• রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

পুত্রের আধিপত্যে ‘মাইনাস’ খালেদা!

  নিজস্ব প্রতিবেদক ২৪ মে ২০১৯, ১৫:০৬

তারেক রহমান ও খালেদা জিয়া
তারেক রহমান ও খালেদা জিয়া (ফাইল ফটো)

আপোষহীন বলেই কি নিজ দলেই বারবার কঠিন পরীক্ষায় পড়েন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া! দলটিতে আবারও জেঁকে বসেছে আধিপত্য বিস্তার ও মাইনাস ফর্মুলা। ফখরুদ্দীন-মঈন উদ্দিন শাসনামলে (১/১১) বিএনপিতে খালেদা জিয়াকে মাইনাস প্রক্রিয়ায় ফেলা হয়েছিল। সে সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের একনিষ্ঠ কিছু নেতা ও বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর প্রবল বাধার মুখে প্রক্রিয়াটি ফাইলেই বন্দি থেকে যায়। ১২ বছর পর আবারও বিএনপিতে চলছে মাইনাস প্রক্রিয়া। তিনি তখনও কারাবন্দি ছিলেন, আজও কারাবন্দি। এবার তিনি পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে মাইনাস হচ্ছেন। এতে কলকাঠি নাড়াচ্ছে সেই ‘হাওয়া ভবন’ সংশ্লিষ্টরা।

খালেদা জিয়া ১৭ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে আছেন, মাত্র গেল ১৬ মাস। খালেদা জিয়া এবার মাইনাস হচ্ছেন ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাকে মাইনাস করা হচ্ছে। বিএনপিতে তৈরি হয়েছে দুটি শিবির। এক খালেদাপন্থী, দুই তারেকপন্থী। এ সুযোগ নিয়েছে সুবিধাবাদী কিছু নেতা, যারা সংস্কারপন্থী হিসেবে দলে বেশ পরিচিত। নিজেদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য দলে ঘাপটি মেরে থাকা ওই নেতারা আবারও মাথাচাড়া দিয়েছেন। তারাই দলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে বিএনপিতে সক্রিয় হয়েছেন ‘হাওয়া ভবন’ সংশ্লিষ্টরা।

তারেক রহমান যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তার অধিকাংশই আসে সেই ‘হাওয়া ভবন’ সংশ্লিষ্টদের কাছে। এ কারণেই বিএনপির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অন্ধকারে আছেন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঠিক আগেও কিছুই জানতে পারেন না। এতে করে মহাসচিব হিসেবে বেকায়দায় পড়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সিদ্ধান্তের অন্ধকারে থাকার কারণে তিনি নেতাকর্মীদের অনেক প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দিতে পারেন না। ফখরুলকে চাপে রেখেছে খালেদা-তারেক দুই শিবিরই। দলে কোণঠাসা ফখরুল ঘনিষ্ঠদের কাছে এমনই অস্বস্তির কথা বলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন খালেদা জিয়া। এরইমধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। দুই মামলায় ১৭ বছরের দণ্ড খালেদার কাঁধে। বিএনপির চেয়ারপারসনের কাঁধে মোট মামলা ৩৪টি।

খালেদার আইনজীবীরা বলছেন, মামলাগুলো ও তার সাজা শুধুই রাজনৈতিক ইস্যু। এসব সরকারপ্রধানের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা অসম্ভব বলেও মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

খালেদা জিয়ার বন্দিদশাতেই গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের আগে জোটের পরিধি বৃদ্ধি, দল ও জোটের মধ্যে মনোনয়ন বণ্টন নিয়ে কারাগার থেকেই নানামুখী দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু অনেক সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয়নি। দলের স্থায়ী কমিটি মনোনয়ন বোর্ডের দায়িত্ব পালন করলেও লন্ডন থেকে আসা সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। আবার ওই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতেন না বন্দি খালেদা জিয়া। লন্ডন থেকে তারেক রহমান বার্তা পাঠাতেন এবং এখনো পাঠান হাওয়া ভবনের সেই সমালোচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমেই। দলের ত্যাগী, জনপ্রিয় নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে দলীয় ফোরামে। কোনও প্রতিকার না পেয়ে অনেক প্রভাবশালী নেতা রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হচ্ছেন।

নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের জন্য ক্ষমতাসীনদের দায়ী করেছে বিএনপি। কারাগার থেকে খালেদা জিয়ার নির্দেশনা ছিল- এই সরকারের অধীনে আর কোনও নির্বাচনেই যাবে না বিএনপি। এরপরই আসে উপজেলা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন। স্থায়ী কমিটির সভায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনে অংশ নিতে বলেন।

এদিকে নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট থেকে দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে আটজন বিজয়ী হন। এর মধ্যে বিএনপি পায় ৬টি আসন। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ থাকায় ওই ৬ বিজয়ীকে শপথ থেকে বিরত রাখার নির্দেশনা আসে কারাগার থেকে। কিন্তু দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বাকিরা শেষ সময়ে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণকারী এমপিরা জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশেই তারা শপথ নিয়েছেন। স্বজনদের মাধ্যমে এ খবর পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। আলোচনা ছিল সংসদে যোগদানের বিনিময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে। সরকারের সঙ্গে এমন ‘সমঝোতা’ হয়েছে। কিন্তু তার ছিটেফোঁটা সত্যতাও মিলছে না।

এদিকে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন তারেক রহমান। তারেকের এ কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বলেন, তারেক রহমান বেশি বাড়াবাড়ি করলে তার মা জীবনেও কারাগার থেকে বের হবেন না। শেখ হাসিনা লন্ডন থেকে ফেরেন গত ১১ মে। আর খালেদা জিয়ার মামলার জন্য কেরানীগঞ্জে আদালত স্থানান্তর করার প্রজ্ঞাপন জারি হয় ১৩ মে।

সংসদে যোগদানকারী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, তাদের সংসদে পাঠানো হয়েছে; কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আলোচনা করার কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। আলোচনা তিনিই (তারেক) করছেন।

সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলতে পারে দুই প্রক্রিয়ায়- একটি হলো রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে, অন্যটি প্যারোলের আবেদন করে। সরকার তো নিজে উদ্যোগী হয়ে প্যারোল দিতে পারে না।

এদিকে সাক্ষাতের সময় আইনজীবীদের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি কোনোভাবেই প্যারোলে মুক্তি নেবেন না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন, ন্যায়বিচার পাবেনই। তবে দলীয় সূত্রের খবর, খালেদা জিয়াকে যেকোনভাবে মুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে।

ময়মনসিংহ জেলা বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন বলেন, খালেদা জিয়া ৯০’র আন্দোলন করে ‘আপসহীন’ খেতাব অর্জন করেছেন। দলের কিছু নেতা তাদের স্বার্থে বিএনপি চেয়ারপারসনের খেতাবকে বিকিয়ে দিচ্ছেন। এর উদ্দেশ্য তাকে দল থেকে মাইনাস করা।

প্যারোলের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, খালেদা জিয়া এখনো প্যারোলে রাজি নন; তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। সরকারও নমনীয় হচ্ছে না। তাই প্যারোলে রাজি করানোর চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

হাওয়া ভবনসংশ্লিষ্টদের সক্রিয়তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপির সাবেক এক প্রতিমন্ত্রী বলেন, দলের নেতাদের গুরুত্ব না দিয়ে যারা হাওয়া ভবনে কুকর্ম করে তারেক রহমানের ইমেজ নষ্ট করেছে তাদের গুরুত্ব দিলে শুধু দল নয়, তারও বারোটা বাজবে। তারেক রহমানের সাবেক পিএস মিয়া নুরুদ্দিন অপুকে গত নির্বাচনে কেন মনোনয়ন দেওয়া হলো, সে প্রশ্নের জবাব এখনো মেলেনি।

তারেক রহমানের বেশ কয়টি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র্র রায়। এটা জেনে তাকে ফোন করেছিলেন তারেক রহমান। ফোনে দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মাঠে-ঘাটে কথা বলতে নিষেধ করেন তিনি।

গত বুধবার (২২ মে) বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় থেকে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন খালেদা জিয়াসহ পাঁচজন। খালেদা ছাড়া বাকিরা মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছেন। সূত্রের দাবি, এটাও ছিল তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত।

বিএনপির ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে গত মঙ্গলবার (২১ মে) বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লন্ডল থেকে বৈঠক করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেসময় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে তিনি সবাইকে নির্দেশ দেন।

ওডি/এমআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড