• শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জাতি কী তবে নীতিগতভাবে পঙ্গু হওয়ার পথে?

  রহমান মৃধা

০২ আগস্ট ২০২২, ১৮:২৮
জাতি কী তবে নীতিগতভাবে পঙ্গু হওয়ার পথে?
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

অধিকার চাওয়া তারই সাজে কর্তব্য পালন করে যে। কর্তব্য এবং দায়ভার পালন করে যে তারই চাওয়া পাওয়ার অধিকার থাকার কথা। সেবা দেওয়া, সেবা নেওয়া বাবা-মা, গুরুজন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সকল স্তরের কর্মচারীর নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্যের মধ্যেই কিন্তু পড়ার কথা।

কিন্তু পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতেই শোষণ এবং শাসনের দাপোটে ঢাকা পড়ে গেছে মানব জাতির এই মূলমন্ত্রটি, যার ফলে মাঝে মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে চলছে, যেমন- বাবা-মাকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, কাজের লোকের প্রতি অন্যায়, অবিচার বা অত্যাচার করা, সমাজের প্রভাবশালী লোকের কাছে সাধারণ মানুষের লাঞ্ছিত হওয়া, শিক্ষক বা গুরুজনকে পুকুরে নিয়ে পানিতে চুবানো ইত্যাদি।

বিশ্বে যুদ্ধ চলছে, টাকার মান কমেছে তবে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে চলছে। পুঁজিবাদীরা যাতে সমস্যায় না পড়ে তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলছে যেমন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সুদের হার বাড়িয়ে পুঁজিবাদীদের সন্তুষ্ট করছে। বেচারা গরীব মেহনতি মানুষের জীবনে যে ঝড় বয়ে চলছে তাতে কারও কিছু যায় আসে না।

সমাজটা এভাবেই যেন স্থাপন করা হয়েছে; তাই যখন প্রভাবশালী কাউকে কিছু করা বা বলা হয় ঠিক তখনই ঝড় তুফানের সৃষ্টি হতে দেখা যায়! এটা যে শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা নয়, এটা গোটা বিশ্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কিন্তু এমন তো কথা ছিল না আল্লাহর সৃষ্টিতে!

মূলত সম্মান, বোধগম্যতা, সহনশীলতা, সহযোগিতা, আবেগ, অনুরাগ, ভালোবাসা এর সব কিছুই হবার কথা পারস্পারিক সম্মানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেটা সমাজ তথা দেশ থেকে বিলীন হবার পথে। শুধুমাত্র ক্ষমতা এবং অস্ত্রের বলেই সম্মান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। যার ফলে যার যতো ক্ষমতা সেই ততো বাহাদুর সেজে শিক্ষক থেকে শুরু করে বাড়ির কেয়ারটেকারকেও অপমান করতে দ্বিধাবোধ করছে না।

তাছাড়া কাজের লোকটিকে অবমাননা করা বা অন্যায়ভাবে তার উপর জুলুম বা অত্যাচার করা সমাজের চোখে যে অপরাধ কখনো সেটা মনে হয় না, বিশেষ করে বাংলাদেশে, যদিও তারাও কিন্তু সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছে। ডাক্তার, শিক্ষক যেমন সেবা প্রদান করছে বিনিময়ে মজুরি পাচ্ছে ঠিক বাড়ির কাজের লোকটাও কিন্তু একই পেশায় নিয়োজিত কিন্তু তাকে যখন কিল, ঘুষি বা অবমাননা করা হচ্ছে তখন সমাজের কেউ কিছু বলছে না কিন্তু যখন একজন শিক্ষককে অবমাননা করা হলো ব্যাস সারাদেশে হইহুল্লোড় পড়ে গেল!

আমি নিজে গুরুজনদের সম্মান করি, পাশাপাশি বাড়ির কাজের লোকটিকেও কিন্তু ভালোবাসি, সম্মান করি। কাজের লোকটার মতো কিন্তু প্রশাসনের ‘টপ টু বটম’কর্মচারীর সেবা দেওয়া কথা, হচ্ছে কী সেটা মনঃপূত? সেটা যখন হচ্ছে না বা কাজের লোককে মারলে টনক নড়ছে না, শিক্ষককে মারলে জ্বালা কেন?

সমাজের নিম্নশ্রেণির জনগণ সব সময় গোলাম হয়ে বন্দি হয়ে আছে প্রভাবশালীদের কাছে, এটাই হচ্ছে সমস্যা এবং ঠিক এখানে থেকে সমস্যার সমাধান করতে হবে, তাহলে এমন সাহস কখনো কেউ পাবেনা যে একজন গুরুজনকে অবমাননা করে।

কি আমার এ কথা শোনার পর ক্ষেপে গেলেন নাতো? বিষয়টি ভাবুন, আমরা সবাই মানুষ, সবাই সমাজের গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছি। তবে হ্যাঁ, কম শিক্ষার কারণে এক শ্রেণির লোক হয়তো সমাজের নিম্নমানের কাজটি করে চলছে, সেটা কি যথেষ্ট নয়? তারপরও কেন সেই নিম্নমানের কর্মের মানুষের প্রতি অবিচার? কেন তাকে সমপরিমাণ সম্মান দেখানো হচ্ছে না? আর কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে এই পরিবর্তনের জন্য? তাহলে কি বিবেকের মরণে শকুনের আবির্ভাব হয়েছে?

এখন কয়েকটি বিষয় একটু আলোকপাত করি, অপ্রিয় সত্য হলেও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিষয়গুলো দেখতে চেষ্টা করুন যেমনটি আমি দেখেছি।

দেশ ও জাতিকে অভ্যন্তরীণ বা বহিঃশত্রুর থেকে রক্ষা করা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম কাজ। সরকারি এবং বেসরকারি প্রশাসনের ব্যর্থতায়, বিশেষ করে যেখানে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সর্বস্তরে দুর্নীতির ছোঁয়া লেগেছে, যে দেশে কোনো অপরাধীকে গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের প্রয়োজন, লাখ লাখ কর্মকর্তা থাকতেও ভেজালবিরোধী অভিযানে সফলতা নেই, সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসন কেন সশস্ত্র বাহিনীকে সক্রিয়ভাবে দেশের এই দুর্দিনে কাজে লাগাচ্ছেন না!

যে দেশে প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীরা জীবন্ত মানুষকে রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করছে, শত শত মানুষ পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে, মানুষে মানুষে খুনোখুনি, দিনের বেলা, তাও জনসমুদ্রে? যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, যে দেশে শিক্ষকসমাজ আত্মসম্মানবোধ হারিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত, লোভী, স্বার্থপর ও চরিত্রহীন হয়ে পড়েছে, এত বড় সাহস বঙ্গবন্ধুর দেশে এবং জননেত্রীর প্রশাসনে! এ নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছুই নয়। মনে হচ্ছে এ ধরণের শকুনের দল দেশে জন্মেছে গণতন্ত্রকে তথা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে।

এ দিকে পৃথিবীর সমস্ত দেশের কূটনৈতিকবৃন্দ সব কিছু দেখছে, তারপরও তারা নীরবতা পালন করছে, কারণ কী? তারা কি চায় যে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক বা আরও যে সব দেশ সন্ত্রাস এবং দুর্নীতিবাজদের কবলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, নিজেরা নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করছে, বাংলাদেশও ঠিক সেই পথে যাক? সারাক্ষণ দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে দেশের উদীয়মান পথকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে যে সমস্ত রাজাকারের বাচ্চারা উঠে পড়ে লেগেছে, তাদেরকে মেনে নিয়ে কীভাবে দেশপ্রেমিক জাতি নীরবতা পালন করছে?

শত শত কোটি টাকা দুর্নীতি করে দেশ থেকে পাচার করে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। একজন কেরানীর শত শত কোটি টাকা ব্যাংকে। তদন্ত চলছে, দুদোক নোটিস জারি করছে, যেন এসব কালপ্রিট দেশ ত্যাগ করতে না পারে। তারপরও তারা ইমিগ্রেশনের চোখের সামনে দিয়ে শত শত কোটি টাকা নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে!

স্যাটেলাইটের তাহলে কী ব্যবহার হচ্ছে? নাকি সেই দুর্নীতির টাকার কিছু অংশ ঘুষ দিয়ে কালপ্রিটরা দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে? যাদেরকে মেহনতি মানুষ, কৃষক কিংবা মজুরের টাকা দিয়ে দেশের বর্ডার রক্ষা করার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে, আজ তাদের চোখে ধুলো দিয়ে সবাই পালিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন আসে কী দরকার আছে তাহলে এসব জীবন্ত প্রতিমূর্তি পালন করে? সর্বোপরি দুদোক যদি না পারে তার দায়িত্ব পালন করতে, পুলিশ যদি না পারে সৎপথে থেকে দায়িত্ব পালন করতে, সচিবরা যদি না পারে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে, রাজনীতিবিদরা যদি না পারে দেশ চালাতে, তবে পুরো দেশের মানুষের কাছে একটিই অনুরোধ, নতুন করে স্বাধীনতার জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে কালপ্রিটদের দেশ থেকে বের করে তালপট্টির দ্বীপে পাঠিয়ে আরেক নতুন অস্ট্রেলিয়া তৈরি কর। যেন নতুন প্রজন্ম বলতে পারে ২০২২ সালে দেশের সমস্ত কালপ্রিটদের তালপট্টিতে পাঠিয়ে নতুন অস্ট্রেলিয়া তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে।

ঘৃণা করতেও ঘৃণা করছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে। জনগণ ভোট দেয়া থেকে বঞ্চিত, জনগণ প্রতিবাদ করা থেকে বিরত হয়ে পুতুলের মতো নীরবতা পালন করছে। কারণ কী? তাহলে এই জনগণেরই আপনজনেরা এসব অরাজকতার জন্য দায়ী?

বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে আর বাকি নেই। বিবেকের মৃত্যু হয়েছে, অথবা তাকে প্যারালাইজড করে রাখা হয়েছে। যে দেশে ডজন ডজন মন্ত্রী-এমপি থাকতেও ব্যারিস্টার সুমনের কাছে বিপদগ্রস্ত মানুষ ছুটে আসছে, ব্যারিস্টার সুমন সাহেবকে সব কিছুর জন্য সাহায্যের হাত বাড়াতে আকুতি মিনতি করতে হচ্ছে, সে দেশের মানুষ আদৌ কি বিপদমুক্ত হতে পারবে? দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কি ব্যারিস্টার সুমনের কাজ? নাকি অন্য কারো?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সবাই আপনার কাছে বিচার চাচ্ছে। কেন? আপনার কাছে বিচার চাইতে হবে কেন? এটা দ্বারা কী বোঝায়? দেশে কোনো বিচার নেই? বিচারব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে? বাকিরা (যাদের বেতন দিচ্ছেন) কি করছেন? কিভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে? আর সুশাসন ব্যতীত কীভাবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সাধিত হবে? কী হচ্ছে এসব?

দেশের কিছু মানুষ যখন বেঈমান হয়ে ধ্বংস করে মনুষ্যত্বকে, ঠিক তখন মরণ হয় মানবতার। মড়ক পড়েছে মানবতার আর আবির্ভাব হয়েছে শকুনদের। মড়কের অবসান ঘটিয়ে কখন এই শকুনের দল দূর হবে বাংলাদেশ থেকে? সেটাই এখন প্রশ্ন! আল্লাহ তুমি বাংলাদেশকে দানবদের হাত থেকে রক্ষা কর। এদেরকে এমনভাবে ধ্বংস করে দাও যাতে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়। - আমরা কিছু না করতে পারলেও অগত্ব মনে প্রাণে ঘৃণা এবং এদের চূড়ান্ত ধ্বংস কামনা করতে পারি।

লেখক : সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

প্রবাস জীবন, আকাঙ্খা, প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সমীকরণ সবই লিখুন দৈনিক অধিকারকে [email protected] আপনার প্রবাস জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতিও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]m

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড