• শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের 'অঢেল' সম্পদ

  জাবি প্রতিনিধি

২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১৩:৪৭
জাবি ছাত্রলীগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান লিটনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের লাখ লাখ টাকা লোপাট, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদা আদায় ও পাশ্ববর্তী এলাকাসহ আত্মীয়-স্বজনের জমি দখল করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।

ছাত্রলীগের সুত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর ছেলে হওয়ায় পোষ্য কোটায় ভর্তি হন হাবিবুর রহমান লিটন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে অবস্থান নিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তবে তৃতীয় সারির নেতা থেকে ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়েছিলেন লিটন। তখন লিটনের বিরুদ্ধে সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের গুঞ্জন ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা সেসব অর্থের জোগান দেন বলেও জনশ্রুতি আছে। তবে সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন লিটন। সাভার-আশুলিয়ার সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান এনামের প্রশ্রয়ে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

ছাত্রলীগের একাধিক নেতা অভিযোগ তুলে জানান, নানা অনিয়ম করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন লিটন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে হাতিয়ে নিয়েছেন বড় অঙ্কের টাকা। এর মধ্যে, গত বছর ঈদুল ফিতরের পর নবীনগর এলাকায় এক লোকের জমি দখল করে দিয়ে অর্ধকোটির বেশি টাকা বাগিয়ে নেন লিটন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের এক শিক্ষকের জমি দখল করে দেওয়ার পুরস্কার হিসেবেও মোটা অঙ্কের টাকা নেন।

অন্যদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. এনামুর রহমান এনাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলামের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন লিটন। তবে নির্বাচনে তিনি মো. সাইফুল ইসলামের পক্ষে কাজ করেননি। এছাড়া নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাজ করিয়ে দিনশেষে লাইনে দাঁড় করিয়ে মোটরসাইকেলের তেল খরচ বাবদ ২০০ টাকা ও পারিশ্রমিক হিসেবে ৩০০ টাকা দেন।

এদিকে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর লিটনের বিরুদ্ধে প্রভাষক পদে চাকরি প্রত্যাশী এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনে গিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অভিযোগ উঠে। চাকরি প্রত্যাশী আনিকা সুবাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। তিনি ছাত্রলীগ সম্পাদকের মেয়ে বন্ধু বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতারা।

এছাড়া ২০২২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়ে নিয়ে ভুল তথ্য, তার পিতা-মাতার নাম ঠিকমতো বলতে না পারা, ভাই-বোনের সংখ্যায় ভুল বলাসহ বেশ কিছু ভুল তথ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন মো. হাবিবুর রহমান লিটন। তাছাড়াও লিটনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ থেকে লাখ লাখ টাকা লোপাট করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জোবায়ের হোসেনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিতে তদবির করার অভিযোগ রয়েছে।

লিটনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা জানান, নানা অনিয়ম করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে লিটন একটি মাইক্রো (ঢাকা মেট্রো-গ ৩৭১৫২২) কিনেছেন। এছাড়া পূর্বের বাড়ি ভেঙে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের নতুন বাড়ি তৈরি করছেন। আবার বাহারি পোশাক শোভা পায় তার শরীরে। তাছাড়াও জমি কিনেছেন, আবার আত্মীয়-স্বজনের জমি দখল করেছেন বলে অভিযোগ আছে লিটনের নামে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২৩ জানুয়ারি হাবিবুর রহমান লিটনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন তার অনুসারীরা। ওইদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফের পরিবহন চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন তারা।

সেসময় লিখিত বক্তব্যে মো. হাবিবুর রহমান লিটনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সেগুলো হলো- কর্মীদের নিয়ে চিন্তা না করে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী এলাকায় ‘জমি দখল’, ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকা, সংগঠনের কর্মীদের খোঁজ না রাখা, কমিটির দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে সমন্বয় না করা, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতি বিকেন্দ্রীকরণ না করে নিজ হল কেন্দ্রিক চিন্তাচেতনা পোষণ করা, প্রত্যেকটি হলের কর্মীসভা করেও দীর্ঘদিন যাবৎ হল কমিটি না দেয়া এবং হল কমিটির বিষয়ে কথা বলতে চাইলে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করা।

তখন সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সাজ্জাদ শোয়াইব চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন হলের নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়েছি। হাবিবুর রহমান লিটন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়া থেকে আজ পর্যন্ত কর্মীদের খোঁজ না রাখেননি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ ও নৈতিক স্খলনের প্রতিবাদে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি।’

মিছিল ও সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক লেলিন মাহবুব ও আরাফাত ইসলাম বিজয়, সাংগঠনিক সম্পাদক চিন্ময় সরকার, সহ-সভাপতি জাহিদুজ্জামান শাকিল ও ফয়সাল খান রকি এবং অর্থ-সম্পাদক তৌহিদুল আলম তাকিদ প্রমুখ নেতৃত্ব দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি হলের দুই শতাধিক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অংশ নেন।

এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান লিটনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে এর আগে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসেই অবস্থান করি। তাই শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের কথা ভাবি, এমন কথা ঠিক নয়। তাছাড়া জমি দখলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। এমন অভিযোগের বিষয়েও কেউ কোন উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারবে না।’

এ বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।

এর আগে, ২০২২ সালের ৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের শিক্ষার্থী আকতারুজ্জামান সোহেলকে সভাপতি ও দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান লিটনকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য জাবি শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড