• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

বেড়েই চলছে প্রবীণ নির্যাতন, নেই নিজের মতো বাঁচার অধিকার!

  অধিকার ডেস্ক    ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:১৫

প্রবীণ
নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন অনেক প্রবীণ (ছবি : গেটি ইমেজ)

রওশন আরা'র নিজের নামেই ফ্ল্যাট। তাছাড়া শ্বশুরবাড়ির জমি জমার একটা অংশ স্বামী বেঁচে থাকতে তার নামে করে দিয়েছিলেন, তাই মাথা গোঁজার ঠাঁই কিংবা অর্থচিন্তা তেমন নেই তার। মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর থেকেই বিদেশে আর ছেলে ঢাকায়, মাঝে মধ্যে আসে দু'একদিনের জন্য। নাতিটা বড় হচ্ছে, ছেলে আজকাল প্রায়ই ওর পড়াশোনার খরচ বাড়ছে জানায়।

যদিও ছেলের অর্থের অভাব হওয়ার কারণটা বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। ছেলে ভাল চাকরি করে। আর যতবারই এসেছে, নাতিটার নাম করে কিছু না কিছু দিয়েছেন তিনি। তিনি ভাবছেন, মারা যাওয়ার আগে বাড়িটা কোনও সেবাকাজের জন্য দিয়ে যাবেন, কাজে লাগবে।

এই ভাবনা প্রকাশ হতেই সমস্যার শুরু। বেশ কয়েকবার ছেলে বেশ রুঢ় ভাষায় কথা শোনালো। সমস্যাটা আরো প্রকট হল যখন থেকে ছেলে অফিসের কাজের অজুহাতে মায়ের ভোটার আইডি কার্ড, দলিলপত্র চেয়ে পাঠাল।

কাছেই রওশন আরা'র ভাইয়ের বাড়ি। পরামর্শ করেন তিনি, ‘ওর অফিসের কাজে এইসব কাগজপত্র দিয়ে কী হবে? ছেলেটা আমাকে কোথাও পাঠানোর চিন্তা করছে নাতো? নাকি আর কাউকে বাড়ি–ঘর না দিয়ে ফেলি, সেই ব্যবস্থাই করছে?’

চিন্তিত হন তিনি। গত তিন মাস ছেলে ফোন করেনি, ভাল লাগে না তার। তিনি তো ছেলের কাছে কিছুই চাননি কখনও, নাতিটাকেও তো বেশ ক‌'বছর দেখেননি, তার পরেও কেন এমন হয়?

জানি, এসব শুনতে ভাল লাগছে না আপনাদের, কিন্তু বিশ্বাস করুন এর কোনটাই বানিয়ে, সাজিয়ে বলতে হচ্ছে না। নিদারুণ লাঞ্ছনা আর গ্লানির মালিন্যে প্রতিটা দিনই কোনও না কোনও ঘরে তৈরি হচ্ছে এমন অসম্মানের গল্প। আবার এমনও অসংখ্য পরিবারের কথা আমরা জানি, তাঁরা প্রাণপাত করেও চেষ্টা করেন প্রবীণ মানুষগুলোকে একটু শান্তিতে–স্বস্তিতে রাখতে, কিন্তু এর পাশাপাশিই যে ছবিটা একটু একটু করে দেখতে পাচ্ছেন এটাও সত্যি।

দৈহিক, মানসিক যাই–ই হোক না কেন, বয়স্ক মানুষের প্রতি ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃত যে কোনও আচরণ, যাতে তাঁদের শারীরিক, মানসিক, আর্থিক যে কোনও ধরনের ক্ষতি হতে পারে বা হচ্ছে সেটাই নির্যাতন।

খাদ্য, পোশাক–আসাক, বাসস্থান এবং ওষুধপত্রের নিয়মিত ব্যবস্থার অভাব ও অবহেলা। আর পাঁচটা অপরাধের সঙ্গে এ বিষয়টির তফাত হল, এখানে সবচাইতে বড় ভরসাস্থলটি থেকেই বিপদ আসছে। প্রবীণ নির্যাতনের প্রধান অংশটাই নিজ পরিবার থেকে আসে। অথচ নিজের মতো করে জীবনের শেষ সময়গুলো কাটানোর অধিকার রয়েছে সব প্রবীণদের।

কিল, চড়, ঘুসি, লাথি মারা, ধাক্কা দেওয়া, হাত মুচড়ে দেওয়া, চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রাখা, তালাবন্ধ করে আটকে রাখা, শাস্তিমূলক আচরণ হিসেবে খেতে না দেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ইচ্ছেমতো ওষুধ প্রয়োগে আচ্ছন্ন করে রাখা এ সমস্তই শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে পড়ে।

মানসিক নির্যাতনের প্রকারভেদ আরও বিচিত্র। অসহায় বয়স্ক মানুষের নির্ভরশীলতাকে নিদারুণ বিদ্রুপ থেকে শুরু করে প্রতি মুহূর্তের সমালোচনা, বক্রোক্তি, খোঁটা দেওয়া, চিৎকার, গালিগালাজ, বিশ্রী নামে ডাকা, তুই–তোকারি করা এ সব কিছুই মানসিক নিগ্রহের আওতায় পড়ে। আবার মুখে কোনও কথা না বলেও নিগ্রহ চলে।

বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধা মানুষটির বারংবার প্রশ্নের কোনও উত্তরই না দিয়ে চলে যাওয়া, তাদের কাছে কাউকেই আসতে না দেওয়া। এমন সমস্ত ছোট ছোট ঘটনায় বয়স্ক অভিভাবকদের আত্মমূল্য এবং আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে যায়। ক্রমেই তারা বাকরুদ্ধ, অবসাদগ্রস্ত, উদ্বেগপ্রবণ, কখনও বা সন্দেহবাতিকগ্রস্তও হয়ে ওঠেন। নির্ভরশীলতা যত বাড়ে ততই বাড়ে মানসিক নির্যাতনের মাত্রা।

‌‌আর্থিক নির্যাতনের মাত্রাও বড় কম নয়। যেহেতু এ বয়সের অনেকেই অনেক কথা মনে রাখতে পারেন না, ভুলে যান অনেক কিছু, তাই টাকাপয়সা, দামি জিনিস বাড়িতে থাকলে প্রায়ই চুরি হওয়ার ভয় থাকে। এক্ষেত্রে দোষ দেয়া যায় স্মৃতিশক্তিকে। ব্যাঙ্কের কাজকর্মের বিষয়ে বয়স্ক মানুষ প্রায়ই নির্ভরশীল, সম্পত্তির বিষয়, কাগজপত্র এসবের ক্ষেত্রগুলিও অন্যের সাহায্যের ওপর বেশ কিছুটা নির্ভর করে। ভয় দেখিয়ে জোর করে বাড়ির হস্তান্তর, নানান ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং’ এসবও চলে।

পোশাক শতচ্ছিন্ন, শীতবস্ত্রটুকু নেই, খাবারের থালায় কী পাচ্ছেন, কখন পাচ্ছেন জানা নেই, অসুখ হলে ডাক্তার দেখানো হয় কিনা, ওষুধপত্র পান কি ঠিক সময়ে!‌ এ সবই অবহেলা। অফিসের কাজের চাপে পাঁচ–সাতদিন‌ ধরে বাবার ওষুধটা অথবা চোখের ড্রপটা আনাই হচ্ছে না, ভুল হয়ে যাচ্ছে অথবা মায়ের ঘরের সিলিং ফ্যানটা প্রবল গ্রীষ্মের মধ্যেও ছ–সাতদিন ধরে খারাপ হয়ে আছে অথচ সময়াভাবে ঠিক করা হচ্ছে না। এটা কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কথা নয়, অবশ্যই অবহেলা।

এ দেশের প্রবীণেরা সবচাইতে বেশি অপছন্দ করেন অসম্মান, প্রতি পদেই কিন্তু তাই ঘটছে। বাস্তবতা হল, এইসব অসহায় মানুষগুলি যাবেন কোথায়? সংসারে আজ তারা বোঝা। আমাদের দীর্ঘকালীন উদাসীনতা শেষে যখন তারা ধরণী ছেড়ে চলে যায়, তখন এই আমরাই বিপুল ব্যয় করে তাদের শ্রাদ্ধৎসব পালন করছি? এই কি আমাদের ভালবাসা-শ্রদ্ধা জানানোর সঠিক পথ?

লেখক- মাহমুদা আক্তার রোজী, ফিজিওথেরাপিস্ট

মানুষের অধিকার নিয়ে লিখবে অধিকার; লিখুন আপনিও। আপনার চারপাশে অধিকার বাস্তবায়নে আপনিও সচেষ্ট হোন, জানান সরাসরি দৈনিক অধিকারকে [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড