেন, লেসকো কোম্পানির জালিয়াতি সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ওরা আমাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করছে না। আমাদের আকামা নেই। থাকা ও খাওয়ার জায়গা নেই। অথচ বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কাছে কোনো বিচার পাচ্ছি না। প্রবাসীদের টাকা নিয়ে তারা রাজকীয় জীবনযাপন করেন। অথচ আমাদের খোঁজ নেয়ার সময় তাদের পা মাটিতে পড়তে চায় না। এ অবস্থার অবসান চাই। 

এদিকে, কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ২১৫ বাংলাদেশিকে ফিরতেই হচ্ছে। তবে তাদের বেতন ও ভাতাসহ সব ধরনের বকেয়া পরিশোধ করতে লেসকো কোম্পানিকে নির্দেশনা দিয়েছে কুয়েত সরকার। সব ধরনের বকেয়া বুঝিয়ে দেয়ার পরই তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। 

প্রবাসীরা জানায় প্রবাসীরা দূতাবাসে তাদের দুর্দশার কথা একাধিকবার জানিয়েছেন। কিন্তু দূতাবাস এই সমস্যার সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দূতাবাসে গেলে কর্মকর্তারা উল্টো তাদের সঙ্গে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আচরণ করেন। খারাপ ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেন। একপর্যায়ে তারা দূতাবাস ভাঙচুর করেন। 
এমন পরিস্থিতিতে দূতাবাস কর্মকর্তাদের কি কোনো দায় নেই? তারা মোটেও এর দায় এড়াতে পারেন না। চার মাস বেতন না পেলে কারো মাথাই ঠিক থাকে না। হয়তো তারা প্রথমে একটু উচ্চবাচ্য করেছেন। কিন্তু কেন করছেন সেটাও তাদের ভাবা উচিত ছিল। কিন্তু তারা পাত্তাই দেননি। বরং তাদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করেছেন। একপর্যায়ে তারা দূতাবাস ভাঙচুর করেছেন। আর কর্মকর্তারা পুলিশ ঢেকে তাদেরকে হেনস্তা করেছেন। বিপুলসংখ্যক প্রবাসীকে আটক করেছে কুয়েত পুলিশ।

প্রশ্ন, প্রবাসীরা এমন অন্যায় কাজটি কেন করলেন? তারা কি জানেন না কুয়েত পুলিশ এহেন কর্মের জন্য তাদেরকে নাস্তানাবুদ করবে। প্রবাসীরা জানেন কুয়েতের আইন খুবই কড়া। অপরাধ করে কেউ বাঁচতে পারে না। তারপরও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আসলে এই ভাঙচুরের নেপথ্যে কী ছিল? এই বিষয়ে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। কুয়েত দূতাবাসের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা। তাদের বিরুদ্ধে প্রবাসীদের রয়েছে হাজারো অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসহযোগিতার ক্ষোভ। 

বেশ কয়েক মাস আগে এমনই একটি ঘটনা ঘটে প্রবাসী নাহিদের সঙ্গে। নাহিদের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা থানায়। বর্তমানে তিনি লেসকো কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি জানান, এই কোম্পানিতে চাকরি নেয়ার আগে অন্য একটি কোম্পানিতে আমার খুব ভালো বেতনের চাকরির সুযোগ ছিল। কিন্তু এর আগে পাসপোর্ট নবায়নের জন্য দূতাবাসে জমা দিই। ১৫ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট দেয়ার কথা। কিন্তু সেই পাসপোর্ট এক মাসেও পাইনি। অ্যাম্বাসিতে যোগাযোগ করলে উল্টো তারা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তারা বলেন, আমাদের অনেক কাজ আছে। আপনার চাকরি হলো কি গেল, তা আমাদের দেখার বিষয় নয়। অবশেষে ওই চাকরিতে যোগ দিতে না পেরে এই লেসকোতে যোগ দিই।  

জানা গেছে, পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে ধার-দেনা করে, ভিটেমাটি বন্ধক রেখে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায় ভিসা কিনে কুয়েত আসেন। দালালদের ফাঁদে পড়া আকামাহীন এসব শ্রমিকের চার-পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে। এতে তাদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। আকামা না থাকায় পুলিশি হয়রানির শিকার হন তারা। কোম্পানির এসব শ্রমিক মসজিদ ধোয়ামোছা, রাস্তাঘাট পরিষ্কার করাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তারা কর্মস্থলে অর্থকষ্ট, অনাহার, আতঙ্ক ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত এসএম আবুল কালামের কাছে দালালদের নাম ও পাসপোর্ট কপি এবং ভুক্তভোগী শ্রমিকদের নাম ও সিভিল আইডি নম্বরসহ লিখিত অভিযোগ দেন। 

শ্রমিকরা জানান, আমাদের সঙ্গে অনেক ইন্ডিয়ান রয়েছে। তারা এই ঘটনা শোনার পর বলেন, আমাদের দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তা আমাদের সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন। কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেন। অথচ আমাদের দূতাবাস আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। এই দেশে আসার পর ভালো চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন একজন। গত ১৮ জানুয়ারি জিটিসি কোম্পানির রমজান আলী নামে এক বাংলাদেশি পাঁচতলা বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। রমজান আলী তিন কন্যা ও এক ছেলের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কুয়েতে আসেন। কিন্তু লাশ হয়ে দেশের বাড়ি গোপালগঞ্জে ফেরেন। মৃত্যুর কারণ, জিটিসি কোম্পানিতে আট-নয় মাস ধরে কোনো কাজ নেই, আকামা নেই। রিলিজ নিয়ে অন্য কোম্পানিতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও কোম্পানি অতিরিক্ত টাকা চাওয়ার কারণে তাও হয়নি। 

লেখক: সেক্রেটারি জেনারেল, সেভ দ্য  সোসাইটি এন্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম

ওডি/ এজেড
 

প্রবাস জীবন, আকাঙ্খা, প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সমীকরণ সবই লিখুন দৈনিক অধিকারকে [email protected] আপনার প্রবাস জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতিও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড